মুখ ফিরিয়ে কাউন্ট দেখল তার ঠিক ডাইনে মিকা এমনভাবে তার দিকে তাকিয়ে আছে যেন তার চোখ দুটো মাথা থেকে ঠিকরে বেরিয়ে আসবে; মাথার টুপি খুলে সে অন্য দিকে কি যেন দেখাচ্ছে।
ঐ দেখুন! এমন স্বরে সে চেঁচিয়ে বলল যেন অনেকক্ষণ ধরেই কথাটা বলবার চেষ্টা সে করছিল; এখন কুকুরের বাসাটা ছেড়ে দিয়ে সে কাউন্টের দিকে ঘোড়া ছুটিয়ে দিল।
কাউন্ট ও সাইমনও ঘোড়া ছুটিয়ে জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এল; বাঁদিকে তাকিয়েই দেখতে পেল, একটা নেকড়ে ধীরে ধীরে এপাশ ওপাশ করে নিঃশব্দে ঠিক সেইদিকপানে লাফ দিল যেখানে তারা এতক্ষণ দাঁড়িয়েছিল। ক্রুদ্ধ কুকুরটা ছাড়া পেয়ে ঘোড়ার পায়ের ফাঁক দিয়ে নেকড়েটার দিকে ছুটে গেল।
নেকড়েটা থামল, অদ্ভুতভাবে ভারি কপালটা কুকুরগুলোর দিকে ফেরাল, শরীরটাকে বারকয়েক এদিক ওদিকে দোলাল, দুটো লাফ দিল, আর তারপরেই লেজের একটা ঝাপ্টা মেরে বনের প্রান্তে অদৃশ্য হয়ে গেল। আর ঠিক সেইমুহূর্তে প্রায় আর্তনাদের মতো সুরে চিৎকার করতে করতে একটার পর একটা কুকুরের গোটা দলটাই বিপরীত দিকের জঙ্গল থেকে এলোপাথাড়িভাবে লাফাতে লাফাতে মাঠ পেরিয়ে ঠিক সেই জায়গাটার দিকে গেল যেখানে থেকে নেকড়েটা অদৃশ্য হয়ে গেছে। হ্যাঁজেলের ঝোঁপকে দুই ভাগ করে ঘামে ভিজে বেরিয়ে এল দানিয়েলের বাদামি ঘোড়াটা। দানিয়েল সামনে কুঁজো হয়ে ঝুঁকে বসে আছে; মাথায় টুপি নেই, ঘর্মাক্ত লাল মুখে ছড়িয়ে পড়েছে এলোমেলো লম্বা সাদা দাড়ি।
চিৎকার করে বলছে, উল্যুলু!…কাউন্টকে দেখেই তার চোখ ফুলিঙ্গের মতো জ্বলে উঠল।
শাসনের ভঙ্গিতে চাবুকটা কাউন্টের দিকে তুলে চেঁচিয়ে বলল, জাহান্নামে যান! নেকড়েটাকে পালিয়ে যেতে দিলেন!…কীরকম শিকারি! তারপর যেন ভীত, লজ্জিত কাউন্টকে অধিক কথা বলতে ঘৃণাবোধ করেই সক্রোধে ঘোড়র পেটে চাবুক কসিয়ে কুকুরগুলোর পিছন পিছন ছুটে চলে গেল। স্কুলের দণ্ডিত ছাত্রের মতো কাউন্ট চারদিকে তাকাতে লাগল; এই অসহায় অবস্থায় সাইমনের সহানুভূতি পাবার আশায় একটু হাসতে চেষ্টা করল। কিন্তু সাইমনও তখন সেখানে নেই। সেও ঝোঁপঝাড়ের পাশ দিয়ে ঘোড়া ছুটিয়ে দিয়েছে; সকলেই নেকড়েটাকে ধরতে চাইছে, কিন্তু তার আগেই নেকড়েটা জঙ্গলের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেছে।
.
