মূর্খ! ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে কথাটা বলেই নাতাশা দৌড়ে গিয়ে একটা চেয়ারে উপুড় হয়ে পড়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। অনেকক্ষণ পর্যন্ত সে কান্না থামল না।
ও কিছু নয় মামণি, সত্যি কিছু নয়; কেবল পেতয়া আমাকে চমকে দিয়েছিল,হাসবার চেষ্টা করে নাতাশা বলল, কিন্তু তার চোখ দিয়ে তখনও জল গড়িয়ে পড়ছে, চাপা কান্নায় গলা আটকে আসছে।
বাড়ির ভূমিদাসদেরই কয়েকজন বহুরূপী সেজে এসেছে; ভালুক, তুর্কি, সরাইওয়ালা ও মহিলা সেজে সকলকে ভয় পাইয়ে মজা করতেই তারা এসেছে। প্রথমে সলজ্জ পায়ে নাচ-ঘরে ঢুকে ক্রমে ক্রমে খুশিতে ডগমগ হয়ে তারা নাচতে, গাইতে ও বড়দিনের নানা খেলা খেলতে শুরু করে দিল। একটু পরেই তাদের চিনতে পেরে কাউন্টেস বসার ঘরে চলে গেল। কাউন্ট সেখানে বসে থেকেই অভিনেতাদের বাহবা দিতে লাগল। অল্পবয়সীরা ততক্ষণে উধাও হয়ে গেছে।
আধ ঘণ্টা পরে অন্য বহুরূপীদের সঙ্গে নাচ-ঘরে ঢুকল ফোলানো ঘাঘরা-পরা এক বৃদ্ধা মহিলাসে নিকলাস। পেতয়া সেজেছে তুর্কি মেয়ে। ডিমলার সেজেছে ভাঁড়। নাতাশা সেজেছে হুজার। আর পোড়া কর্কের গোঁফ ও ভুরু লাগিয়ে সোনিয়া সেজেছে সিকাসিয় যুবক।
যারা কিছু সাজেনি তাদের বিস্মিত হতে দেখে, তারা চিনতে না পারায় এবং নানাভাবে প্রশংসা করায় অল্পবয়সীরা ভাবল যে তাদের সাজসজ্জা খুব ভালো হয়েছে, আর তাই অন্যত্রও সেটা দেখানো দরকার।
তখন রাস্তাঘাটের অবস্থা খুব ভাললা; তাই নিকলাস প্রস্তাব করল, আধাডজন ভূমিদাস-বহুরূপীদের সঙ্গে তাদের সব্বাইকে ত্রয়কায় চাপিয়ে খুডোের বাড়িতে নিয়ে যাবে।
কাউন্টেস বলল, না, বুড়ো মানুষটিকে কেন বিরক্ত করবে। তাছাড়া, সেখানে চলাফেরা করার মতো যথেষ্ট জায়গাও তোমরা পাবে না। যদি যেতেই হয় তো মেলিয়ুকভদের বাড়িতে যাও।
মেলিয়ুকভ বিধবা পরিবারের লোকজন ও তাদের শিক্ষক ও গভর্নের্সদের নিয়ে রস্তভদের বাড়ি থেকে তিন মাইল দূরে বাস করে।
তুমি ঠিক বলেছ গো, বুড়ো কাউন্ট সুরে সুর মেলাল। আমি এখনই পোশাক পরে আসছি। ওদের সঙ্গেই যাব। পাশ-এর চোখ খুলে দিয়ে আসব।
কিন্তু কাউন্টেস তার যাওয়ায় বাধা দিল; গত তিনদিন যাবৎ তার পায়ের ব্যথা চলছে। স্থির হল, কাউন্টের যাওয়া হবে না, আর লুইসা আইভানভনা (মাদাম শোস) তাদের সঙ্গে গেলে তবেই ছোট মেয়েরা মেলিয়ুকভদের বাড়ি যেতে পারবে। সোনিয়াও লুইসা আইভানভনাকে ধরে বসল, সে যেন যেতে আপত্তি না করে।
সোনিয়ার সাজটাই হয়েছে সবচাইতে ভালো। তার গোঁফ ও ভুরু অসম্ভব মানিয়েছে। সকলেই বলছে, তাকে খুব সুন্দর দেখাচ্ছে; ফলে তার মেজাজও বেশ হাসিখুশি হয়ে উঠেছে।
