কথাগুলি বলতে বলতে খুড়োর মুখটা আরো অর্থবহ, আরো সুন্দর হয়ে উঠল। আপনা থেকেই রভের মনে পড়ে গেল, একজন সম্মানিত ও নিঃস্বার্থ খেয়ালি লোক হিসেবে গোটা প্রদেশ জুড়ে খুড়োর একটা সুনাম আছে।
তুমি চাকরিতে ঢোক না কেন খুড়ো?
একসময় ঢুকেছিলাম, ছেড়ে দিয়েছি। ঠিক আছে, চলে আসুন। চাকরির মাথামুণ্ডু আমি ভালো বুঝি না। ওসব আপনাদের জন্যে আমার মাথায় যথেষ্ট ঘিলু নেই। আর শিকার একটা আলাদা ব্যাপার-ঠিক আছে। চলে আসুন! …আরে, দরজাটা খুলে দাও। ওটা বন্ধ করেছ কেন?
কারো খালি পায়ে দ্রুত এগিয়ে আসার শব্দ শোনা গেল, একটা অদৃশ্য হাত শিকারি-ভৃত্যদের ঘরের দরজাটা খুলে দিল। ভেসে এল বালালায়কার (স্প্যানিশ গিটারের মতো একটা বাদ্যযন্ত্র) সুর। বাজিয়ের হাতটা খুব ভালো। নাতাশা কিছুক্ষণ ধরেই সুরটা শুনছিল, এবার ভালো করে শোনার জন্য বারান্দায় বেরিয়ে গেল।
খুড়ো বলল, আমার কোচয়ান মিকা… একটা ভালো বালালায়কা তাকে কিনে দিয়েছি। বাজনাটা আমার বড় প্রিয়।
নিকলাস বলে উঠল, খুব ভালো! সত্যি খুব ভালো!
দাদার গলায় ভাসা-ভাসা প্রশংসার স্বর শুনে নাতাশা ঈষৎ তিরস্কারের সুরে বলল, খুব ভালো? খুব ভালো নয়-যাকে বলে মন-মাতানো!
খুড়োর দেয়া খাদ্য পানীয় যেমন নাতাশার কাছে মনে হয়েছে পৃথিবীর সেরা, তেমনই এই মুহূর্তে এ বাজনাটা মনে হচ্ছে পরম আনন্দময়।
বালালায়কা থামতেই নাতাশা দরজার কাছে গিয়ে চেঁচিয়ে বলল, আরো, আরো বাজাও! মিল্কা নতুন প্রেরণায় বালালায়কার মাই লেডির সুরমূছনা ফুটিয়ে তুলল। সকলেই বার বার সেটা শুনতে লাগল; শুনে যেন কারো ক্লান্তি নেই। আনিসিয়া ফেদরভনা ভিতরে ঢুকে দরজার থামে হেলান দিয়ে দাঁড়াল।
খুড়োর মতো করেই হেসে নাতাশাকে বলল, শুনতে ভালো লাগছে। লোকটা খুব ভালো বাজায়।
খুড়ো হঠাৎ সোৎসাহে বলে উঠল, এই জায়গাটা ঠিক হল না! এখানে একেবারে ফেটে পড়া উচিত–ঠিক আছে, চলে আসুন! ফেটে পড়া উচিত।
তুমিও বাজাও বুঝি? নাতাশা জানতে চাইল।
খুড়ো জবাব দিল না, একটু হাসল।
আনিসিয়া, গিয়ে দেখ তো আমার গিটারের তারগুলো ঠিক আছে কি না। অনেকদিন তো ওটা ছুঁইনি। ঠিক আছে-চলে আসুন! বাজনা প্রায় ছেড়েই দিয়েছি।
আনিসিয়া ফেদরভনা সানন্দে হাল্কা পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল এবং গিটারটা নিয়ে ফিরে এল।
কারো দিকে না তাকিয়ে খুড়ো বাদ্যযন্ত্রটার ধুলো ঝাড়ল, শক্ত আঙুলে ঠুকে ঠুকে গিটারের সুর বাঁধল, তারপর হাতল-চেয়ারটায় আরাম করে বসল। আনিসিয়া ফেদরভনার দিকে চোখ টিপে শুরু করল বাজনা; মাই লেডি নয়, বাজাতে লাগল বিখ্যাত গান পথ বেয়ে এস হে সুন্দরী-র সুর।
বাজনা শেষ হতেই নাতাশা চেঁচিয়ে উঠল, মনোরম, মনোরম! বাজাও খুড়ো, বাজিয়ে যাও! লাফিয়ে উঠে খুড়োকে জড়িয়ে ধরে চুমো খেল। দাদার দিকে ঘুরে বলল, নিকলাস, নিকলাস! যেন তাকে জিজ্ঞাসা করতে চাইল : আমি এত চঞ্চল হয়ে উঠেছি কেন?
