ছোট-বড় মিলিয়ে জনা পাঁচেক পাররিবারিক ভূমিদাস মনিবকে অভ্যর্থনা জানাবার জন্য ফটকে এসে হাজির হল। শিশু, যুবতী মিলিয়ে কুড়িখানেক ভূমিদাসী খিড়কি-দরজা দিয়ে উঁকি মেরে শিকারিদের দেখতে লাগল। নাতাশার উপস্থিতি-একটি মেয়ে, একটি মহিলা ঘোড়ায় চড়েছে-তাদের মনে এত বেশি কৌতূহল জাগিয়েছে যে সকলেই এগিয়ে এসে তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল, আর এমন সব মন্তব্য করল যেন সে একটি আশ্চর্য দর্শনীয় বস্তু, তাদের কথাবার্তা শুনবার বা বুঝবার মতো মানুষমাত্র নয়।
আরিংকা দেখ, উনি কেমন একদিকে বসেছেন! ঘাঘরা ঝুলে পড়েছে। …দেখ, দেখ, সঙ্গে একটা শিকারি শিঙাও রয়েছে!
কী আশ্চর্য! ওর ছুরিটা দেখছ?
ঠিক যেন একটি তাতারনি!
একটি সাহসিকা তো নাতাশাকে সোজাসুজিই প্রশ্ন করল, আপনি উল্টে পড়ে না গিয়ে বসে থাকেন কেমন করে?
চারদিকে বাগান দিয়ে ঘেরা ছোট কাঠের কাড়িটার ফটকে এসে খুড়ো ঘোড়া থেকে নামল। দাসদাসীদের দিকে একবার চোখ বুলিয়ে কর্তৃত্বপূর্ণ গলায় বলল, বাড়তি লোকরা সব কেটে পড়, আর অতিথি অভ্যাগতদের অভ্যর্থনার যথোচিত আয়োজন কর।
ভূমিদাসরা চলে গেল। খুড়ো নাতাশাকে ঘোড়া থেকে নামিয়ে তাকে সঙ্গে করে ফটকের কাঠের সরু সিঁড়ি বেয়ে উঠতে লাগল। ঘরের কাঠের দেয়ালে পলস্তরা নেই, তাই খুব একটা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন নয়, কিন্তু তাই বলে চোখে পড়ার মতো নোংরাও নয়। ঘরে ঢুকতেই তাজা আপেলের গন্ধ নাকে এল, চারদিকে নেকড়ে ও শেয়ালের চামড়া ঝোলানো।
সামনের ঘর ও বসবার ঘর পেরিয়ে সকলে খুড়োর নিজস্ব ঘরে ঢুকল। সেখানে রয়েছে একটা ছেঁড়া সোফা, পুরনো কার্পেট, সুভরভের ছবি, গৃহস্বামীর বাবা ও মার ছবি এবং সামরিক পোশাক পরিহিত তার নিজের ছবি। পড়ার ঘরটাকে তামাক ও কুকুরের তীব্র গন্ধ। অতিথিদের সেখানে বসে আরাম করতে বলে খুড়ো ঘরে থেকে বেরিয়ে গেল। পিঠময় কাদা নিয়ে ঘরে ঢুকল রুগা, সোফায় শুয়ে পড়ে জিভ ও দাঁত দিয়ে নিজেকে পরিষ্কার করতে লাগল। পড়ার ঘরের বারান্দার ওধারে দেখা যাচ্ছে একটা ছেঁড়া পর্দার আড়াল। তার পিছন থেকে মেয়েদের হাসি ও ফিসফিসানি শোনা যাচ্ছে। নাতাশা, নিকলাস ও পেতয়া চাদর খুলে সোফায় বসে পড়ল। কনুইতে ভর দিয়ে পেতয়া সঙ্গে সঙ্গেই ঘুমিয়ে পড়ল। নাতাশা ও নিকলাস চুপচাপ। তাদের মুখ লাল; যেমন ক্ষিধে পেয়েছে, তেমনই হাসিখুশি। পরস্পরের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে হঠাৎ দুজনই অকারণে খিলখিল করে হেসে উঠল।
কিছুক্ষণ পরে খুড়ো ঘরে ঢুকল। পরনে কসাক কোট, নীল ট্রাউজার ও টপ-বুট। নাতাশার মনে পড়ল অত্রাদতে এই পোশাকেই খুড়োকে দেখে তার খুব মজা লেগেছিল, কিন্তু এখন তার মনে হল চাতকপাখি-লেজ কোট বা ফ্রক কোটের তুলনায় এটা মোটেই খারাপ পোশাক নয়। খুড়োর মেজাজও খুব শরিফ, ভাই-বোনের এই হাসিতে কিছুমাত্র অসন্তুষ্ট না হয়ে (তারা যে তার জীবন-যাত্রার নমুনা দেখে হাসতে পারে এটা খুড়োর মাথায়ই আসেনি) নিজেও তাদের হাসিতে যোগ দিল।
এই তো চাই ছোট কাউন্টেস, এই তো চাই; চলে আসুন! এর মতো কোনো মেয়ে আমি আগে দেখিনি, নিকলাসের দিকে একটা পাইপ এগিয়ে দিয়ে সে বলল। সারা দিন একজন পুরুষ মানুষের মতো ঘোড়া ছুটিয়েছেন, অথচ এখনও কেমন তাজা আছেন!
