চোখের জল ফেলে কাউন্টেস বারকয়েক ছেলেকে বলেছে যে এখন তার দুই মেয়েই সংসারী হয়েছে, তাই তার একমাত্র বাসনা ছেলের বিয়ে দেওয়া। সে বাসনা পূর্ণ হলেই সে শান্তিতে কবরে শুতে পারে। আরো বলেছে, একটি চমৎকার মেয়েকে সে চেনে, কাজেই এখন ছেলের মতটা পাওয়া দরকার।
মায়ের কথাগুলো কোনদিকে চলেছে সেটা বুঝতে পেরে একদিন কথাপ্রসঙ্গে সে মাকে সব কথা খোলাখুলি বলতে বলল। মাও জানিয়ে দিল যে, তাদের বৈষয়িক সমস্যা-সমাধানের সবটাই এখন নির্ভর করছে জুলি কুরাগিনের সঙ্গে তার বিয়ের উপরে।
কিন্তু মামণি, ধর আমি এমন একটি মেয়েকে ভালোবাসি যার কোনো বিষয়-সম্পত্তি নেই, তাহলে তুমি কি চাও টাকার জন্য আমি আমার ভালোবাসা ও সম্মানকে বিসর্জন দেব? প্রশ্নটার নিষ্ঠুরতাটুকু উপলব্ধি না করে শুধু নিজের মহানুভবতা দেখাতেই সে মাকে কথাটা বলল।
কি বলবে বুঝতে না পেরে মা বলল, না, তুমি আমার কথা বুঝতে পারনি নিকোলেংকা। তোমার সুখই আমি চাই। কিন্তু সে যে সত্যি কথা বলেনি, এবং তার ফলে নিজেই জড়িয়ে পড়েছে সেটা বুঝতে পেরে মা কাঁদতে লাগল।
কেঁদ না মামণি। তুমি শুধু বল কি চাও; তুমি তো জান, তোমাকে সুখী করতে আমি জীবন দিতে পারি, সবকিছু দিতে পারি। তোমার জন্য আমি সব বিসর্জন দেব-এমন কি আমার ভালোবাসাকেও।
কিন্তু সেভাবে তো কাউন্টেস কথাটা বলতে চায়নি; ছেলের আত্মত্যাগ সে চায় না বরং সে চায় ছেলের জন্য নিজে ত্যাগ স্বীকার করতে।
চোখের জল মুছে বলল, না, তুমি আমাকে বুঝতে পারনি; এ কথা এখন থাক।
নিকলাস নিজের মনে বলল, হতে পারে যে একটি গরিব মেয়েকে আমি ভালোবাসি। টাকার জন্য কি আমার ভালোবাসাকে, আমার সম্মানকে বিসর্জন দেব? মামণি কি করে একথা আমাকে বলতে পারল আমি ভেবে পাই না। সোনিয়া গরিব বলেই আমি তাকে ভালোবাসব না, তার বিশ্বস্ত, আন্তরিক ভালোবাসার প্রতিদান দেব না? অথচ একটা পুতুলের মতো জুলির চাইতে তাকে নিয়েই তো আমি বেশি সুখী হতে পারব। পরিবারের কল্যাণে আমার মনকে বলি দিতে পারি, কিন্তু তার উপর জোর খাটাতে তো পারি না। সোনিয়াকে যদি আমি ভালোবাসি তো সে ভালোবাসা আমার কাছে অন্য সবকিছুর চাইতে শক্তিশালী, সবকিছুর উপরে।
মায়ের প্রস্তাবমতো নিকলাস মস্কো গেল না, আর কাউন্টেসও তার কাছে আর বিয়ের কথা তুলল না। দুঃখের সঙ্গে, কখনো বিরক্তির সঙ্গে, সে লক্ষ্য করতে লাগল সম্পত্তিহীনা সোনিয়ার সঙ্গে তার ছেলের ঘনিষ্ঠতা ক্রমেই বেড়ে চলেছে।
নিকলাস তখন ছুটির শেষের দিনগুলি বাড়িতেই কাটাচ্ছিল। রোম থেকে প্রিন্স আন্দ্রুর লেখা চতুর্থ চিঠিটা তার হাতে এসেছে। সে লিখেছে, গরম আবহাওয়ায় তার ক্ষতস্থানটা অপ্রত্যাশিতভাবে পুনরায় পেকে না উঠলে অনেক আগেই সে রাশিয়ায় ফিরে যেত; বর্তমান অবস্থায় নববর্ষ পর্যন্ত তাকে সেখানেই থাকতে হবে। নাতাশা এখনও তার বাগদত্তার প্রতি সমান অনুরক্ত, সেই অনুরাগই তার জীবনের সান্ত্বনা; কিন্তু তাদের বিরহের চার মাসের শেষের দিকে তার মন মাঝে মাঝেই অবসাদে ভেঙে পড়তে লাগল। নিজের জন্যই তার দুঃখ হতে লাগল; দুঃখ এই জন্য যে বৃথাই সে ক্ষয় হয়ে যাচ্ছে, কারো কোনো কাজে লাগছে না–অথচ ভালোবাসবার ও ভালোবাসা পাবার কত শক্তিই না তার মধ্যে আছে।
রস্তভদের বাড়ির আবহাওয়া তখন মোটেই সুখপ্রদ নয়।
.
