বুড়ি বলল, খেলা থামাও–সবকিছুরই একটা সময় আছে।
নাতাশা বলল, ওকে ছেড়ে দাও কাতেনা। যা মাভরুশা, চলে যা।
মাভরুশাকে ছাড়িয়ে দিয়ে নাতাশা নাচ-ঘর পেরিয়ে বারান্দায় গেল। সেখানে এক বুড়ো ও দুটি যুবক চাকর তাস খেলছিল। তাকে ঢুকতে দেখেই তারা উঠে দাঁড়াল।
এদের নিয়ে কি করা যায়? নাতাশা ভাবল।
এই যে, নিকিতা, দয়া করে যাও…একে কোথায় পাঠাই?…ঠিক আছে, যাও তো, উঠোন থেকে একটা মোরগ ধরে নিয়ে এস; আর তুমি মিশা, কিছুটা যই নিয়ে এস।
অনেকটা যই? মিশা খুশি হয়ে বলল।
তাড়াতাড়ি যা, বুড়ো লোকটি বলল।
আর তুমি থিয়োডোর, তুমি আমাকে একটুকরো চক এনে দাও।
খানসামার ভাড়ার ঘরের পাশ দিয়ে যাবার সময় তাকে বলল সামোভারটা উনুনে চাপিয়ে দিতে, যদিও এখনও চায়ের সময় মোটেই হয়নি।
আসলে সকলকে ব্যস্ত করে তুলতেই নাতাশা ভালোবাসে। সবসময়ই কোনো না কোনো কাজে তাদের সে পাঠাবেই। সে যেন যাচাই করে দেখতে চায় তার হুকুম শুনে রাগ করে কি না অথবা বিরক্ত হয় কি না। কিন্তু ভূমি-দাসদাসীরাও তার হুকুমই তড়িঘড়ি পালন করে থাকে। বারান্দা দিয়ে যেতে যেতে সে ভাবতে লাগল, এবার কি করি? কোথায় যাই?
মেয়েলি জামা পরে ভড়কে সেইদিকে আসতে দেখে বলল, বল তো নাস্তাসিয়া আইভানভনা, আমার কিরকম ছেলেপুলে হবে?
ভাঁড় জবাব দিল, কেন, মাছি, ঝিঁঝি পোকা, কাঠ-ফড়িং।
হা প্রভু, হা প্রভু, এ যে সেই একই মূর্তি! আঃ, কোথায় যে যাই? নিজেকে নিয়ে কি যে করি?
গোড়ালি খুটখুট করে সে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেল। সেকানে ভোগেল, তার স্ত্রী ও দুজন শিক্ষয়িত্রীর সঙ্গে দেখা করে চলে গেল ভাই পেতয়ার কাছে। সে তখন একটি চাকরের সঙ্গে বসে রাতে পোড়াবার জন্য বাজি তৈরি করছে।
ভাইকে ডেকে বলল, পেতয়া! পেতয়া! আমাকে পিঠে করে নিচে নিয়ে চল।
সত্যি সত্যি ভাইয়ের পিঠে চেপে সে নিচে নেমে গেল। এইভাবে নিজের গোটা সাম্রাজ্যকে পরিদর্শন করে সে নাচ-ঘরে গিয়ে ঢুকল। একটা গিটার হাতে নিয়ে বুক-কেসটার পিছনে একটা অন্ধকার কোণ বেছে নিয়ে সেখানে বসে গিটারের তারে আঙুল বুলিয়ে পিটার্সবুর্গে প্রিন্স আন্দ্রুর পাশে বসে শোনা অপেরার একটা গানের সুর বাজাতে লাগল। গিটারে যে সুর সে তুলল অন্য কেউ তার মাথামুণ্ড হয় তো কিছুই বুঝত না, কিন্তু সেই শব্দের ঝংকার তার মনে অনেক স্মৃতি বয়ে নিয়ে এল। সেই মুহূর্তগুলি তার মনে পড়ে গেল যখন সে ছিল পাশে, আর তার দিকে তাকিয়েছিল প্রেমিকের দৃষ্টিতে।
আ, সে যদি একটু তাড়াতাড়ি আসত! আমার ভয় হচ্ছে। সে বুঝি কোনোদিনই আসবে না! আরো খারাপ লাগছে, আমি যে বুড়ি হয়ে যাচ্ছি সেটাই তো আসল কথা! আমার মধ্যে আজ যা আছে তা তো থাকবে না। কিন্তু হয়তো সে আজই আসবে, এখনই আসবে। হয়তো সে এসে গেছে, বাইরের ঘরে বসে আছে। হয়তো সে গতকালই এসেছে, আমি সেটা ভুলে গেছি। গিটারটা রেখে দিয়ে সে বসার ঘরে চলে গেল।
