আমাদের যাওয়া উচিত; তোমার কি তাই মনে হয় না? নিকলাস বলল। উভাকাকে নিয়ে চলে এস।
আপনার যেমন ইচ্ছা।
তাহলে এখনকার মতো খাওয়ানো বন্ধ রাখ।
ঠিক আছে স্যার।
পাঁচ মিনিট পরেই দানিয়েল ও উভার্কা নিকলাসের বড় পড়ার ঘরে এসে হাজির হল। দানিয়েল বড়-বড় গোছের মানুষ নয়, কিন্তু তাকে একটা ঘরের মধ্যে দেখা মানেই মানুষের ব্যবহার্য আসবাবপত্রের মাঝখানে ও সেই পরিবেশে একটা ঘোড়া বা ভালুককে দেখা। দানিয়েল নিজেও সেটা বোঝে, তাই যথারীতি দরজার ঠিক মুখেই সে দাঁড়িয়েছে, পাছে মনিবের ঘরের কিছু ভেঙে ফেলে এই ভয়ে নড়াচড়া না করে আস্তে কথা বলতে চেষ্টা করছে এবং যাতে ছাদের নিচ থেকে বেরিয়ে তাড়াতাড়ি খোলা আকাশের নিচে গিয়ে দাঁড়াতে পারে সেইজন্য দরকারি কথাগুলো তাড়াতাড়ি সেরে নিচ্ছে।
কথাবার্তা শেষ করে নিকলাস ঘোড়ার পিঠে সাজ পরাতে বলল। দানিয়েল সবে যাবার জন্য পা বাড়িয়েছে ঠিক সেইসময় নাতাশা দ্রুত পা ফেলে এসে হাজির হল; চুল বাঁধা হয়নি, সাজ-পোশাক শেষ হয়নি, বুড়ি নার্সের বড় শালটা জড়িয়েই চলে এসেছে। সেইসময়ই পেতয়াও দৌড়ে এল।
নাতাশা শুধাল, তুমি যাচ্ছ? আমি জানতাম তুমি যাবে! সোনিয়া বলেছিল তুমি যাবে না, কিন্তু আমি জানতাম আজকের মতো দিনে তুমি কখনো না গিয়ে পারবে না।
হ্যাঁ, আমরা যাচ্ছি, নিকলাস অনিচ্ছাসত্ত্বেও জবাব দিল, কারণ তার ইচ্ছা আজ খুব ভালো করে শিকার করবে, আর তাই নাতাশা ও পেতয়াকে সঙ্গে নেবে না। আমরা যাচ্ছি শুধু নেকড়ে শিকার করতে; সে তোমাদের ভালো লাগবে না।
নাতাশা বলল, তুমি জান ওতেই আমার সবচাইতে বেশি আনন্দ; এটা উচিত হয়নি; তুমি নিজে যাচ্ছ, ঘোড়ার সাজ পরিয়েছ, অথচ আমাদের কিছুই বলনি।
পেতয়া বলল, কোনও বাধাই একজন রুশকে রুখতে পারে না–আমরাও যাব!
নিকলাস নাতাশাকে বলল, কিন্তু তা হয় না। মামণি বলেছে তোমাদের যাওয়া চলবে না।
নাতাশা দৃঢ় গলায় বলল, হ্যাঁ, আমি যাবই। নিশ্চয় যাব। দানিয়েল, ওদের বল আমাদের জন্য ঘোড়া তৈরি করতে। আর মাইকেল চলুক আমার কুকুরগুলো নিয়ে।
দানিয়েলের মনে হল, কোনো ঘরে ঢোকাই তার পক্ষে বিরক্তিকর ও অনুচিত, আর কোনো তরুণীর ব্যাপারে থাকা তো একেবারেই অসম্ভব। চোখ নামিয়ে সে এমনভাবে দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে গেল যাতে অসাবধানে তরুণীটি কোনোভাবে আঘাত না পায়।
.
