ঈষৎ হেসে সে মাকে জিজ্ঞাসা করল, তোমরা কোথায় যাবে বলছিলে না মামণি? তোমাদের কি গাড়িটা চাই?
মাও হেসে বলল, হ্যাঁ, হ্যাঁ, যাও তো গাড়িটা জুড়তে বল।
বরিস নিঃশব্দে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল নাতাশার খোঁজে। মোটাসোটা ছেলেটি রেগে তাদের পিছন পিছন ছুটে গেল, তাদের কর্মসূচীতে ব্যাঘাত ঘটায় সে যেন বিরক্তি হয়েছে।
*
অধ্যায়-১২
তরুণী অতিথিটি এবং কাউন্টেসের বড় মেয়েকে (বোনের থেকে মাত্র চার বছরের বড় হলেও সে এরই মধ্যে বয়স্কদের মতো ব্যবহার করতে শুরু করেছে) না ধরলে এখন বসবার ঘরে অল্পবয়সীদের মধ্যে নিকোলাস আর ভাইঝি সোনিয়া। মেয়েটি একহারা, ছোটখাট, সুন্দরী; দীর্ঘ আঁখিপক্ষে ঢাকা দুই চোখে শান্ত চাউনি, ঘন কালো চুলের বিনুনি মাথাটাকে দুবার প্যাঁচ দিয়ে রেখেছে, গায়ের রঙে বাদামি আভা, বিশেষ করে সুডৌল ও পেশীবহুল বাহু ও গলার রঙে বাদামি আভা, বিশেষ করে সুডৌল ও পেশীবহুল বাহু ও গলার রঙে বাদামির আভাস। সুললিত চলন, নরম হাত-পায়ের নমনীয়তা, আচরণে একটা বিশেষ লাজম্রতা ও সংযম-সব মিলে আজ সে একটি সুন্দর, সদ্য বেড়ে-ওঠা বিড়ালছানা হলেও অচিরেই একটি সুন্দরী মার্জানী হয়ে উঠবার সম্ভাবনা তার মধ্যে আছে। তার হাসি দেখেই বোঝা যায় যে নিজেকে সে সাধারণ আলোচনার যোগ্য শ্রোতা বলেই মনে করে; নিজের অজান্তেই দীর্ঘ, ঘন আঁখিপক্ষের নিচ দিয়ে সে সেনাবিভাগে যোগদানকারী জ্ঞাতি-ভাইয়ের দিকে তাকাচ্ছিল; স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছিল, সুযোগে পেলেই তারা দুজনও নাতাশা ও বরিসের মতো বসবার ঘর থেকে পালিয়ে গিয়ে খেলা শুরু করে দেবে।
অতিথিটিকে সম্বোধন করে এবং নিকোলাসকে দেখিয়ে কাউন্ট বলল, কি জানেন, তার বন্ধু বরিস অফিসার হয়েছে, কাজেই বন্ধুত্বের খাতিরে সেও বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে, এই বুড়ো বাপকে ছেড়ে সামরিক চাকরিতে ঢুকতে যাচ্ছে। অথচ প্রাচীন সংগ্রহশালা বিভাগে তার জন্য চাকরি এবং সবকিছুই অপেক্ষা করছিল। এই তো খাঁটি বন্ধুত্ব, তাই না? জিজ্ঞাসার সুরে কাউন্ট কথাগুলি বলল।
কিন্তু লোকে তো বলছে যুদ্ধ ঘোেষণা করা হয়ে গেছে, অতিথি জবাব দিল।
কাউন্ট বলল, তারা তো অনেকদিন ধরেই একথা বলছে, বারবার একথা তারা বলবে, আর তাতেই শেষ হয়ে যাবে। কি জানেন, এই হল বন্ধুত্ব। সে অশ্বারোহী বাহিনীতে যোগ দিতে যাচ্ছে।
কি বলবে বুঝতে না পেরে অতিথি মাথা নাড়ল।
নিকোলাস রেগে বলল, বন্ধুত্বের জন্য মোটেই নয়, আমি নিজেই বুঝতে পারি যে সেনাবাহিনীই আমার কর্মক্ষেত্র।
সে তার সম্পর্কিত বোন ও তরুণী অতিথিটির দিকে তাকাল; দুজনই স্মিত হাসিতে তাকে সমর্থন জানাল।
