জঙ্গলের একটা কোণ পার হবার আগেই কুচকুচে কালো একটা সুন্দর ঘোড়ায় চেপে একজন শক্তসমর্থ ভদ্রলোক তার দিকে এগিয়ে এল; তার মাথায় লোমের টুপি, সঙ্গে দুটি শিকারি-ভৃত্য।
শক্রর পরিবর্তে ইলাগিনের মধ্যে নিকলাস দেখতে পেল একজন সম্ভ্রান্ত ভদ্রলোককে; হোট কাউন্টের সঙ্গে পরিচিত হতে সে বিশেষ আগ্রহী। নিকলাসের সামনে এগিয়ে এসে ইলাগিন টুপিটা খুলে জানাল যে যা ঘটেছে সেজন্য সে দুঃখিত সামনে এগিয়ে এসে ইলাগিন টুপিটা খুলে জানাল যে যা ঘটেছে সেজন্য সে দুঃখিত এবং যে লোকটি অন্যের কুকুরের শিকারকে ছিনিয়ে নিয়েছে তাকে যথোচিত শাস্তি দেওয়া হবে। কাউন্টের সঙ্গে তার আরো ভালো করে পরিচয় হবে বলেই সে আশা করে।
নাতাশা ভয় পেয়েছিল যে তার দাদা হয় তো ভয়ংকর একটা কিছু করে বসবে; তাই সে উত্তেজিত হয়ে তার পিছু নিয়েছিল। দুই শত্রু পরস্পরকে বন্ধুভাবে অভ্যর্থনা করছে দেখে সে তাদের দিকে এগিয়ে গেল। নাতাশাকে দেখে ইলাগিন তার বীবর লোমের টুপিটা আরো উঁচুতে তুলে ধরল এবং স্মিত হাসি হেসে বলল যে ছোট প্রিন্সেসের শিকার-প্রীতি ও রূপের কথা সে অনেক শুনেছে; দুই দিকের বিচারেই সে ডায়নার সমতুল্যা।
নিজের শিকারির অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত করতে ইলাগিন রস্তভদের তার নিজস্ব উঁচু জমিতে নিয়ে যাবার জন্য পীড়াপীড়ি করতে লাগল; আরো জানাল যে সেখানে অনেক খরগোসের মেলা। নিকলাস রাজি হয়ে গেল; শিকারের দলবল দ্বিগুণ হয়ে এগিয়ে চলল।
মাঠটা পেরিয়ে যেতে হবে। শিকার-ভৃত্যরা দল বেঁধে চলল। খুড়, রস্তভ ও ইলাগিন চলল পাশাপাশি ঘোড়ায় চেপে।
নানারকম মজলিসি কথাবার্তার ফাঁকে একসময় ইলাগিন বলল, কিছু কিছু শিকারি কেন যে শিকার ও কুকুর নিয়ে এত মাতামাতি করে আমি তা বুঝতে পারি না। আমি ভালোবাসি শিকার করতে, তাই নয় কি কাউন্ট? কারণ আমি মনে করি…।
আ–তু! একজন কুকুর-রক্ষীর একটানা ডাক ভেসে এল। ফসলকাটা মাঠের মধ্যে একটা উঁচু জমিতে দাঁড়িয়ে হাতের চাবুকটা তুলে ধরে সে আবার হাঁক দিল, আতু! (এই ডাক ও তুলে-ধরা চাবুকের অর্থ সে একটা খরগোস দেখতে পেয়েছে!)
আরে, মনে হচ্ছে সে একটা দেখতে পেয়েছে, ইলাগিন তাচ্ছিল্যের সঙ্গে চলল। চলুন, আমরাও এগিয়ে যাই কাউন্ট।
হ্যাঁ, চলুন।
খুড়ো ও ইলাগিনকে সঙ্গে নিয়ে নিকলাস খরগোসটার দিকে এগিয়ে চলল।
তারপর শুরু হল খরগোস শিকার। খুড়ো তার প্রিয় কুকুর গাউশকাকে নিয়ে শিকার থেকে সরে দাঁড়াল। ইলাগিনের কুকুর এরজা ও নিকলাসের কুকুর মিলকা খরগোসটাকে তাড়া করতে লাগল। ইলাগিন, নিকলাস, নাতাশা ও খুড়ো ছুটোছুটি করে কুকুর-খরগোসের দৌড়ঝাঁপ দেখতে লাগল; মুহূর্তের জন্যও তারা এ দৃশ্যটাকে চোখের বাইরে চলে যেতে দিতে চায় না।
নিকলাস সগর্বে ডাকে, মিলাভ্রুশকা, সোনা!
