প্রথম মিলনের উচ্ছ্বাস কেটে যাবার পরে নিকলাস তার পুরনো পারিবারিক জগতে স্থিতু হতে শুরু করল। বাবা ও মা প্রায় সেইরকমই আছে–একটু বুড়ো হয়েছে মাত্র। তাদের মধ্যে যেটা নতুন চোখে পড়ছে সেটা হচ্ছে কিছুটা অস্বস্তি ও সাময়িক বাদবিসম্বাদ; এটা আগে ছিল না, আর নিকলাসও অচিরেই বুঝতে পারল যে আর্থিক অবস্থা খারাপ হবার জন্যই এটা ঘটছে। সোনিয়ার বয়স প্রায় বিশ হতে চলল; সে আগের চাইতে আর বেশি সুন্দরী হয়ে ওঠেনি, যা হয়েছে তার চাইতে বেশিকিছু হবে বলে মনে হয় না, তবে সেটাই যথেষ্ট। নিকলাস আসার পর থেকেই সে চারদিকে ছড়িয়ে দিচ্ছে সুখ ও ভালোবাসা; এই মেয়েটির বিশ্বস্ত, অপরিবর্তনীয় ভালোবাসা নিকলাসকেও সুখী করেছে। নিকলাসকে সবচাইতে বেশি অবাক করেছে পেতয়া ও নাতাশা। পেতয়া তেরোয় পা দিয়েছে, যেমন চটপটে তেমনই বুদ্ধিমান ও দুই; গলার স্বর এরমধ্যেই ভাঙতে শুরু করেছে। আর নাতাশা, অনেকদিন পর্যন্ত নিকলাস তাকে দেখলেই অবাক হয় আর হাসে।
বলে, তুমি আর আগের মতো নেই।
সে কি? আমি কি আরো কুৎসিত হয়েছি।
বরং অনেক মহিমান্বিতা হয়েছে। ঠিক যেন রাজকুমারি! রস্তভ তার কানে কানে বলল।
ঠিক ঠিক! নাতাশা সানন্দে চেঁচিয়ে উঠল।
প্রিন্স আন্দ্রুর সঙ্গে পূর্বরাগের কথা, আর অত্রাদতে আসার কথা সবই তাকে বলল; তার শেষ চিঠিটাও দেখাল।
আচ্ছা, তুমি খুশি তো? নাতাশা বলল। এখন আমি কত শান্তিতে ও সুখে আছি।
নিকলাস বলল, খুব খুশি। সে তো খুব ভালো ছেলে…খুবই প্রেমে পড়েছ নাকি?
নাতাশা জবাব দিল, কি করে যে বোঝাব? আমি তো বরিস, আমার মাস্টারমশাই এবং দেনিসভের প্রেমেও পড়েছিলাম, কিন্তু এটা সম্পূর্ণ আলাদা। আমি শান্তিতে আছি, সুখে আছি। আমি জানি তার চাইতে ভালো মানুষ হয় না, আর তাই আমি এখন শান্ত ও সন্তুষ্ট। আগের মতো মোটেই নয়।
বিয়েটা একবছর স্থগিত রাখার ব্যাপারটা নিকলাস সমর্থন করল না, কিন্তু নাতাশা হৈ-হৈ করে প্রমাণ করতে চেষ্টা করল যে এছাড়া গত্যন্তর ছিল না, আর বাবার ইচ্ছার বিরুদ্ধে একটা পরিবারে প্রবেশ করাটাও ঠিক নয়; তাই সে নিজেই এটা চেয়েছিল।
বলল, তুমি মোটেই বুঝতে পারছ না।
নিকলাস চুপ কুরল; তার সঙ্গে একমত হল।
তার দিকে তাকিয়ে দাদা অবাক হয়ে যায়। তাকে দেখে মনেই হয় না সে এই মেয়ে প্রেমে পড়েছে এবং বাগদত্তা স্বামীর বিরহে দিন কাটাচ্ছে। আগের মতোই খোশমেজাজে শান্ত ও হাসিখুশিই আছে। নিকলাস দেখেশুনে অবাক হয়ে গেল; এমন কি বলকনস্কির পূর্বরাগ সম্পর্কে সন্দিহান হয়ে উঠল। তার সবসময়ই মনে হয়, এই প্রস্তাবিত বিয়ের ব্যাপারে কোথায় যেন একটা খটকা আছে।