অধ্যায়–৫
এদিকে নিকলাস রস্তভ তখনও নেকড়ের অপেক্ষায় তার জায়গায়ই রয়েছে। শিকার যেভাবে এগোচ্ছে ও। পিছিয়ে যাচ্ছে, পরিচিত গলায় কুকুরগুলো যেভাবে ডাকছে, শিকারিদের গলা যেভাবে এগোচ্ছে, পিছোচ্ছে ও উঠছে, তা থেকেই সে বুঝতে পারছে ঝোঁপের ভিতরে কি ঘটছে। সে বুঝতে পেরেছে, ধাড়ি ও বাচ্চা নেকড়েগুলো সেখানেই আছে, কুকুরগুলো দুই দলে ভাগ হয়ে গেছে, কোনো এক জায়গায় নেকড়েটাকে তাড়া করা হচ্ছে, আর কোথাও একটা কোনো গোলমাল হয়েছে। সে আশা করছে, যেকোন মুহূর্তে নেকড়েটা তার দিকেই আসবে। কোথায় এবং কোনদিক থেকে জন্তুটা আসবে, আর সেই বা কিভাবে সেটার উপর ঝাঁপিয়ে পড়বে,-এ নিয়ে হাজার রকমের মতলব তার মাথায় ঘুরতে লাগল। কখনো আশা, কখনো হতাশা। বারকয়েক ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা জানাল, নেকড়েটা যেন তার পথ দিয়েই আসে। ঈশ্বরকে বলল, আমার জন্য এটুকু করা তোমার পক্ষে আর কি? আমি জানি তুমি অনেক বড়, তোমার কাছে এত তুচ্ছ প্রার্থনা জানানো পাপ, কিন্তু দোহাই তোমার, বুড়ি নেকড়েটাকে আমার দিকে এনে দাও আর কারা সেটার উপর লাফিয়ে পড় ক-ওখানে দাঁড়িয়ে খুড়ো তো সবই দেখছে, তাই তার চোখের সামনেই এটা ঘটুক-এবং মরণকামড় দিয়ে সেটার টুটি চেপে ধরুক।
তারপরেই রস্তভ ভাবল, না, সে সৌভাগ্য আমার হবে না, অথচ হলে কী ভালোই না হত! এ হবার নয়! কি তাসে কি যুদ্ধে, সর্বত্রই আমার ভাগ্য খারাপ। অস্তারলিজ ও দলখভের স্মৃতি অতি দ্রুত তার মনের পটে স্পষ্ট ফুটে উঠল। জীবনে শুধু একবার একটা ধাড়ি নেকড়েকে কজা করতে চাই, শুধু এইটুকুই চাই!
আবার সে ডান দিকে তাকাল; পরিত্যক্ত মাঠ পেরিয়ে কি যেন তার দিকেই ছুটে আসছে। না, এ হতে পারে না! দীর্ঘদিনের আশার পরে কিছু পেলে মানুষ যেরকম করে সেইভাবেই একটা দীর্ঘশ্বাস টেনে রস্তভ ভাবল। চরম চরম সুখের ক্ষণটি সমাগত–কিন্তু এসেছে এত সহজে, কোনোরকম সতর্ক না করে, শব্দ না করে, আড়ম্বর না করে, যে রস্তভ নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারল না, এক সেকেন্ডের উপর সন্দেহেই কাটল। নেকড়েটা ছুটে এল, একলাফে একটা নালা পার হল। নেকড়েটা বুড়ি, তার পিঠটা ধূসর, লম্বা পেটটা লাল। ছুটছে ধীরেসুস্থে সে জানে যে কেউ তাকে দেখতে পাচ্ছে না। দমবন্ধ করে রস্তভ কুকুরগুলোর দিকে তাকাল। সেগুলো কতক দাঁড়িয়ে, কতক শুয়ে আছে; তারা নেকড়েটাকে দেখতে পায়নি, তাই পরিস্থিতিটাও বুঝতে পারছে না। বুড়ো কারা মাথাটা ঘুরিয়ে রেগেমেগে হলদে দাঁত বের করে মাছি ধরবার তাল করছে।
রস্তভ ঠোঁট ফুলিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল, উল্যুলুলু! কুকুরগুলো কান খাড়া করে লাফিয়ে উঠল। কারা পাছা চুলকানো বন্ধ করে কান খাড়া করল, লেজ নাড়তে নাড়তে উঠে দাঁড়াল।
জঙ্গলের ভিতর থেকে নেকড়েটাকে আসতে দেখে নিকলাস নিজের মনেই বলল, আমি কি ওগুলোকে ছেড়ে দেব, না ধরব? সহসা নেকড়েটার চেহারাটাই পাল্টে গেল; যা হয় তো আগে কখনো দেখেনি–একটি মানুষ তার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে-তা দেখে সে কেঁপে উঠল এবং রস্তভের দিকে মাথাটা একটু বাড়িয়ে থেমে গেল।
