খুড়ো বলল, খুব ভালো কথা ছোট্ট কাউন্টেস, শুধু খুব সাবধান, ঘোড়ার পিঠ থেকে যেন পড়ে যেয়ো না, কারণ-তাই বল, চলে এস!-ধরবার মতো কিছুই তো হাতের কাছে নেই।
অত্রানুদের জঙ্গলের ভিতরকার মরুদ্যানটি শ দুই গজ দূর থেকেই চোখে পড়ল, শিকারিরা তার কাছে প্রায় পৌঁছে গেছে। খুড়োর সঙ্গে কথা বলে রস্তভ ঠিক করে ফেলেছে কুকুরগুলোকে কোথায় লেলিয়ে দেবে; তারপর নাতাশা কোথায় দাঁড়াবে সেটা দেখিয়ে দিয়ে সে ঘুরে খাঁড়ির উপরে উঠে গেল।
খুড়ো বলল, দেখ ভাইপো, একটা বড় নেকড়ে ধরতে যাচ্ছ। দেখো যেন পালাতে না পারে!
দেখা যাক কি হয়, রস্তভ জবাব দিল। ক্যারা, এখানে আয়! দুর্দান্ত বুড়ো কুকুরটাকে ডেকেই যেন সে খুড়োর কথার জবাবটা শেষ করল। সকলেই যার যার জায়গা বেছে নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল।
অন্তরের দিক থেকে একজন অনুরাগী শিকারি না হলেও কাউন্ট ইলিয়া রস্তভ শিকারের আইন-কানুন ভালোই জানে; জঙ্গলের একপ্রান্তে পৌঁছে সে বাঁশ হাতে নিল, ভালো করে আসনে বসল এবং সবরকমে তৈরি হয়ে স্মিত হেসে চারদিকে তাকাল।
তার পাশেই রয়েছে খাস খানসামা সাইমন চেকমান; লোকটির বয়স হয়েছে, মনিব ও তার ঘোড়ার মতোই তার শরীরেও মেদ জমেছে। জঙ্গলের ধার বরাবর শ খানেক পা দূরে রয়েছে কাউন্টের অপর সহিস মিকা; লোকটা দুঃসাহসী ঘোড়সওয়ার এবং শিকারি কুকুরের খুব ভালো পরিচালক। রীতি অনুযায়ী কাউন্ট রুপোর কাপভর্তি ব্র্যান্ডি টেনেছে, অল্পস্বল্প কিছু খেয়েছে, এবং আধ বোতল প্রিয় পানীয় বোর্দু গলায় ঢেলে সেটাকে পাকস্থলীকে পাঠিয়েছে।
মদের প্রভাবে এবং এতটা পত গাড়ি চালিয়ে আসার দরুন কাউন্টের মুখ কিছুটা লাল হয়েছে। চোখ দুটো ভিজে চকচক করছে। লোমের কোট শরীরটা জড়িয়ে জিনে বসা অবস্থায় এখন তাকে বেড়াতে বের-হওয়া ছোট ছেলের মতো দেখাচ্ছে।
সবকিছু ঠিকঠাক করে নিয়ে গাল-বসা শুটকো চেহারার চেকমার বার বার মনিবের দিকে তাকাচ্ছে। তিরিশ বছর সে এই মনিবের সঙ্গে ঘর করছে, তাই তার হালহকিকৎ সে ভালোই বোঝে; সে জানে, মনিব এখনই একটু গালগল্প শুরু করবে। একটি তৃতীয় ব্যক্তি বনের পথে ঘুরে এসে কাউন্টের পিছনে ঘোড়া থামাল। লোকটি বুড়ো, মুখময় সাদা দাড়ি, পরনে মেয়েদের জোব্বা, মাথায় গাধার টুপি। লোকটি ভাড়, মেয়েদের চলতিনাম নাস্তাসিয়া আইভানভনা বলেই সকলে তাকে ডাকে।
তার দিকে চোখ টিপে কাউন্ট ফিসফিস করে বলল, দেখ নাস্তাসিয়া আইভানভনা, তুমি যদি ভয় দেখিয়ে শিকারকে তাড়িয়ে দাও তাহলে দানিয়েল কিন্তু মজাটা টের পাইয়ে দেবে।
টের পাওয়াতে আমিও একটু-আধটু জানি, নাস্তাসিয়া আইভানভনা বলল।
চুপ! বলেই সাইমনের দিকে ফিরে কাউন্ট শুধাল, ছোট কাউন্টেসকে দেখেছ কি? সে কোথায়?