অধ্যায়-৯
বড়দিন এল। কিছু প্রথামাফিক অনুষ্ঠান, প্রতিবেশী ও চাকরদের কাছ থেকে কিছু গম্ভীর ও ক্লান্তিকর অভিনন্দন, এবং প্রত্যেকের জন্য নতুন পোশাক, এ ছাড়া বিশেষ কোনো উৎসবের আয়োজন করা হল না, যদিও বিশ ডিগ্রি রিউমার (ফারেনহাইট অনুসারে শূন্য তাপাংকের ১৩ ডিগ্রি নিচে) আবহাওয়ার শান্ত বরফপাত, দিনের চোখ-ধাঁধানো রোদ ও শীতের রাতের তারার আলো-এসব কিছুর মধ্যে ছিল বিশেষ আনন্দ-অনুষ্ঠানের আহ্বান।
বড়দিন সপ্তাহের তৃতীয় দিন; মধ্যাহ্ন ভোজনের পরে বাড়ির লোকজন সকলেই যার যার ঘরে চলে গেছে। দিনের মধ্যে এটাই সবচাইতে, একঘেয়ে সময়। নিকলাস সকালে কিছু প্রতিবেশীর সঙ্গে দেখা করতে বেরিয়েছিল; এখন সে বসবার ঘরের সোফায় শুয়ে ঘুমোচ্ছ। বুড়ো কাউন্ট পড়ার ঘরে বিশ্রাম করছে। সোনিয়া গোল টেবিলটার পাশে বসে একটা সূচি-কর্মের নক্সা নকল করছে। কাউন্টেস পেশেন্স খেলছে। ভাড় নাস্তাসিয়া আইভানভনা দুটি বৃদ্ধা মহিলাকে নিয়ে বিরস বদনে জানালার ধারে বসে আছে। নাতাশা ঘরে ঢুকল, সোনিয়ার কাছে গিয়ে একপলক তার কাজটা দেখল, তারপর মার কাছে গিয়ে কোনো কথা না বলে দাঁড়িয়ে রইল ।
মা বলল, একঘরের মতো এভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছ কেন? কি চাও?
তাকে…আমি চাই তাকে…এখনই, এই মুহূর্তে! আমি চাই তাকে! নাতাশা বলল। তার চোখ দুটি ঝকঝক করছে; ঠোঁটে হাসির চিহ্ন নেই।
কাউন্টেস মাথা তুলে মেয়ের দিকে তাকাল।
আমার দিকে তাকিও না মামণি! তাকিও না; আমি কেঁদেই ফেলব।
আমার কাছে একটু বস, কাউন্টেস বলল।
মামণি, আমি তাকে চাই। কেন এভাবে নিজেকে ক্ষয় করব মামণি?
তার গলা ধরে এল, চোখে নামল অশ্রুর প্লাবন, সেটা লুকোতে তাড়াতাড়ি মুখ ঘুরিয়ে ঘর থেকে চলে গেল।
বসার ঘরে ঢুকে সেখানে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ কি যেন ভাবল, তারপর দাসীদের ঘরে গেল। একটি বুড়ি দাসী একটি মেয়েকে বকছিল। এইমাত্র ঠাণ্ডার মধ্যে ভূমিদাসদের বাসা থেকে ছুটে এসেছে বলে মেয়েটি হাঁপাচ্ছে।
