ক্লান্ত, খুশি মুখে সকলে নেকড়েটাকে জ্যান্ত অবস্থায় একটা ঘোড়ার পিঠে চাপিয়ে দিল; কুকুরগুলো তার দিকে তাকিয়ে ভেউ-ভেউ করতে লাগল; আর সেটাকে এনে হাজির করা হল সকলের সামনে। কুকুরগুলো পাঁচটা বাচ্চাকেই মেরে ফেলেছে। সকলেই যার যার বীরত্বের কাহিনী বলতে লাগল। জোয়ালে বাঁধা অবস্থায় মাথাটা ঝুলিয়ে নেকড়েটা চকচকে চোখ মেলে সকলকে দেখতে লাগল। তাকে ছোঁয়ামাত্রই বাঁধা পাগুলোতে ঝাঁকুনি দিয়ে সে লক্ষ্যহীনভাবে সকলের দিকে তাকাতে লাগল। বুড়ো কাউন্ট রস্তভও এসে নেকড়েটার গায়ে হাত রাখল।
বলল, আঃ, কী দুর্ধর্ষ জীব! কাছে দাঁড়ানো দানিয়েলকে বলল, দুর্ধর্ষ জীব, কি বল?
তাড়াতাড়ি মাথার টুপিটা তুলে দানিয়েল জবাব দিল, হ্যাঁ ইয়োর এক্সেলেন্সি।
নেকড়েটাকে ছেড়ে দেওয়া এবং দানিয়েলের সঙ্গে দেখা হওয়ার কথাটা কাউন্টের মনে পড়ে গেল।
কিন্তু তুমি বড় কড়া মানুষ হে বন্ধু! কাউন্ট বলল।
একটি সলজ্জ, শিশুসুলভ, খুশির হাসি দিয়েই দানিয়েল তার জবাব দিল।
.
অধ্যায়-৬
বুড়ো কাউন্ট বাড়ি চলে গেল; নাতাশা ও পেতয়া কথা দিল শিগগিরই ফিরবে, কিন্তু তখনও সময় থাকতে শিকার চলতে লাগল। দুপুরবেলা কুকুরগুলোকে ছোট ছোট গাছে ঢাকা একটা খাড়ির মধ্যে ঢুকিয়ে দিল, আর নিকলাস হলদে মাঠটার মধ্যে দাঁড়িয়ে চারদিকে নজর রাখল।
তার সামনে শীতকালীন গমে ভর্তি মাঠ; তার নিজের শিকারিটি হ্যাঁজেল ঝোঁপের পিছনে একাকি দাঁড়িয়ে আছে। কুকুরগুলোকে ছেড়ে দেওয়ামাত্রই একটা কুকুর ডেকে উঠল। অন্য কুকুরগুলোও তাতে যোগ দিল। এক মুহূর্ত পরেই সোরগোল শোনা গেল যে জঙ্গলে ঢাকা খাড়ির মধ্যে একটা মেয়ালকে পাওয়া গেছে। অমনি সকলে সেইদিকে ছুটল। নিকলাস দাঁড়িয়ে রইল।
তার চোখের সামনে দিয়ে লাল টুপি পরা কুকুর-রক্ষীরা খড়ি বরাবর ঘোড়া ছুটিয়ে গেল; সে কুকুরগুলোকেও দেখতে পেল; আশা করে রইল, উল্টো দিকের গমের ক্ষেতে যেকোন মুহূর্তে শেয়ালটার দর্শন পাবে।
শিকারিটি এগিয়ে গিয়ে তার কুকুরটাকে ছেড়ে দিল। নিকলাস দেখতে পেল, একটা ছোট পা-ওয়ালা অদ্ভুত লাল শেয়াল মাঠের ভিতর দিয়ে ছুটে গেল। কুকুরটা তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। সবগুলো কুকুর তাকে ঘিরে ধরায় শেয়ালটা এঁকেবেঁকে কুকুরগুলোর মাঝখান দিয়ে গলে যেতে লাগল। এমন সময় একটা অপরিচিত সাদা কুকুর কোথা থেকে ছুটে এল; তার পিছনে এল আর একটা কালো কুকুর; সবকিছুই কেমন যেন তালগোল পাকিয়ে গেল। ঘোড়া ছুটিয়ে হাজির হল দুজন শিকারি; একজনের মাথায় লাল টুপি, অপর জনের টুপি সবুজ; সে লোকটি অপরিচিত।
নিকলাস ভাবল, এটা কি হল? এ শিকারি কোত্থেকে এল? এ তো খুড়োর লোক নয়।
