কিন্তু পরক্ষণেই বাবাকে দেখল, বিশেষ করে ছোট্ট কোকোকে (নিকলাস) দেখলেই তার মন দুর্বল হয়ে পড়ে। সে নীরবে চোখের জল ফেলে, আর ভাবে সে তো পাপী, সে যে বাবাকে আর ছোট ভাইপোটিকে ঈশ্বরের চাইতেও বেশি ভালোবাসে।
০৭. বাইবেলের কাহিনী
সপ্তম পর্ব – অধ্যায়-১
বাইবেলের কাহিনীতে বলে, মহাপতনের পূর্বে প্রথম মানুষের পরমানন্দের অন্যতম অবস্থাই ছিল পরিশ্রমের অভাব-আলস্য। পতিত মানুষ তাই আজও আলস্যপ্রিয়তাকে বজায় রেখেছে, কিন্তু মানবজাতির মাথায় অভিশাপটি এখনও চেপে বসে আছে, তার কারণ শুধু এই নয় যে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে আমাদের রুটির যোগাড় করতে হয়, আসল কারণ হল আমাদের নৈতিক স্বভাবই এমন যে আমরা যুগপৎ অলস ও সুখী হতে পারি না। ভিতর থেকে কে যেন বলে দেয়, অলস হলেই আমরা অন্যায় করব। মানুষ যদি সেরকম একটা অবস্থা খুঁজে পায় যেখানে সে বুঝতে পারবে যে অলস হয়েও সে তার কর্তব্য পালন করছে, তাহলেই মানুষের আদিম পরমানন্দের একটা অবস্থা সে পেয়ে যাবে। আর এ ধরনের একটা বাধ্যতামূলক ও অনিন্দনীয় আলস্যই এক শ্রেণীর মানুষের নিয়তি–তারা হল সামরিক শ্ৰেণী। এই বাধ্যতামূলক ও অনিন্দনীয় আলস্যই সামরিক চাকরির প্রধান আকর্ষণ এবং তা থাকবে।
১৮০৭ সালের পরে নিকলাস রস্তভ যখন পাভলোগ্রাদ রেজিমেন্টের চাকরিতেই থেকে গেল, তখনই সে এই আনন্দময় অবস্থার অভিজ্ঞতা লাভ করল। ততদিনে সে দেনিসভের কাছ থেকে পাওয়া সেনাদলের পরিচালনার দায়িত্ব লাভ করেছে।
মস্কোর পরিচিতজনরা রস্তভকে কিছুটা খারাপ মনে করলেও তার সহকর্মীরা, অধীনস্থ কর্মচারী ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষরা তাকে পছন্দ করে, শ্রদ্ধা করে। এ জীবন নিয়ে সে নিজেও সন্তুষ্ট। ইদানীংকালে, ১৮০৯ সালে, সে বাড়ির চিঠিতে প্রায়ই মার কাছ থেকে অভিযোগ পাচ্ছে যে তাদের অবস্থা ক্রমশই গোলমেলে হয়ে উঠছে এবং এবার বাড়িতে ফিরে গিয়ে বুড়ো বাবা-মাকে সুখী করা, তাদের আরাম দেওয়ার সময় এসেছে।
এইসব চিঠি পড়ে নিকলাসের ভয় হয়েছে, জীবনের সবরকম জটিলতা থেকে মুক্ত হয়ে যে পরিবেশে এত শান্তভাবে সে বাস করছে, তারা চাইছে তাকে সেখান থেকে সরিয়ে নিয়ে যেতে। সে বুঝতে পারছে, আগে হোক পরে হোক আবার তাকে জীবনের সেই ঘূর্ণি-স্রোতে ঢুকতে হবেসেখানে আছে নানান জটিলতা ও কাজকর্ম, নায়েবদের সঙ্গে হিসাবপত্র করা, ঝগড়া করা, নানারকম ষড়যন্ত্র, বন্ধন, সমাজ, সোনিয়ার ভালোবাসা এবং তাকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি। এসবই ভয়ানক রকমের শক্ত ও জটিল; তাই মার কাছে