এগোব না পিছোবঃ আঃ, যা হয় হবে, এগিয়েই যাব। নেকড়েটা যেন মনে মনে এই কথা বলেই চারদিকে না তাকিয়ে গুটি গুটি পায়ে সামনের দিকে এগোতে লাগল।
নিকলাস চিৎকার করে উঠল উলল! কিন্তু সে কণ্ঠস্বর যেন তার নিজের নয়; সঙ্গে সঙ্গে তার ঘোড়াটা নিজে থেকেই নালার পর নালা লাফিয়ে পার হয়ে পাহাড় বেয়ে তীরবেগে নামতে লাগল; তার উদ্দেশ্য নেকড়েটাকে এড়িয়ে যাওয়া; কুকুরগুলোও আরো জোরে ছুটতে লাগল। নিজের চিৎকারও নিকলাসের কানে গেল না, সে যে জোর কদমে ছুটছে তাও সে জানে না, কুকুরগুলোকে অথবা যে মাটির উপর দিয়ে সে ছুটছে তাও সে দেখতে পাচ্ছে না : সে দেখছে শুধু নেকড়েটাকে; ক্রমেই দ্রুততর গতিতে নেকড়েটাও সেই একইদিকে ছুটছে। প্রথমেই নিকলাসের চোখে পড়ল, মিলকা ক্রমেই নেকড়েটার দিকে এগিয়ে চলেছে। কাছে, আরো কাছে…মিলকা ক্রমেই নেকড়েটাকে ধরে ফেলছে; কিন্তু নেকড়েটা হঠাৎ মুখটা ঘুরিয়ে রুখে দাঁড়াল, আর মিলকাও হঠাৎ থেমে গিয়ে লেজ তুলে সামনের পা দুটো শক্ত করে ফেলল।
উল্যুলু! নিকলাস চিৎকার করে উঠল।
মিলকার পিছন থেকে ছুটে এল লালচে রঙের লবিয়াম; লাফ দিয়ে নেকড়েটার উপর পড়ে তার পাছাটা কামড়ে ধরল, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই সভয়ে ছিটকে সরে গেল। নেকড়েটা মাটিতে উপুড় হয়ে বসল, দাঁতে দাঁত ঘষতে লাগল, তারপরেই আবার উঠে সামনে ছুটতে লাগল। কুকুরগুলো ফুট দুই দূরে থেকে তার পিছনে ছুটতে লাগল।
কর্কশ গলায় চিৎকার করতে করতে নিকলাস ভাবল, ওটা ঠিক বেরিয়ে যাবে! না, এ অসম্ভব!
এখন তার একমাত্র ভরসা বুড়ো কুকুরটা। সেটাকেই সে খুঁজতে লাগল। এই বয়সে যতটা শক্তি এখনও আছে তাই দিয়েই কারা তার শরীরটাকে যথাসম্ভব টান-টান করে নেকড়েটার পাশাপাশি জোরে ছুটছে তার পথটা আটকে দিতে। কিন্তু নেকড়ের দ্রুতগতির তুলনায় কুকুরের শ্লথগতির বিচারে স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে যে কারা হিসেবে ভুল করেছে। নিকলাস দেখতে পাচ্ছে, জঙ্গলটা আর বেশি দূরে নেই; একবার সেখানে পৌঁছতে পারলেই নেকড়েটা নির্ঘা পালিয়ে যাবে। তখনই সে দেখতে পেল, কয়েকটা কুকুর ও একজন শিকারি সোজা ছুটে যাচ্ছে নেকড়েটার দিকে। এখনও আশা আছে। আর একটা হলদেটে কুকুর সামনের দিক থেকে ছুটে এসে নেকড়েটাকে একধাক্কায় প্রায় উল্টে দিল। কিন্তু নেকড়েটাও অপ্রত্যাশিত দ্রুততার সঙ্গে লাফ দিয়ে উঠেই দাঁত কড়মড় করে কুকুরটার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল, আর কুকুরটা তীব্র আর্তনাদ করে মুখ থুবড়ে মাটিতে পড়ে গেল; তার পেটের পাশ থেকে রক্ত ঝরতে লাগল।
নিকলাস আর্তকণ্ঠে ডাকল, কারা। বুড়ো বাছারে!…
নেকড়েটা এভাবে বাধা পাওয়ায় বুড়ো কুকুরটা তার পাঁচ পায়ের মধ্যে পৌঁছে গেল। যেন বিপদ বুঝতে পেরেই নেকড়েটা কারার দিকে ঘুরে তাকাল এবং লেজ গুটিয়ে দ্রুততর গতিতে ছুটতে শুরু করল। ঠিক এইসময় নিকলাস শুধু দেখতে পেল, কারার একটা কিছু ঘটেছে-হঠাৎ সে নেকড়েটার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল, আর তারপরই ঠিক তার সামনেই একটা নালার মধ্যে পড়ে দুইজনেই গড়াগড়ি খেতে লাগল।