তিনি ছোট কাউন্ট পিতরের সঙ্গে আছেন, সাইমন হেসে জবাব দিল। মহিলা হলেও তার খুব শিকারের শখ।
কাউন্ট বলল, আর সে কিরকম ঘোড়া চালায় দেখেছ সাইমন? এ ব্যাপারে সে অনেক পুরুষেরই সমকক্ষ!
সে তো বটেই! চমৎকার। যেমন সাহস, তেমনই সহজ।
আর নিকলাস? সে কোথায়? লিয়াদভে কি?
আজ্ঞে হ্যাঁ। কোথায় জায়গা নিতে হবে তিনি ভালোই জানেন। ব্যাপারটা তিনি এত ভালো বোঝেন যে দানিয়েল ও আমি অনেক সময় অবাক হয়ে যাই, মনিবকে খুশি করবার জন্যই সাইমন বলল।
ঘোড়ায় চড়তেও ভালোই জানে, কি বল? আর ঘোড়ার পিঠে তাকে দেখায়ও সুন্দর, কি বল?
একেবারে ছবি! সেদিন জাভারিনস্ক ঝোঁপের কাছে একটা শেয়ালকে কিরকম তাড়া করেছিলেন। সেগুলো যখন গর্ত থেকে বেরিয়ে ছুট দিল, সে কী দৃশ্য!…ঘোড়াটার দামই হাজার রুবল, আর সওয়ারটি তো সবরকম দামের উর্ধ্বে!…সত্যি, এরকম চটপটে আর একজনকে খুঁজতে হলে অনেক পথ পার হতে হবে!
যেন সাইমনের প্রশংসটা যথেষ্ট হয়নি এমনিভাবে কাউন্ট বলল, অনেক পথ পার হতে হবে… তারপরই নস্যিদানটা খুঁজতে লাগল।
কি যেন নস্যিদান হাতেই রইল, কাউন্ট সোজা সামনের দিকে তাকাল। কুকুরগুলো চিৎকারের পরেই ভেসে এল দানিয়েলের শিকারি-শিঙার গম্ভীর নেকড়ের ডাক। সবগুলো কুকুর একসঙ্গে মিলে ডাকাডাকি শুরু করে দিল। সে ডাক শুনে বোঝা গেল ওরা নেকড়েটার পিছু নিয়েছে। কুকুর-রক্ষীরা এবার উল বলে চেঁচাতে লাগল, আর সেসব কিছু ছাপিয়ে ভেসে এল দানিয়েলের কণ্ঠস্বর-কখনো গম্ভীর, কখনো কর্কশ। সে কণ্ঠস্বর সারা জঙ্গলকে ভরে তুলে বাইরের প্রান্তরে অনেকদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ল।
চুপচাপ কান পেতে কয়েক মিনিট শুনে কাউন্ট ও তার অনুচররা বুঝতে পারল যে কুকুরগুলো দুই দলে ভাগ হয়ে গেছে; একদলের শব্দ ক্রমে দূরে মিলিয়ে যাচ্ছে, আর একদল কাউন্টদের পাশ কাটিয়ে জঙ্গলের পাশ দিয়ে চলে গেল; এই দলেই দানিয়েলের গলায় শোনা গেল-উল। দুই দলের আওয়াজ মিশে গিয়ে দূর থেকে দূরে মিলিয়ে গেল।
সাইমন একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলল। হাতের নস্যদানটার দিকে নজর পড়ায় কাউন্ট সেটা খুলে একটিপ নস্য নিল। একটা কুকুরকে টেনে ধরে সাইমন চিৎকার করে উঠল, ফিরে আয়! কাউন্ট চমকে উঠল; তার হাত থেকে নস্যাদানটা পড়ে গেল। নাস্তাসিয়া আইভানভনা ঘোড়া থেকে নেমে সেটা তুলে দিল। কাউন্ট ও সাইমন তার দিকে তাকাল।
তারপরই অপ্রত্যাশিতভাবে, যদিও এরকমটা প্রায়ই ঘটে থাকে, শিকারিদের শব্দটা হঠাৎ তাদের খুব কাছেই শোনা গেল; মনে হল দানিয়েল উল্যুলু বলে যেন একেবারে সামনেই চেঁচাচ্ছে।
