খুশির হাসি হেসে নিকলাস গলা মেলাল, একটি নিগ্রো। খুব মনে আছে। অবশ্য আমি এখনও জানি না সত্যি একজন নিগ্রো এসেছিল, না কি আমরা স্বপ্ন দেখেছিলাম, না কেউ আমাদের তার কথা বলেছিল।
তোমার নিশ্চয় মনে আছে তার মাথার চুল ছিল সাদা, দাঁতও সাদা; আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে সে আমাদের দিকে তাকাল…
সোনিয়া, তোমার মনে পড়ে? নিকলাস শুধাল।
সোনিয়া নরম সুরে জবাব দিল, হা, হ্যাঁ, আমারও কিছু কিছু মনে আছে।
নাতাশা বলল, জান, বাপিকে ও মামণিকে আমি নিগ্রোটার কথা জিজ্ঞাসাও করেছিলাম, কিন্তু তারা বলল যে কোনো নিগ্রোই সেখানে ছিল না। কিন্তু তুমি তো দেখেছ, তোমার তো মনে আছে?
নিশ্চয় মনে আছে। তার দাঁতগুলো এত স্পষ্ট মনে আছে যেন এইমাত্র দেখলাম।
কী আশ্চর্য! ঠিক যেন একটা স্বপ্ন! আমার খুব ভালো লাগে।
আবার তোমার কি মনে আছে নাচ-ঘরে শক্ত করে সেদ্ধ করা ডিম গড়িয়ে দিয়ে আমরা খেলা করছি, আর হঠাৎ দুই বুড়ি এসে কার্পেটের উপর ঘুরতে লাগল। সেটা কি সত্যি, না স্বপ্ন তোমার মনে আছে কী মজাটাই না হয়েছিল?
হ্যাঁ, তোমার মনে আছে নীল রঙের ওভার কোটটা পরে বাপি একবার ফটকে দাঁড়িয়ে বন্দুক ছুঁড়েছিল?
এইভাবে হাসিখুশিতে মশগুল হয়ে তারা অতীতের স্মৃতি রোমন্থন করতে লাগল।
কথাবার্তার মাঝখানে একটি দাসী অপর দিকের দরজা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে ফিসফিস করে বলল, মিস, ওরা মোরগটা এনেছে।
ওটার আর দরকার নেই পোলিয়া। ওদের ওটা নিয়ে যেতে বল, নাতাশা বলল।
ঘরে ঢুকল ডিমলার। এক কোণে দাঁড় করানো বীণাটার কাছে গিয়ে কাপড়ের ঢাকনাটা খুলে ফেলল। বীণার তারে একটা কর্কশ আওয়াজ উঠল।
বসার ঘর থেকে বুড়ি কাউন্টেসের গলা শোনা গেল, মি. ডিমলার, দয়া করে আমার প্রিয় সুর নিশীথে প্রান্তরে বাজান।
একটা তারে ঝংকার তুলে নাতাশা, নিকলাস ও সোনিয়ার দিকে ফিরে ডিমলার বলল, তোমরা কত শান্ত।
হ্যাঁ, আমরা দার্শনিক আলোচনা করছি, কথাটা বলে নাতাশা আবার তাদের আলোচনায় যোগ দিল। তারা তখন স্বপ্ন নিয়ে আলোচনা করছে।
ডিমলার বাজাতে শুরু করল।
নাতাশা ফিসফিস করে বলল, তোমরা কি জান, অতীতের স্মৃতি রোমন্থন করতে করতে একসময় লোকের মনে পড়ে যায় সেইসব ঘটনার কথা যা এই পৃথিবীতে আসার আগে ঘটেছিল…।
সোনিয়া লেখাপড়ায় খুব ভাল; সবকিছু তার মনে থাকে। সে বলল, ওটা জন্মান্তরবাদের ব্যাপার। মিশরিয়রা বিশ্বাস করে যে আমাদের আত্মা একসময় জন্তুদের দেহে বাস করত এবং পুনরায় জন্তুদের দেহেই ফিরে যাবে।
নাতাশা বলল, না, আমরা কোনোদিন জন্তু ছিলাম সেটা আমি বিশ্বাস করি না। কিন্তু এটা আমি নিশ্চিত জানি যে ওই সুদূরে কোথাও আমরা দেবদূত হয়ে ছিলাম, তারপর এখানে এসেছি, আর সেইজন্যই আমাদের মনে পড়ে…
আলোচনায় যোগ দিতে পারি কি? ডিমলার নিঃশব্দ পায়ে এগিয়ে এসে তাদের পাশে বসে বলল।
নিকলাস বলল, আমরা যদি দেবদূতই ছিলাম, তাহলে আমাদের পতন ঘটল কেন? না, তা হতে পারে না!