ইলাগিন ডাকে, এরজা মাণিক!
দুই কুকুর প্রাণপণে তাড়া করছে; খরগোসটাও এঁকেবেকে, কখনো থেমে কখনো ছুটে তাদের এড়িয়ে যাচ্ছে। একসময় খরগোসটা শীতকালীন গমের ক্ষেত ও ফসল-কাটা ছুটছে গাড়ি-টানা ঘোড়ার মতো; কিন্তু কিছুতেই খরগোেসটার সঙ্গে পেরে উঠছে না।
ঠিক সেইসময় একটা তৃতীয় কণ্ঠস্বর শোনা গেল, রুগা, রুগাউশকা। ঠিক আছে, ছুটে যাও! আর সঙ্গে সঙ্গে খুড়োর লাল রঙের কুকুরটা পিঠ বেঁকিয়ে আপ্রাণ চেষ্টায় ছুটে সামনের কুকুর দুটোকে পার হয়ে খরগোসটাকে ধরে ফেলল; একধাক্কায় সেটাকে আলের উপর থেকে গমের ক্ষেতের মধ্যে ফেলে দিয়ে হাঁটু পর্যন্ত কাদায় ডুবিয়ে নিজেও ক্ষেত্রের মধ্যে লাফিয়ে পড়ল। তারপর শুধু দেখা গেল :কুকুর ও খরগোস কাদার মধ্যে গড়াগড়ি যাচ্ছে। চারদিক থেকে কুকুরগুলো এসে তাদের ঘিরে ধরল। মুহূর্তকাল পরে সকলেই এসে সেখানে গোল হয়ে দাঁড়াল। একমাত্র খুড়োই মহানন্দে ঘোড়া থেকে নামল, খরগোসের একটা থাবা কেটে নিল; রক্তাক্ত খরগোসের দেহটা থরথর করে কাঁপতে লাগল। কাকে বলছে, কেন বলছে, সেসব না বুঝেই খুড়ো বলে উঠল, এই তো চাই! এই তো কুকুরের মতো কুকুর!… হাজার রুবল দাম থেকে শুরু করে এক রুবল দামের কুকুর-সবকটাকে হারিয়ে দিয়েছে।
তারপর খরগোসের কাদামাখা থাবাটাকে ছুঁড়ে দিয়ে বলল, রুগা, এই থাবাটা তোমার জন্য। এটা তোমার পাওনা, ঠিক আছে, চলে এসো!
অনেকক্ষণ ধরে সকলেই লাল রুগাকে দেখতে লাগল। কাদামাখা পিঠটা বেঁকিয়ে খুড়োর ঘোড়র পিছু পিছু চলতে লাগল বিজয়ীর গম্ভীর ভঙ্গিতে।
সে যেন বলতে চাইছে, যতক্ষণ শিকারের প্রশ্ন দেখা না দেয় ততক্ষণ আমি অন্য যেকোন কুকুরেরই মতো, কিন্তু শিকারের সময় হলে, দেখতেই তো পাচ্ছ আমি কি!
আরো বেশ কিছুক্ষণ পরে খুড়ো যখন নিকলাসের কাছে এসে আলাপ করতে শুরু করল তখন এই ভেবে সে গর্ববোধ করল যে এত কাণ্ডের পরেও খুড়ো নিজে এসে তার সঙ্গে কথা বলছে।
.
অধ্যায়-৭
সন্ধ্যার দিকে ইলাগিন নিকলাসের কাছ থেকে বিদায় নিল; নিকলাস যখন বুঝতে পারল যে তারা বাড়ি থেকে অনেকটা দূরে এসে পড়েছে তখন শিকারের দল রাতটা তাদের ছোট গ্রাম মিখায়লভনাতেই কাটিয়ে যাক খুড়োর এই প্রস্তাব সে মেনে নিল।
খুড়ো বলল, আপনারা যদি আমার বাড়িতে থাকেন তো আরো ভালো হয়। ঠিক আছে, তাই চলে আসুন। দেখুন, আবহাওয়াটা স্যাঁতসেঁতে; তাই আপনারা এখানেই বিশ্রাম করুন আর একটা ছোট গাড়িতে ছোট কাউন্টেসকে বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হোক।
