দাসীদের মুখে সব কথা শুনে কাউন্টেস এই ভেবে শান্ত হল যে এবার তাদের বিষয়-সম্পত্তির উন্নতি হবে, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে তার একটা দুশ্চিন্তা হল যে এই উত্তেজনার ফলে ছেলের ক্ষতি হতে পারে। পা টিপে টিপে সে বারকয়েক তার দরজায় গিয়ে কান পাতল, আর ওদিকে ছেলে একটার পর একটা পাইপ ধরিয়ে টানতে লাগল।
পরদিন বুড়ো কাউন্ট ছেলেকে একান্তে ডেকে নিয়ে বিব্রত মুখে বলল, কিন্তু বোঝ তো বাবা, এটা খুবই দুঃখের যে তুমি এতটা উত্তেজিত হয়েছিলে! মিতেংকা আমাকে সব কথা বলেছে।
নিকলাস ভাবল, আমি জানতাম এই পাগলা সংসারে আমি কোনোদিন কিছু বুঝতে পারব না।
ঐ সাতশ রুবল খাতায় লেখেনি বলে তুমি রাগ করেছ। কিন্তু সে টাকাটা জের টানা হয়েছিল–আর তুমিও পরের পাতাটা উল্টে দেখনি।
বাপি, ও তো একটা ঠগ ও চোর! আমি ওকে চিনি! আমি যা করেছি তা করেছি; তবে তুমি যদি চাও তো আর কোনোদিন তার সঙ্গে কথা বলব না।
না বাবা, না; আমি তোমাকে কাজকর্ম দেখতে অনুরোধ করছি। আমি বুড়ো হয়েছি। আমি…
না বাপি, আমি যদি তোমার অসন্তোষের কারণ হয়ে থাকি সেজন্য আমাকে ক্ষমা কর। এসব আমি তোমার চাইতে অনেক কম বুঝি।
এইসব চাষীদের ব্যাপার আর টাকাপয়সার ব্যাপার, এক পাতা থেকে আর এক পাতায় জের টানা–সব উচ্ছন্নে যাক, সে ভাবতে লাগল। তাস খেলার টুকিটাকি আমি বুঝি, কিন্তু আর এক পাতায় জের টানাটা বুঝি না। কিছু বুঝি না। সেই থেকে সে আর বিষয়-সম্পত্তির ব্যাপারে নাক গলাত না। কিন্তু একদিন কাউন্টেস ছেলেকে ডেকে বলল, আন্না মিখায়লভনার কাছ থেকে সে দুই হাজার রুবলের একটা হাত-চিঠি পেয়েছে; এখন সেটা নিয়ে কি করা যায়।
নিকলাস জবাব দিল, এটা তো! তুমি বলছ এটা আমার উপর নির্ভর করছে। দেখ, আমি আন্না মিখায়লভনাকেও পছন্দ করি না, বরিসকেও পছন্দ করি না, কিন্তু তারা আমাদের বন্ধু, তারা গরিব। বেশ তো, তাহলে এই-বলেই সে হাত-চিঠিটা ছিঁড়ে ফেলল, আর তা দেখে বুড়ো কাউন্টেস আনন্দে কেঁদে ফেলল। তারপর থেকে হোট রস্তভ আর কখনো বিষয়-সম্পত্তির ব্যাপারে কোনোরকম অংশ নিত না, কিন্তু পরিপূর্ণ উৎসাহের সঙ্গে একটা নতুন কাজে আত্মনিয়োগ করল-শিকার-সে ব্যাপারে তার বাবা একটা মস্ত বড় ব্যবস্থা সব সময়ই তৈরি রাখত।
.
