নিকলাস বলল, সত্যি। তোমার ঠাণ্ডা লাগছে না তো?
না, আমি খুব, খুব ভালো আছি। এত ভালো লাগছে। নিজের মন নিয়েই সে যেন বিব্রত। অনেকক্ষণ তারা চুপচাপ চলল। রাতটা অন্ধকার, ঠাণ্ডা। ঘোড়াগুলোও চোখে পড়ছে না, শুধু শোনা যাচ্ছে কাদার মধ্যে তাদের পায়ের শব্দ।
বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছে হঠাৎ নাতাশার গলায় কালকে রাতে আঁধার যখন এল ঘন হয়ে গানটার সুর গুনগুনিয়ে উঠল-সারা পথ এই সুরটাই সে ধরতে চেষ্টা করছিল, এতক্ষণে তা ধরা দিল।
তুলতে পারলে তাহলে? নিকলাস বলল।
নাতাশা শুধাল, এইমুহূর্তে তুমি কি ভাবছিলে নিকলাস?
এ প্রশ্নটা একে-অন্যকে করতে তারা খুব ভালোবাসে।
মনে করবার চেষ্টা করে নিকলাস বলল, আমি? দেখ, প্রথমে ভেবেছিলাম লাল কুকুর রুগা ঠিক খুড়োর মতো, সেটা যদি মানুষ হত তাহলে খুড়োকে সব সময় কাছে কাছে রাখত। খুড়ো কী চমৎকার মানুষ! তোমার কী তাই মনে হয় না? কী বলে?
আমি? দাঁড়াও, দাঁড়াও। হ্যাঁ, প্রথমে ভাবলাম, যে বাড়ির দিকে চলেছি, কিন্তু অন্ধকারে কোথায় যে চলেছি তা শুধু ঈশ্বরই জানেন, হয় তো হঠাৎ আমরা যেখানে পৌঁছে যাব সেটা অত্রাদ নয়, পরীদের দেশ। তারপর ভাবলাম…না, আর কিছু না।
পরে হেসে বলল, আমি জানি তুমি তার কথাই ভাবছিলে।
যদিও সত্যি সত্যি সে প্রিন্স আন্দ্রুর কথাই ভাবছিল, তবু নাতাশা বলল, না। আমি শুধু ভাবছিলাম আনিসিয়া কেমন সুন্দরভাবে সবকিছু চালিয়ে নিচ্ছে। তুমি কি জান, কিন্তু আমি জানি যে আর কখনো আমি আজকের মতো শান্ত ও সুখী হতে পারব না।
বাজে কথা, অর্থহীন কথা, বাগাড়ম্বর। নিকলাস চেঁচিয়ে বলল। তারপর ভাবল, আমার এই নাতাশা কত ভাল! তার মতো বন্ধু আমার কেউ নেই, কোনোদিন হবে না। কেন ও বিয়ে করবে? এমনিভাবেই তো আমরা একসঙ্গে ঘোড়া ছুটিয়ে চলতে পারি।
নাতাশাও বলল, কত ভালো আমার এই নিকলাস!
রাতের ভেজা-ভেজা চকচকে অন্ধকারের মধ্যে বাড়ির জানালার আলোগুলি দেখিয়ে নাতাশা বলল, আঃ, বসার ঘরে এখনও আলো জ্বলছে!
.