খুড়োর বাজনা নিকলাসেরও ভালো লেগেছে; খুড়ো সুরটা আর একবার বাজাল। দরজায় আবারও আনিসিয়া ফেদরভনার মুখটা দেখা গেল। তার পিছনে আরো অনেক মুখ…খুড়ো আবার বাজাতে শুরু করল
পরিষ্কার মিষ্টি জল আনছ তুমি কন্যা,
দোহাই তোমার, এ কাজ রাখ, তুমি যে অনন্যা
হঠাৎ ঘাড়টা ঝাঁকি দিয়ে বাজনা থামাতেই নাতাশা যেন আর্তনাদ করে উঠল, বাজিয়ে যাও খুড়ো; যেন এই বাজনার উপর তার জীবনটাই নির্ভর করছে।
খুড়ো উঠে দাঁড়াল। মনে হল তার ভিতরে যেন দুটি মানুষের বাসা : একজন তাকে দেখে গম্ভীরভাবে হাসছে, অপরজন একটা পল্লী-নৃত্যের জন্য তৈরি হচ্ছে।
হাত বাড়িয়ে খুড়ো উচ্ছ্বসিত স্বরে বলল, এবার তাহলে আসুন ভাইঝি।
কাঁধের উপর থেকে শালটা ফেলে দিয়ে নাতাশা ছুটে গিয়ে খুড়োর মুখোমুখি হল, দুই হাত মুড়ে নাচের ভঙ্গিতে দাঁড়াল।
কবে কোন ফরাসি শিক্ষত্রিয়ীর কাছে সে রুশ পল্লী-নৃত্য শিখেছিল কে জানে, আজ কিন্তু সে চমৎকার নাচতে লাগল। নিকলাস ও অন্য সকলেই তার প্রশংসা করতে লাগল।
নাচ শেষ করে খুড়ো আনন্দে হাসতে হাসতে বলল, আচ্ছা ছোট কাউন্টেস! ঠিক আছে–চলে আসুন! খুব ভালো নেচেছেন ভাইঝি! এবার আপনার জন্য একটি ভালো বর খুঁজতে হবে। ঠিক আছে–চলে আসুন!
নিকলাস হেসে বলল, বর খোঁজা হয়ে গেছে।
আচ্ছা? বলে খুড়ো জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে নাতাশার দিকে তাকাল, খুশির হাসি হেসে সেও মাথা নাড়ল।
খুড়ো আর একটা গান বাজাল, তারপর একটু থেমে গলাটা পরিষ্কার করে নিয়ে তার প্রিয় শিকার-সঙ্গীতটি গাইল :
কালকে রাতে আঁধার যখন এল ঘন হয়ে
হাল্কা বরফ ঝরল যখন ঝিরি ঝিরি লয়ে…
খুড়ো গাইল চাষীদের মতো করে, তার দৃঢ় প্রত্যয় যে একটা গানের অর্থ নিহিত থাকে তার বাণীতে, সুর আপনি আসে, বাণী ছাড়া সুর থাকতে পারে না, বাণীকে রূপ দেয়ার জন্যই সুরের অস্তিত্ব। ফলে পাখির গানের মতো তার গানও হল অসাধারণ ভালো। নাতাশা খুড়োর গানেও সমান মোহিত। মনে মনে স্থির করল, সে আর বীণা বাজাবে না, কেবল গিটারই বাজাবে।
নয়টার পরে দুখানা ছোট গাড়ি ও তিনজন অশ্বারোহী এল নাতাশা ও পেতয়াকে নিয়ে যেতে। তারা যে এতক্ষণ কোথায় ছিল তা না জানতে পেরে কাউন্ট ও কাউন্টেস খুবই চিন্তিত হয়ে পড়েছিল।
পেতয়াকে কুকুরের মতো তুলে নিয়ে বড় গাড়িটায় শুইয়ে দেওয়া হল। নাতাশা ও নিকলাস উঠল অপর গাড়িতে। খুড়ো নাতাশার গায়ে মালটা জড়িয়ে দিল, একটা নতুন মমতায় তাকে বিদায় দিল। হাঁটতে হাঁটতে সে সেতুটা পর্যন্ত তাদের সঙ্গে গেল, তারপর লণ্ঠন হাতে তিনজন অশ্বারোহী শিকারিকে তাদের সঙ্গে দিল আগে আগে পথ দেখিয়ে নিয়ে যেতে।
বড় রাস্তায় পড়ে নাতাশা বলল, খুড়ো কী ভালো মানুষ!