পতন তো হয়নি; কে বলল আমরা নিচে নেমে গেছি?…আগে আমি কি ছিলাম সেটা জানব কেমন করে? নাতাশা দৃঢ় প্রত্যয়ের সঙ্গে বলে উঠল। আত্মা অমর-সেক্ষেত্রে আমাকে যদি চিরদিন বাঁচতে হয় তাহলে তো আগেও বাঁচতে হয়, অনন্তকাল ধরেই বাঁচতে হয়।
এবার ডিমলার কথা বলল, ঠিক কথা, কিন্তু অনন্তকালের কল্পনা করা আমাদের পক্ষে কঠিন কাজ।
নাতাশা বলল, অনন্তকালের কল্পনা কঠিন হবে কেন? এখন তো আজ চলছে, আবার কাল হবে, চিরকাল তাই হয়, তারও আগে গতকাল ছিল, তার আগের দিন ছিল…
এইসময় কাউন্টেসের গলা শোনা গেল, নাতাশা! এবার তোমার পালা। আমাদের কিছু গেয়ে শোনাও। ষড়যন্ত্রকারীদের মতো তোমরা ওখানে বসে আছ কেন?
নাতাশা বলল, মামণি, আমার মোটেই গাইতে ইচ্ছা করছে না। তবু সে উঠে পড়ল।
অনিচ্ছাসত্ত্বেও উঠল। নিকলাসও অনিচ্ছাসত্ত্বেও ক্ল্যাভিকর্ডে গিয়ে বসল। ডিমলারও অনিচ্ছাসত্ত্বেও তাদের সঙ্গে যোগ দিল।
যথারীতি হলের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে যেখান থেকে গলার স্বর সবচাইতে ভালো খুলবে সেই জায়গাটা বেছে নিয়ে নাতাশা মার প্রিয় গানটা শুরু করল।
সে বলেছিল বটে গান গাইতে তার ইচ্ছা করছে না, কিন্তু সে সন্ধ্যায় যে গান সে গাইল তেমন করে অনেক দিন সে গায়নি, এবং অনাগত অনেক দিনের মধ্যেও তেমন করে গাইতে পারবে বলে মনে হয় না। বুড়ো কাউন্ট পড়ার ঘরে বসেই কান পেতে সে গান শুনল; বার বার তার কাজে ভুল হতে লাগল। নিকলাস বোনের উপর থেকে চোখ ফেরাতে পারল না। বুড়ি কাউন্টেস শুনতে শুনতে সানন্দ অথচ বিষণ্ণ হাসি হাসতে লাগল, তার দুই চোখে জল এল, মাঝে মাঝে মাথা নাড়তে লাগল।
কাউন্টেসের পাশে বসে ডিমলারও চোখ বুজে গান শুনছিল।
অবশেষে বলল, আহা, কাউন্টেস, এ তো এক ইওরোপিয় প্রতিভা, ওর আর শিখবার কিছু নেই–কী সরসতা, কী কমনীয়তা, আর কী বলিষ্ঠতা…
আহা, ওকে নিয়ে আমার কত যে ভয়, কত যে ভয়! কাকে বলছে খেয়াল না করেই কাউন্টেস কথাগুলি বলল। মায়ের মন দিয়েই সে বুঝতে পেরেছে যে নাতাশার মধ্যে অনেক কিছু আছে, আর সেইজন্যই সে সুখী হতে পারবে না।
নাতাশার গান শেষ হবার আগেই চৌদ্দ বছরের পেতয়া ছুটে এসে জানাল যে কয়েকজন বহুরূপী এসে হাজির হয়েছে।
নাতাশা হঠাৎ থেমে গেল।