একটু পরেই খালি পায়ের শব্দ শুনে দরজাটা খুলে দেয়া হল, ঘরে ঢুকল বছর চল্লিশ বয়সের একটি সুদর্শনা নারী, তার থুতনিতে ভাঁজ পড়েছে, ঠোঁট দুটি রক্তিম, হাতে খাবার-ভর্তি একটা মস্ত বড় ট্রে। গৃহকত্রীর মর্যাদা ও আতিথেয়তার সঙ্গে সকলের দিকে স্মিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে সে সশ্রদ্ধভাবে মাথা নিচু করল। অস্বাভাবিক লম্বা-চওড়া চেহারা সত্ত্বেও স্ত্রীলোকটি হাল্কা পায়ে হেঁটে এল। টেবিলে সকলের জন্য নানা রকম খাদ্য পানীয় সাজিয়ে দিয়ে সে একপাশে সরে গিয়ে দরজার কাছে দাঁড়াল। মুখে তখনো হাসিটি লেগেই আছে। রশুভের মনে হল সে যেন বলতে চাইছে, এই তো আমি এসেছি। আমিই সেই! এবার খুড়োকে চিনলেন তো? না চিনে আর উপায় কি? শুধু নিকলাসই নয়, আনিসিয়া ফেদরভনা ঘরে ঢুকতেই তার বাঁকা ভুরু আর ঠোঁটের স্মিত হাসির অর্থ নাতাশাও বুঝতে পেরেছে।
খাদ্য-পানীয় সবই আনিসিয়া ফেদরভনার নিজের হাতে তৈরি; স্বাদে ও গন্ধে সবকিছুতেই আনিসিয়া ফেদরভনার স্পর্শ পাওয়া যাচ্ছে; সেই রসের ছোঁয়া, সেই পরিচ্ছন্নতা ও স্মিত হাসি।
নাতাশাকে একটার পর একটা খাবার পরিবেশন করে সে বার বার বলতে লাগল, এটা নিন ছোট্ট লেডি কাউন্টেস!
নাতাশা সবকিছুই খেল, তার মনে হল এমন খাবার সে কখনো খায়নি। আনিসিয়া ফেদরভনা চলে গেল।
নৈশাহারের পরে রস্তভ ও খুড়ো চেরি ব্র্যান্ডি সামনে নিয়ে অতীত ও ভবিষ্যতের শিকার এবং রুগা ও ইলাগিনের কুকুর নিয়ে গল্প শুরু করে দিল। নাতাশা সোফার উপরে সোজা হয়ে বসে চকচকে চোখ মেলে সব কথা শুনতে লাগল। পেতয়াকে কিছু খাওয়াবার জন্য বারকয়েক তাকে ঘুম থেকে তুলতে চেষ্টা করল, কিন্তু সে শুধু বিড়বিড় করে কি যেন বলল, মোটেই উঠল না। এই নতুন পরিবেশে নাতাশার মনটা এতই হাল্কা ও খুশি হয়ে উঠেছে যে তার ভয় হল গাড়িটা বুঝি বড় বেশি তাড়াতাড়ি এসে পড়বে।
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে খুড়ো বলল, দেখতেই তো পাচ্ছেন। এইভাবেই আমার দিন শেষ হয়ে আসছে…মৃত্যু তো আসবেই। ঠিক আছে, আসুক। কিছুই তো থাকবে না। তাহলে মানুষের ক্ষতি করে কী লাভ