সম্পূর্ণ আনুষ্ঠানিকভাবে ফরাসি ভাষায় লেখা চিঠির শুরুতে লিখল প্রিয় মামণি, আর শেষে লিখল তোমার বিশ্বস্ত ছেলে, কিন্তু কবে বাড়ি ফিরবে সে বিষয়ে কিছুই জানাল না। ১৮১০-এ বাবা-মার কাছ থেকে যে চিঠি পেল তাতে তারা জানাল যে বলকনস্কির সঙ্গে নাতাশার বিয়ে পাকা হয়েছে, এবং বুড়ো প্রিন্স বাগড়া দেওয়ায় বিয়েটা বছরখানেক পিছিয়ে গেছে। চিঠি পেয়ে নিকলাস দুঃখ পেল, মর্মাহত হল। সেইবছর বসন্তকালেই সে মার একটা চিঠি পেল; বাবার অগোচরে লেখা সেই চিঠিতে তাকে বাড়ি ফিরে যেতে বলা হয়েছে। মা লিখেছে, সে যদি বাড়ি এসে সমস্ত ব্যাপারটা হাতে না নেয় তাহলে তাদের সমস্ত সম্পত্তি নিলামে বিক্রি হয়ে যাবে এবং তাদের সকলকেই ভিক্ষা করতে হবে। কাউন্ট এত দুর্বল, মিতেংকাকে এত বেশি বিশ্বাস করে এবং এতই ভালোমানুষ যে সকলেই তার সুযোগ নিচ্ছে এবং অবস্থা ক্রমেই খারাপের দিকে চলেছে। কাউন্টেস লিখেছে, মিনতি করে বলছি, ঈশ্বরের দোহাই, আমাকে এবং গোটা পরিবারকে যদি বিপাকে ফেলতে না চাও তো অবিলম্বে চলে এস।
চিঠিটা পেয়ে নিকলাসের মন নরম হল। বাস্তবজ্ঞানসম্পন্ন মানুষের সাধারণ বুদ্ধিতেই সে বুঝতে পারল তার কি করা উচিত।
চাকরি থেকে অবসর না নিলেও অন্ততপক্ষে ছুটি নিয়ে বাড়িতে যাওয়াই এখন তার পক্ষে সঠিক কাজ। কেন যে তাকে যেতেই হবে তা সে জানে না; কিন্তু খাবার পরে একটু ঘুমিয়ে উঠেই সে মার্সকে জিন পরাতে হুকুম দিল এবং ঘর্মাক্ত ঘোড়াটাকে নিয়ে ফিরে এসে লাভ্রুশকাকে (দেনিসভের চাকরটি তার সঙ্গেই রয়ে গেছে) এবং সহকর্মীদের জানাল যে সে ছুটির জন্য দরখাস্ত করেছে, এবং শীঘ্রই বাড়ি চলে যাচ্ছে। এক সপ্তাহ পরে তার ছুটি মঞ্জুর হয়ে এল। তার হুজার সহকর্মীরা রস্তভের সম্মানে একটা ডিনারের আয়োজন করল; তাতে জনপ্রতি চাঁদা ধার্য করা হল পনেরো রুবল এবং দুটো ব্যান্ড ও দুই দল গায়কের ব্যবস্থা করা হল। মেজর বাসভের সঙ্গে রস্তভ লেপার্ক নাচল; নেশায় বুঁদ হয়ে অফিসাররা রস্তভকে দোলাল, আলিঙ্গন করল, তারপর নিচে ফেলে দিল; তৃতীয় স্কোয়াড্রনের সৈনিকরাও তাকে দোলাল, হুররা! বলে চিৎকার করল, আর তারপরে তাকে স্লেজে চাপিয়ে প্রথম ডাক-ঘাটি পর্যন্ত এগিয়ে দিল।
ক্রেমেনচুগ থেকে কিয়েভ পর্যন্ত যাত্রার প্রথম অংশটায় স্বভাবতই সে পিছনে ফেলে আসা সৈনিক জীবনের কথাই ভাবতে লাগল। কিন্তু যতই বাড়ির দিকে এগোতে লাগল ততই বাড়ির কথাই বেশি করে মনে পড়তে লাগল। অত্রানুর আগেকার ডাক-ঘাঁটিতেই কোচয়ানকে তিন রুবল বকশিস দিল এবং গন্তব্যস্থানে পৌঁছেই ছোট ছেলের মতো বাড়ির সিঁড়ি বেয়ে রুদ্ধশ্বাসে ছুটতে লাগল।