পাভলোগ্রাদ হুজার বাহিনীর কর্নেল শুবার্ট আজ আমাদের এখানেই নৈশভোজন সারবেন। তিনি ছুটিতে এখানে এসেছেন; নিকোলাসকে সঙ্গে করে নিয়ে যাবেন। কোনো উপায় নেই! কাঁধ ঝাঁকুনি দিয়ে কাউন্ট বলল; কথাটা তার পক্ষে কষ্টকর হলেও সে সহজভাবেই বলল।
ছেলে বলল, আমি তো আগেই তোমাকে বলেছি বাপি, তুমি যদি আমাকে যেতে দিতে না চাও তো আমি থেকে যাব। কিন্তু আমি জানি, সেনাবাহিনী ছাড়া আর কোথাও আমাকে দিয়ে কিছু হবে না; আমি কূটনীতিকও হতে পারব না, সরকারি করণিকও নয়।-মনের কথা লুকিয়ে রাখতে আমি জানি না। কথা বলতে বলতেই সে একটি সুন্দর যুবকের প্রেমিকাসুলভ দৃষ্টিতে সোনিয়া ও তরুণী অতিথিটির দিকে তাকাতে লাগল।
ছোই বিড়াল ছানাটিও নিকোলাসকে বারবার দেখছে; তাকে দেখে মনে হচ্ছে, যে কোনো মুহূর্তে সে আবার লাফিয়ে-ঝাঁপিয়ে তার বিড়ালী স্বভাবকে প্রকাশ করবে।
বুড়ো কাউন্ট বলল, ঠিক আছে, ঠিক আছে! ও তো সব সময়ই রেগে আছে! ওই বোনাপার্তই ওদের মুণ্ডু ঘুরিয়ে দিয়েছে; সে যে একজন পতাকাবাহী সৈনিক থেকে সম্রাট হয়েছে, এ কথাই ওরা সকলে ভাবে। বেশ তো, বেশ তো, ঈশ্বর যেন তাই করেন। অতিথির মুখের ব্যঙ্গের হাসি তার নজরে পড়ল না।
বড়রা বোনাপার্তকে নিয়ে আলোচনা শুরু করে দিল। জুলি কারাগিনা যুবক রস্তভের দিকে মুখ ফেরাল।
বড়ই দুঃখের কথা বৃহস্পতিবার দিন তুমি আখায়ভদের বাড়ি যাওনি। তুমি না থাকায় আমার এত খারাপ লাগছিল, মৃদু হেসে জুলি বলল।
যুবকটি খুশি হয়ে প্রেমিকসুলভ হাসি হেসে জুলির আরো কাছ বসে তার সঙ্গে গোপন কথায় মেতে উঠল, সে একবারও খেয়াল করল না যে তার এই হাসি সোনিয়ার বুকে ছুরি বসিয়েছে, সে বেচারি লজ্জায় লাল হয়ে অস্বাভাবিকভাবে হাসছে। আলোচনার ফাঁকে সে একবার সোনিয়ার দিকে তাকাল। সোনিয়া ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে তার দিকে একবার তাকাল; তারপর চোখের পানি চাপতে না পেরে এবং ঠোঁটের নকল হাসি রাখতে না পারে উঠে ঘর থেকে চলে গেল। নিকোলাসের সব হৈ-চৈ থেমে গেল। সে আলোচনার মধ্যে একটু ফাঁক খুঁজতে লাগল এবং সুযোগ পাওয়ামাত্রই বিষণ্ণ মুখে সোনিয়ার খোঁজে বেরিয়ে গেল।
এইসব তরুণ-তরুণীরা কত সহজে মন দেয়া-নেয়া করে! Cousinage-dangereux voisnage (সম্পর্কিত ভাইবোনের পাশাপাশি বাস বড়ই বিপজ্জনক।)।
তরুণ-তরুণীরা এই ঘরটাতে যে উজ্জ্বলতা এনে দিয়েছিল সেটা মিলিয়ে যেতে কাউন্টেস বলল, ঠিক; কত দুঃখ, কত উদ্বেগ পার হয়ে তবে না আজ তাদের নিয়ে এত সুখ। অথচ আজও আনন্দের চাইতে উদ্বেগই বেশি। উদ্বেগের আর শেষ নেই। বিশেষ করে ঠিক এই বয়সে; ছেলে-মেয়ে উভয়ের পক্ষেই বয়সটা বড় বিপজ্জনক।