শিকারিরা শেয়ালটাকে ধরে ফেলল, কিন্তু সেটাকে নিজের সঙ্গে না বেঁধে সেখানেই অপেক্ষা করতে লাগল। ঘোড়াগুলোও সেখানেই দাঁড়িয়ে পড়ল, আর কুকুরগুলো শুয়ে পড়ল। শিকারিরা হাত ঘুরিয়ে শেয়ালটাকে কি যেন করল। তারপরই একটা শিঙার শব্দ শোনা গেল; একটা যুদ্ধ করা স্থির হলেই এধরনের শিঙাধ্বনি করা হয়।
নিকলাসের সহিস বলল, ইলাগিনের শিকারিরা আমাদের আইভানের সঙ্গে একটা গোলমাল বাধিয়েছে।
নিকলাস একজনকে পাঠিয়ে দিল নাতাশা ও পেতয়াকে ডেকে আনতে; নিজে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল।
নাতাশা ও পেতয়াও ঘোড়ায় চড়ে এসে পড়ল। নিকলাস ঘোড়া থেকে নামল। ব্যাপারটা কিভাবে শেষ হয় দেখবার জন্য অপেক্ষা করতে লাগল। যে শিকারিটি লড়াই করছিল সে ঝোঁপের ভিতর থেকে বেরিয়ে এল। ঘোড়ার পিঠে শেয়ালটাকে বেঁধে নিয়ে তরুণ মনিবের পাশে এসে দাঁড়াল। কিছুটা দূরে থেকেই মাথার টুপিটা খুলে ফেলল, সসম্মানে কিছু বলতেও চেষ্টা করল; কিন্তু তার মুখটা বিবর্ণ হয়ে গেছে, দম আটকে আসছে, রাগে মুখটা লাল হয়ে উঠেছে। একটা চোখে কালসিটে পড়ে গেছে, কিন্তু সে হয়তো সেটা বুঝতেও পারছে না।
কি হয়েছে? নিকলাস শুধাল।
যা হয়ে থাকে, আমাদের কুকুর যে শেয়ালটাকে শিকার করেছে তাকেই ওরা মেরে ফেলেছে! অথচ আমার ধূসর রঙের মাদিটাই একটা ধরেছিল! আইন করতে যাব, বটে!…শেয়ালটাকে ছিনিয়ে নিতে এসেছিল। শেয়ালের সঙ্গে আচ্ছা করে একখানা দিয়েছি! এই তো শেয়ালটা আমার জিনের সঙ্গে বাঁধা! ওটারও একটুখানি স্বাদ পাবার ইচ্ছা আছে কি?… যেন এখনও সে শত্রুর সঙ্গেই কথা বলছে এমনিভাবে ছোরাটা দেখিয়ে শিকারি বলল।
লোকটির সঙ্গে কথা বলতে বলতেই নিকলাস বোন ও পেতয়াকে অপেক্ষা করতে বলে যেখানে শত্রুপক্ষের, অর্থাৎ ইলাগিনের শিকারিরা আছে সেইদিকে ঘোড়া ছুটিয়ে দিল।
বিজয়ী শিকারিটি মাঠের মধ্যে সকলের সঙ্গে মিলিত হলে সকলেই তাকে ঘিরে ধরল, আর যুদ্ধ জয়ের কাহিনী শোনাতে লাগল।
ঘটনাটা এইরকম : পুরনো ঝগড়া নিয়ে ইলাগিনের সঙ্গে রস্তভদের মামলা চলছে। চিরাচরিত প্রথা অনুসারে যে সমস্ত জায়গা রস্তভদের মালিকানাধীন ইলাগিন সেইসব জায়গায় শিকার করে থাকে। আজও রস্তভরা যে জঙ্গলে শিকার করতে এসেছে ইলাগিন ইচ্ছা করেই সেখানে তার লোকজনদের পাঠিয়ে দিয়েছে এবং রস্তভদের কুকুরের তাড়াখাওয়া একটা শেয়ালকে ছিনিয়ে নিয়েছে।
নিকলাস কখনো ইলাগিনকে চোখে দেখেনি, তবু লোকের মুখে তার খাম-খেয়াল ও অত্যাচারের কাহিনী শুনেই সে তাকে অন্তর থেকে ঘৃণা করে এবং তাকে একজন মহাশত্রু বলে মনে করে। রাগে ফুলতে ফুলতে চাবুকটা কঠিন হাতে চেপে ধরে সে এগিয়ে চলল; শত্রুকে কঠোরভাবে শাস্তি দিতে সে কৃতসংকল্প।