অধ্যায়-৩
এর মধ্যেই আবহাওয়ায় শীতের ছোঁয়া লেগেছে; হেমন্তের বর্ষণসিক্ত ভোরের কুয়াশা মাটির উপর ঘন হয়ে নেমেছে। মাঠের সবুজ রং আরো ঘন হয়েছে; গোবৎসাদির পায়ে মাড়ানো শীতকালীন ফসলের বাদামি ফালি এবং বসন্তকালীন ফসলের হলদেটে ডাটা ও গমের লালচে ফালির পশ্চাৎপটে মাঠের উজ্জ্বল সবুজের আভা আরো উজ্জ্বল মনে হচ্ছে। জঙ্গলে ঢাকা খাড়ি ও ঝোঁপঝাড়গুলো আগস্টের শেষভাগে কালো মাঠ ও ডাটাগুলোর মাঝে মাঝে সবুজ দ্বীপের মতো শোভা পাচ্ছে; এখন শীতকালীন গমের সবুজের মাঝখানে সেগুলিকে সোনালি ও উজ্জ্বল লাল রঙের দ্বীপ বলে মনে হচ্ছে। খরগোসরা এর মধ্যেই গ্রীষ্মকালীন আবরণ অর্ধেক পাল্টে ফেলেছে, শেয়ালের বাচ্চাগুলো এখানে-ওখানে ছড়িয়ে পড়েছে, আর নেকড়ের বাচ্চাগুলো কুকুরের চাইতে বড় হয়ে উঠেছে। শিকারের পক্ষে বছরের এটাই সেরা সময়।
শিকারি কুকুরগুলোকে সারা দিন বাড়িতেই বেঁধে রাখা হল। সন্ধ্যার দিকে আকাশ কুয়াশায় ঢেকে গেল, ধীরে ধীরে বরফ পড়তে শুরু করল। ১৫ তারিখে ছোট রস্তভ ড্রেসিং-গাউন চাপিয়ে জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে দেখতে পেল শিকারের পক্ষে এমন সুন্দর সকাল বুঝি আর হয় না : মনে হল আকাশ যেন গলে গলে পড়ছে আর মাটিতে ডুবে যাচ্ছে। এতটুকু বাতাস নেই; ছোট ছোট তুষারবিন্দু ফোঁটায় ফোঁটায় ঝরে পড়ছে। স্বচ্ছ তুষারবিন্দুগুলির ভারে বাগানের পত্রবিহীন শাখাগুলি হেলে পড়েছে; সদ্য খসে-পড়া পাতার উপর তুষারবিন্দুগুলি টুপটাপ করে ঝরছে। নিকলাস বাইরের স্যাঁৎসেঁতে কর্দমাক্ত ফটকে বেরিয়ে এল। বাতাসে পচা পাতা ও কুকুরের গন্ধ। কালো ফুটকিওয়ালা কুকুর মিলকা মনিবকে দেখে পিছনের পা দুটি ছড়িয়ে দিল, কিছুক্ষণ খরগোসের মতো শুয়ে থাকল, তারপর হঠাৎ লাফিয়ে উঠে তার নাক গোঁফ চেটে দিল। আর একটা কুকুর লেজ তুলে ছুটে এসে তার পায়ে গা ঘষতে লাগল।
ও-হয়! ঠিক সেইমুহূর্তে ভেসে এল শিকারিদের অনুকরণীয় ডাক এবং মোড়ের মুখে দেখা দিল প্রধান শিকারি ও প্রধান কুকুর-রক্ষক দানিয়েল; মুখভর্তি বলিরেখা, ইউক্রেনিয় কেতায় কপালের উপর থেকেই চুল ছাঁটা, হাতে একটা লম্বা বাঁকা চাবুক, দুই চোখে শিকারিসুলভ স্বাতন্ত্র্য ও তাচ্ছিল্যের দৃষ্টি। মাথার টুপিটা তুলে সে তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে মনিবের দিকে তাকাল। মনিব কিন্তু সে তাচ্ছিল্যকে দোষের মনে করল না। নিকলাস জানে, যতই সকলকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করুক, যতই নিজেকে সকলের চাইতে বড় মনে করুক, তবু সে তারই ভূমিদাস ও শিকারি।
নিকলাস ডাকল, দানিয়েল!
কি হুকুম ইয়োর এক্সেলেন্সি? গম্ভীর গলায় শিকারি বলল; দুটি জ্বলন্ত কালো চোখ তুলে মনিবের দিকে তাকাল।
দিনটা খুব ভালো, না? শিকার ও ঘোড়দৌড়ের পক্ষে, কি বল? মিলকার কানের পিছনটা চুলকে দিতে দিতে নিকলাস প্রশ্ন করল।
দানিয়েল জবাব দিল না, শুধু চোখ কুঁচকাল।
এক মিনিট চুপ করে থাকার পরে তার গম্ভীর হুংকার শোনা গেল, ভভারেই আমি উভাকাকে পাঠিয়েছিলাম। সে বলল, বাচ্চাদের নিয়ে তিনি অত্রানুর জঙ্গলের দিকে গেছেন। সেখানে তারা ডাকাডাকি করছে। (অস্যার্থ : একটা নেকড়ে বাঘিনি বাচ্চাদের নিয়ে অত্রানুর ঝোপে ঢুকেছে–জায়গাটা এ বাড়ি থেকে দুই ভান্টু দূরে।)