ঠিক সেইমুহূর্তে নিকলাস যখন দেখতে পেল নেকড়েটা নালার মধ্যে পড়ে কুকুরগুলোর সঙ্গে লড়াই করছে, এবং কুকুরগুলোর তলা থেকে তার ধূসর লোম, টান-টান করা পিছনের পা এবং ভীত রুদ্ধশ্বাস মাথাটা শুধু দেখা যাচ্ছে (কারা নেকড়েটার টুটি চেপে ধরেছে), তখনকার মতো সুখ সে জীবনে কখনও পায়নি। ঘোড়ার জিনে হাত রেখে লাফিয়ে নেমে নেকড়েটাকে ছুরিকাহত করতে যাবে এমন সময় হঠাৎ নেকড়েটা আবার কুকুরগুলোর মাঝখান থেকে মাথাটা বের করল এবং সামনের দুটো থাবা দিয়ে নালার উপরটা আঁকড়ে ধরল। দাঁতে দাঁত ঘষে (তার গলা থেকে তখন তার দাঁত সরে গেছে) পিছনের পায়ে ভর করে এক লাফে নালার ভিতর থেকে উঠে পড়ল এবং কুকুরগুলোর হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে লেজ গুটিয়ে আবার সামনের দিকে ছুট দিল। কারার গায়ের নোম এলোমেলো হয়ে গেছে, শরীরটা অনেক জায়গায় কেটে গেছে; অনেক কষ্টে সে নালার ভিতর থেকে উঠে এল।
নিকলাস হতাশায় চেঁচিয়ে উঠল, হায় ঈশ্বর! একি হল?
খুড়োর শিকারি ততক্ষণে অপর দিক থেকে নেকড়েটার পথের দিকে ঘোড়া ছুটিয়ে এল, আর তার কুকুরটা আর একবার নেকড়েটাকে বাধা দিল। সেটা আটকা পড়ে গেল।
নিকলাস ও তার অনুচর এবং খুড়ো ও তার শিকারি–সকলেই উল বলে চিৎকার করতে করতে জন্তুটাকে ঘিরে ধরল। বার বার সেটা ছুটে বেরিয়ে যেতে চাইছে জঙ্গলের দিকে, কিন্তু কিছুতেই পারছে না।
ওদিকে উল্যুলু ধ্বনি শুনে দানিয়েল জঙ্গলের ভিতর থেকে ছুটে বেরিয়ে এল। নিঃশব্দে সে ঘোড়া ছুটিয়ে এল; বাঁ হাতে খাপ-খোলা ছুরি, আর ডান হাতের চাবুক অনবরত পড়ছে ঘোড়াটার পেটে।
বাদামি ঘোড়াটা হাঁপাতে হাঁপাতে ভারি নিঃশ্বাস ফেলে তার পাশ দিয়ে চলে যাবার আগে নিকলাস দানিয়েলকে দেখতে পায়নি, তার কথাও কানে যায়নি। এবার একটা শরীরের ধপাস করে মাটিতে পড়ার শব্দ শুনে সে তাকিয়ে দেখল, কুকুরগুলোর মাঝখানে দানিয়েল নেকড়েটার পিঠের উপর চেপে বসে তার কান দুটো পাকড়ে ধরবার চেষ্টা করছে। কুকুরগুলো, শিকারিরা, এমন কি নেকড়েটাও বুঝতে পেরেছে যে সব শেষ হয়ে গেছে। ভয়ার্ত নেকড়েটা কান দুটো নামিয়ে উঠতে চেষ্টা করল, কিন্তু কুকুরটা তাকে চেপে ধরে আছে। দানিয়েল একটুখানি উঠে এক পা এগিয়ে সমস্ত শরীরের ভর দিয়ে নেকড়েটার উপর শুয়ে পড়ে তার কান দুটো চেপে ধরল। নিকলাস ছুরি দিয়ে আঘাত করতে যাচ্ছিল, কিন্তু দানিয়েল ফিসফিস করে বলল, ও কাজ করবেন না; আমরা ওটার মুখ বন্ধ করে দিচ্ছি! সে সরে গিয়ে নেকড়েটার গলার উপর পা রাখল। তার চোয়ালের ভিতর দিয়ে একটা লাঠি ঢুকিয়ে দিয়ে একটা চাবুক দিয়ে সেটাকে লাগামের মতো করে বাঁধা হল। পাগুলোকেও একত্র করে বেঁধে দানিয়েল দুই একবার সেটাকে এ-পাশ থেকে ও-পাশ উল্টে দিল।