অধ্যায়-৮
কাউন্ট ইলিয়া রস্তভ মার্শাল অব দি নবিলিটির পদটা ছেড়ে দিয়েছে, কারণ ঐ পদে থাকার দরুন তার অনেক খরচ হচ্ছিল, অথচ তার বৈষয়িক অবস্থার কোনোরকম উন্নতি হয়নি। নাতাশা ও নিকলাস প্রায়ই লক্ষ্য করে বাবা-মা কি নিয়ে যেন উদ্বেগের সঙ্গে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে; কখনো কখনো শুনতে পায় স্তভদের মস্কোর নিকটবর্তী চমৎকার বাড়ি ও জমিদারি বেচে দেবার প্রস্তাব চলছে। মার্শাল থাকার সময়ে বাড়িতে যেরকম অবাধ জনসমাগম ছিল এখন আর সেটা নেই; অত্রানুর জীবনযাত্রা আগের তুলনায় অনেক চুপচাপ হয়ে এসেছে; কিন্তু তবু মস্তবড় বাড়িটা ও তার ঘরগুলো লোকজনে ভর্তি প্রতিদিন বিশ জনেরও বেশি লোক টেবিলে খেতে বসে। এরা সকলেই আপন জন, পরিবারের লোকদের মতোই এ বাড়িতে বসবাস করছে; আবার কেউ বা বাধ্য হয়ে এখানে রয়েছে। যেমন বাজনাদার ডিমলার ও তার বৌ, বুড়ি মহিলা বেলো, এবং পেতয়ার শিক্ষয়িত্রী, মেয়েদের প্রাক্তন শিক্ষয়িত্রী, প্রভৃতির মতো এমন আরো অনেকে যারা নিজেদের বাড়ির চাইতে কাউন্টের বাড়িতে থাকাটাই অধিকতর সুবিধাজনক বলে মনে করে। আগেকার মতো তত অতিথি সমাগম এখন আর হয় না, কিন্তু জীবনযাত্রার যে পুরনো অভ্যাসগুলি ছেড়ে দিয়ে বেঁচে থাকার কথাই কাউন্ট ও কাউন্টেস ভাবতেই পারে না সেটা এখনও অভ্যাহতই আছে। শিকারের একটা বড় মাপের আয়োজন এখনও আছে, বরং নিকলাস সেটাকে আরো বাড়িয়েছে, আস্তাবলে সেই পঞ্চাশটা ঘোড়া ও পনেরোটা সহিসই আছে, নামকরণ-দিবসে সেই ব্যয়বহুল ভোজসভা ও উপহারের রেওয়াজই চলেছে; কাউন্টের হুইস্ট ও বোন্টন খেলাও আগের মতোই চলছে; এখনও সকলকে হাত দেখিয়ে সেই একইভাবে ছড়িয়ে তাস মেলে ধরে কাউন্ট প্রতিদিন প্রতিবেশীদের কাছে শয়ে-শয়ে রুবল হারে, আর তারাও উপার্জনের একটা লাভজনক উপায় হিসেবে কাউন্ট রস্তভের সঙ্গে একবার খেলার সুযোগ খুঁজে ফেরে।
বিষয়-সম্পত্তির ব্যাপারে কাউন্ট যেন একটা মস্তবড় জালের ভিতরে পড়েছে; সে জালে সে যে আটকে পড়ছে এটা সে যতই বিশ্বাস করতে না চায়, প্রতি পদক্ষেপে ততই বেশি করে জড়িয়ে পড়ছে; না পারছে জাল ছিঁড়ে বেরিয়ে আসতে, না পারছে ধৈর্য ধরে জালের বাঁধন খুলতে। কাউন্টেস মর্মে মর্মে বুঝতে পারছে যে তার ছেলেমেয়েদের সর্বনাশ ঘটছে, কিন্তু সেটা কাউন্টের দোষ নয়, কারণ একদিন সে যা ছিল তার থেকে সরে আসা তার পক্ষে সম্ভব নয়; নিজের ও সন্তানদের আসন্ন সর্বনাশ সম্পর্কে কাউন্ট নিজেও সচেতন। মেয়েলি দৃষ্টিকোণ থেকে এ সমস্যা-সমাধানের একটিমাত্র পথই কাউন্টেসের চোখে পড়ছে, অর্থাৎ নিকলাস যদি কোনো বিত্তশালিনীকে বিয়ে করে। সে বোঝে এটাই তাদের শেষ আশা, আর নিকলাস যদি তার পছন্দকরা মেয়েকে বিয়ে করতে অস্বীকার করে তাহলে সংসারের অবস্থার উন্নতির আশাই তাকে ছেড়ে দিতে হবে। মেয়েটি হচ্ছে জুলি কুরাগিনা, বাবা-মা যেমন ধার্মিক তেমনই ভালো মানুষ, শিশুকাল থেকেই রস্তভরা মেয়েটিকে চেনে, সম্প্রতি তার সর্বশেষ ভাইটির মৃত্যু ঘটায় সেই এখন প্রভূত বিত্তের উত্তরাধিকারিণী।
ছেলের বিয়ের প্রস্তাব করে কাউন্টেস ইতিমধ্যেই মস্কোতে জুলির মাকে চিঠি লিখেছে; তার কাছ থেকে সন্তোষজনক জবাবও এসেছে। কুরাগিনা জানিয়েছে, তার নিজের এতে মত আছে, তবে সবকিছুই নির্ভর করছে মেয়ের ইচ্ছার উপরে। কুরাগিনা নিকলাসকে মস্কোতে যাবার আমন্ত্রণ জানিয়েছে।