লুইসা আইভানভনা যেতে রাজি হল। আধ ঘণ্টার মধ্যেই ছোট-বড় ঘণ্টা ঝোলানো চারখানা ত্রয়কা-স্লেজ লোকজনসহ ফটকে এসে হাজির হল।
চারখানার মধ্যে দু-খানা এয়কা বাড়ির সাধারণ স্লেজ; তৃতীয়খানা বুড়ো কাউন্টের নিজস্ব গাড়ি; আর চতুর্থখানা নিকলাসের নিজের গাড়ি। নাতাশা, সোনিয়া, মাদাম শোস ও দুটি দাসী উঠল নিকলাসের স্লেজে; ডিমলার, তার বৌ ও পেতয়া উঠল বুড়ো কাউন্টের স্লেজে, আর বাকি বহুরূপীরা অপর দুটি স্লেজে চেপে বসল।
তুমি এগিয়ে যাও জাখার! নিকলাস বাবার কোচয়ানকে চেঁচিয়ে বলল; তার ইচ্ছা, পিছন থেকে ঘোড়া ছুটিয়ে তাকে মেরে বেরিয়ে যাবে।
চারটে স্লেজ ব্যাংব্যাং শব্দে বরফের উপর দিয়ে ছুটে চলল।
একটা খরগোসের চলার পথ, অনেক পথের দাগ! তুষার-ভেজা বাতাসে নাতাশার গলা ভেসে এল।
কী চমৎকার আলো, নিকলাস! সোনিয়ার গলা শোনা গেল।
নিকলাস মুখ ঘুরিয়ে সোনিয়ার দিকে তাকাল; তার মুখটা আরো ভালো করে দেখবার জন্য মাথাটা নিচু করল। কালো ভুরু ও গোঁফে একখানি নতুন মিষ্টি মুখ যেন চাঁদের আলোয় তার দিকে তাকাল–এত কাছে, অথচ এত দূরে।
এই তো সোনিয়া, নিকলাস তার দিকে তাকিয়ে হাসল।
কি দেখছ নিকলাস?
কিছু না, বলেই নিকলাস আবার ঘোড়ার দিকে মুখ ফেরাল।
নিকলাস প্রথম স্লেজটাকে ধরে ফেলল। পাহাড়ের উত্রাই বেয়ে নামতে নামতে তারা নদীর ধারে মাঠের ভিতরে একা চওড়া পায়ে-চলা পথে এসে পড়ল।
মনে মনে বলল, আমরা কোথায় এসেছি। মনে হচ্ছে এটাই কসয় মাঠ। কিন্তু না–এটা তো নতুন জায়গা; এটাকে তো আগে কখনো দেখিনি। এটা কসয় মাঠ নয়, দেমকিন পাহাড়ও নয়; ঈশ্বরই শুধু জানেন এটা কি! এটা নতুন এবং মনোমুগ্ধকর। যাকগে, যা হয় হোক… ঘোড়াগুলোর উদ্দেশ্যে হাঁক দিয়ে সে প্রথম স্লেজটাকে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে গেল।
ঘোড়ার লাগাম টেনে ধরে জাখার মুখ ফেরাল; সাদা বরফে তার ভুরু পর্যন্ত ঢেকে গেছে।
নিকলাস লাগামে ঢিল দিতেই জাখারও হাত বাড়িয়ে গলায় একটা শব্দ করে ঘোড়া ছুটিয়ে দিল।
চেঁচিয়ে বলল, এবার তাকিয়ে দেখুন মনিব!
দুটো এয়কা পাশাপাশি থেকে আরো দ্রুত ছুটতে লাগল। নিকলাস একটু এগিয়ে যাচ্ছে।
লাগামশুদু একটা হাত তুলে জাখার বলল, না, আপনি পারবেন না মনিব।
নিকলাস সবগুলো ঘোড়াকে জোর কদমে ছুটিয়ে জাখারকে ছাড়িয়ে গেল। ঘোড়ার পা থেকে ছিটকে আসা বরফের টুকরো যাত্রীদের মুখেচোখে লাগতে লাগল।
পুনরায় ঘোড়ায় গতি সংযত করে নিকলাস চারদিকে তাকাল। তারকাখচিত আকাশের নিচে জ্যোৎস্লাবিধৌত রহস্যময় প্রান্তর চারদিকে প্রসারিত।