অধ্যায়–৪
বুড়ো কাউন্ট সবসময়ই শিকারের একটা বড় আয়োজন, লোকজন ও জিনিসপত্র তৈরি রাখত; এখন সেগুলো সম্পূর্ণরূপে ছেলের হাতে ছেড়ে দিয়েছে। আজ ১৫ই সেপ্টেম্বর সে খুব খোশমেজাজে ছিল, তার তাই শিকারিদলের সঙ্গে যাবার জন্য প্রস্তুত হল।
এক ঘণ্টার মধ্যেই শিকারের পুরো দলটা ফটকে হাজির হল। নাতাশা ও পেতয়া নিকলাসকে কি যেন বলতে চাইল, কিন্তু সেসব বাজে কথা শুনবার সময় এখন নিকলাসের নেই, সে তাদের দুজনকে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে গেল। শিকারের সব আয়োজন একবারও দেখে নিল, শিকারের সন্ধানে একদল কুকুর ও শিকারিকে আগে পাঠিয়ে দিল, বাদামি রঙের, দোনেকসের পিঠে সওয়ার হল এবং শিস দিয়ে ইঙ্গিতে কুকুরগুলোকে এগিয়ে যেতে বলে অত্রানু-র জঙ্গলের দিকে ঘোড়া ছুটিয়ে দিল। বুড়ো কাউন্টের ঘোটকিটাকে নিয়ে চলল একজন সহিস আর সে নিজে চলল একটা ছোট গাড়িতে চেপে।
তাদের সঙ্গে চলল চুয়ান্নটি শিকারি কুকুর আর ছজন অনুচর ও সহকারী। পরিবারের লোকজন ছাড়া সঙ্গে গেল আটজন কুকুর-রক্ষী এবং চল্লিশ জনের বেশি চাকরবার।
প্রায় এক ভার্স্ট পথ যাবার পরে কুকুরসহ আরো পাঁচটা অশ্বারোহী কুয়াশার ভিতর থেকে বেরিয়ে রস্তভদের দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। তাদের সামনে মস্তবড় সাদা গোঁফওয়ালা একটি সোম্যদর্শন বৃদ্ধ।
বুড়ো মানুষটি আরো কাছে এলে নিকলাস বলল, শুভ সকাল খুড়ো!
তাই বল। এগিয়ে এস!…আমি এটা ঠিক জানতাম, খুড়ো বলতে শুরু করল। (লোকটি রস্তভদের দূর সম্পর্কে আত্মীয়, স্বল্পবিত্ত প্রতিবেশী।) আমি জানতাম এ আকর্ষণ তোমরা এড়াতে পারবে না; ভালোই হল যে তোমরাও চলেছ। তাই বল! এগিয়ে এস! (এই কথাগুলো খুড়োর মুদ্রাদোষ।) এখনই চলে যাও। আমার গিরচিক বলছে, ইলগিনরা কুকুর সঙ্গে নিয়ে কর্নিকিতে পৌঁছে গেছে। তাই বল, এগিয়ে এস!…নইলে তোমাদের নাকের ডগা দিয়ে তারা বাঘের বাচ্চাগুলোকে নিয়ে যাবে।
আমি সেখানেই যাচ্ছি। আমরা তোমার দলে যোগ দেব কি?
সব শিকারি কুকুরগুলোকে একদলে যুক্ত করে দেওয়া হল, আর খুড়ো ও নিকলাস ঘোড়ায় চেপে পাশাপাশি চলতে লাগল। নাতাশা সারা শরীর শালে জড়িয়ে জোর কদমে ঘোড়া ছুটিয়ে এসে তাদের সঙ্গে মিলিত হল। তার পিছন পিছন এল পেতয়া, শিকারি মাইকেল ও তাকে দেখাশুনা করবার জন্য নিযুক্ত একটি সহসি।
খুড়ো মুখটা ঘুরিয়ে অসম্মতিসূচক দৃষ্টিতে পেতয়া ও নাতাশার দিকে তাকাল। শিকারের মতো একটা গুরুতর ব্যাপারকে সে ছেলেমানুষের সঙ্গে জড়িয়ে ফেলতে চায় না।
পেতয়া চিৎকার করে বলল, শুভ সকাল খুড়ো! আমরাও যাচ্ছি।
শুভ সকাল! শুভ সকাল! কিন্তু কুকুরগুলোকে ছাড়িয়ে যেয়ো না, খুড়ো কঠোর স্বরে বলল।
নাতাশা বলল, আমরা তোমার পথের বিঘ্ন হব একথা ভেবো না খুড়ো। আমরা ঠিক আমাদের পথ ধরে চলব, একটু এদিক-ওদিক যাব না।