এই বিলম্ব কেন? বাগদান অনুষ্ঠান হল না কেন? সে ভাবল। এ বিষয়ে মার সঙ্গে কথা বলেও সে বুঝতে পারল যে এই বিয়ের ব্যাপারে তার মনেও সন্দেহ রয়েছে।
প্রিন্স আন্দ্রুর একটা চিঠি দেখিয়ে মা বলল, এই দেখ, সে লিখেছে ডিসেম্বরের আগে সে আসবে না। কিসের বাধা? হয় তো অসুখ! তার স্বাস্থ্য খুবই খারাপ। নাতাশাকে বল না। ও যে এত হাসিখুশি আছে তার উপরেও বেশি গুরুত্ব দিও না; সে এখন বালিকা বয়সের শেষের দিনগুলির ভিতর দিয়ে চলেছে। কিন্তু প্রত্যেকবার ছেলেটির চিঠি পেলে সে যে কি রকম হয়ে যায় তা তো আমি জানি। যাই হোক ঈশ্বর করুন সবই যেন ভালোয় ভালোয় শেষ হয়! (সব সময়ই এই কথাগুলি দিয়ে সে বক্তব্য শেষ করে) ছেলেটি সত্যি চমৎকার!
.
অধ্যায়-২
বাড়ি পৌঁছে প্রথমদিকে নিকলাস গম্ভীর হয়ে থাকত; কোনো কিছু ভালো লাগত না। যেজন্য মা তাকে বাড়িতে ডেকে এনেছে অচিরেই সেই সব বাজে সাংসারিক কাজকর্মে হাত লাগাতে হবে এই চিন্তাই তাকে বিব্রত করে তুলল। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এই বোঝা ঝেড়ে ফেলবার জন্য তৃতীয় দিনেই রেগেমেগে, চেঁচামেচি করে কাউকে কিছু না বলে সে মিতেংকার বাড়ি চলে গেল এবং সবকিছুর হিসাব চেয়ে বসল। কিন্তু সবকিছুর হিসাব বলতে যে কি বোঝায় সে বিষয়ে ভীত ও বিভ্রান্ত মিতেংকার চাইতেও নিকলাসের জ্ঞান অল্প। মিতেকার সঙ্গে বসে কথাবার্তা বলতে ও হিসাবপত্র দেখতে বেশি সময় লাগল না। বারান্দায় অপেক্ষমাণ গ্রাম-প্রধান, একজন কৃষক প্রতিনিধি ও গ্রাম্য করণিকটি ভয় ও আনন্দের সঙ্গে তরুণ কাউন্টের গলা শুনতে লাগল-প্রথমে গর্জন ও ধমক ক্রমেই উচ্চ হতে উচ্চতর হতে লাগল, তারপরই গালাগালি, ভয়ংকর সব শব্দ একের পর এক ঠিকরে বেরিয়ে আসতে লাগল।
ডাকাত!…অকৃজ্ঞ হতভাগা!…কুকুরটাকে টুকরো টুকরো করে ফেলব! আমি বাবা নই!…আমাদের লুঠ করছ!…এমনি আরো অনেক কিছু।
তারপর একইরকম ভয় ও খুশির সঙ্গে তারা দেখল, মিতেংকার গলার নলি ধরে টানতে টানতে ছোট কাউন্ট তাকে বাইরে টেনে নিয়ে এল; তার মুখ লাল, দুই চোখ দিয়ে যেন রক্ত ফুটে বেরুবে; কথার ফাঁকে ফাঁকে সুবিধামতো সময়ে তাকে লাথি ও গুড়ো মারতে মারতে চিৎকার করে বলল, বেরিয়ে যাও! শয়তান, আর কোনোদিন যেন আমাকে তোমার মুখদর্শন করতে না হয়!
মিতেংকা লাফিয়ে ছটা সিঁড়ি পার হয়ে জঙ্গলের মধ্যে পালিয়ে গেল। মিতেংকার স্ত্রী ও শালী দরজার ফাঁক দিয়ে ভয়ার্ত মুখ বের করে সব দেখছিল। ছোট কাউন্ট সেদিকে ভ্রূক্ষেপ না করে দৃঢ় পদক্ষেপে বাড়ির মধ্যে চলে গেল।