শিক্ষক, গভর্নের্স, অতিথি–পুরো পারিবারিক মহলটাই চায়ের টেবিলে হাজির। চাকররা টেবিলটা ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে,কিন্তু প্রিন্স আন্দ্রুন্তু সেখানে নেই। জীবন আগেকার মতোই চলেছে।
নাতাশাকে ঢুকতে দেখেই বুড়ো কাউন্ট বলে উঠল, আরে, এই তো এসেছে! বস, আমার পাশে বস। কিন্তু নাতাশা মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে চারদিকে তাকাতে লাগল; যেন কাউকে খুঁজছে।
নাতাশা বলল, মামণি! তাকে এনে দাও, তাকে এনে দাও মামণি! তাড়াতাড়ি, তাড়াতাড়ি! আবারও
অনেক কষ্টে সে চোখের জল থামাল। : টেবিলে বসে সে বড়দের আলোচনা শুনতে লাগল। নিকলাসও সেখানে হাজির। হায় ঈশ্বর, সেই একই মুখ, সেই একই কথা! হাতে পেয়ালা নিয়ে বাপি সেই একইভাবে কথা বলে চলেছে! গোটা সংসারের এই একঘেয়েমি লক্ষ্য করে নাতাশা যেন শিউরে উঠল।
চায়ের পরে নিকলাস, সোনিয়া ও নাতাশা বসার ঘরের সেই প্রিয় কোণটাতে গিয়ে বসল যেখানে তাদের সব গোপন আলোচনা হয়ে থাকে।
.
অধ্যায়-১০
নাতাশা দাদাকে বলল, তোমার কি কখনো এরকম মনে হয় যে আর কিছু পাবার নেই-কিছু না; যা কিছু ভালো সব শেষ হয়ে গেছে? আর ঠিক একঘেয়ে নয়, কেমন যেন বিষণ্ণ লাগে?
নিকলাস জবাব দিল, তা হয় বটে! যখন সবকিছুই ঠিক ঠিক মতো চলছে, সকলেই হাসিখুশি, তখন এ ধরনের ভাব আমারও হয়েছে। মনে হয়েছে আমি যেন বড় ক্লান্ত, আমরা সকলেই মরে যাব। রেজিমেন্টে থাকতে একবার আমি গানের মজলিসে যাইনি…আর হঠাৎ এমন খারাপ হয়ে গেল… ।
নাতাশা বাধা দিয়ে বলল, হ্যাঁ, হ্যাঁ, আমি জানি, আমি জানি! খুব ছোট বেলায় আমার ওরকম হত। তোমার মনে আছে একবার স্কুলের ব্যাপারে আমাকে শাস্তি দেওয়া হয়েছিল? তোমরা সকলে নাচছিলে, আর স্কুলের ঘরে বসে আমি ফুঁপিয়ে কাঁদছিলাম? সে-কথা আমি কোনোদিন ভুলব না : আমার খুব খারাপ লাগছিল, নিজের জন্য ও অন্য সকলের জন্য কেমন যেন দুঃখ পাচ্ছিলাম। অথচ আমি ছিলাম নির্দোষ-সেটাই তো আসল কথা। তোমার মনে আছে?
নিকলাস জবাব দিল, মনে আছে। পরে তোমার কাছে গিয়ে সান্ত্বনা দিতে চেয়েছিলাম, কিন্তু কেমন যেন লজ্জা করছিল। তখন আমরা ভয়ংকর অবুঝ ছিলাম। আমার একটা মজার পুতুল ছিল, সেটা তোমাকে দিতে চেয়েছিলাম। তোমার মনে আছে?
বিষণ্ণ হাসি হেসে নাতাশা শুধাল, আর তোমার কি মনে পড়ে, অনেক কাল আগে, যখন আমরা খুব ছোট ছিলাম, তখন কাকা আমাদের পড়ার ঘরে ডেকেছিলেন-সেই পুরনো বাড়িতে–তখন অন্ধকার হয়ে এসেছিল–আমরা ভিতরে ঢুকলাম আর অমনি সেখানে হাজির হল…
