প্রিন্সেস বলল, তা বটে, তবে নিজেদের মধ্যে বলেই বলছি, ওটা একটা অজুহাত। আসল কথা, কাউন্ট সিরিল ব্লাদিমিরভিচের অসুখের সংবাদ শুনে তাঁর সঙ্গে দেখা করতেই সে এসেছে।
কাউন্ট বলে উঠল, কিন্তু তুমি কি জান গো, সেটা জব্বর রসিকতা হয়েছিল। কিন্তু বয়স্কা অতিথিটি তার কথা শুনছে না দেখে সে তরুণীদের দিকে ফিরে বলল, পুলিশটির যে কী হাস্যকর অবস্থা হয়েছে সেটা আমি যেন কল্পনায় দেখতে পাচ্ছি!
নিজেকে পুলিশের ভূমিকায় কল্পনা করে কাউন্ট তার হাত দুটো দোলাতে লাগল। যে সব মানুষ ভালো খায়, বিশেষ করে ভালো টানে, তাদের মতো উচ্ছ্বসিত হাসিতে কাউন্টের মোটাসোটা দেহটা দুলে দুলে কাঁপতে লাগল। অতএব, সকলে আসবেন এবং আমাদের সঙ্গে খাবেন! সে বলল।
০১.২ সকলে চুপচাপ
অধ্যায়-১১
সকলে চুপচাপ। অমায়িক হাসির সঙ্গে কাউন্টেস অতিথিদের দিকে তাকাতে লাগল; অবশ্য এ সত্য লুকাল না যে এখন তারা সবাই বিদায় নিলে সে মোটেই দুঃখিত হবে না। অতিথির মেয়েটি এর মধ্যেই জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে মায়ের দিকে তাকিয়ে পোশাকটা পরিপাটি করে নিচ্ছিল; এমন সময় হঠাৎ পাশের ঘর থেকে অনেক ছেলেমেয়ের দৌড়ে দরজার কাছে যাবার এবং একটা চেয়ার উল্টে যাবার শব্দ শোনা গেল। তেরো বছরের একটি মেয়ে মসলিনের খাটো ফ্রকের ভাঁজে একটা কিছু লুকিয়ে নিয়ে ছুটে ঘরের মধ্যে ঢুকে মাঝখানে দাঁড়িয়ে পড়ল। স্পষ্ট বোঝা গেল, ছুটতে ছুটতে এতদূর চলে আসার ইচ্ছা তার ছিল না। তার পিছন পিছন দরজায় এসে হাজির হল লাল রঙের কোট-কলারওয়ালা একটি ছাত্র, রক্ষীবাহিনীর একজন অফিসার, পনেরো বছরের একটি মেয়ে এবং খাটো জ্যাকেটপরা গোলাপি মুখের একটি মোটাসোটা ছেলে।
কাউন্ট লাফিয়ে উঠে এ-পাশে হেলে দুই হাত বাড়িয়ে দৌড়ে আসা মেয়েটিকে জড়িয়ে ধরল।
আঃ, এই যে ধরে ফেলেছি! হাসতে হাসতে কাউন্ট বলল। আমার মামণি, আজ যার নামকরণ দিবস। আদরের মাটি আমার!
কঠোর হবার ভান করে কাউন্টেস বলল, সোনামণি, সবকিছুরই সময়-অসময় আছে। স্বামীর দিকে ফিরে বলল, তুমিই ওকে নষ্ট করেছ ইলিয়া।
অতিথিটি বলল, কেমন আছ সোনা? তোমার নামকরণ দিবস বার বার ফিরে আসুক এই কামনা করি। মায়ের দিকে ফিরে বলল, কী মনোরম মেয়েটি!
কালো চোখ ও চওড়া মুখের মেয়েটি ঠিক সুন্দরী না হলেও প্রাণশক্তিতে ভরপুর; দৌড়ে আসার জন্য তার খোলা কাঁধ দুটো উঠছে-নামছে, বডিসটা কাঁপছে। পিছনে ঠেলে-দেওয়া কালো কোঁকড়ানো চুল, সরু খোলা হাত, লেস-লাগানো সরু পাজামা পরা ছোট দুখানি পা, নিচু চটিতে ঢাকা পায়ের পাতা–সব মিলিয়ে মেয়েটি এখন সেই মনোহর বয়সে এসে পৌঁছেছে যখন মেয়েটি ঠিক শিশুও নেই, আবার শিশুটি এখনো নারী হয়েও ওঠে নি। মায়ের বকুনিকে গ্রাহ্য না করে মেয়েটি বাবার কাছ থেকে পালিয়ে লজ্জারক্ত মুখখানি মায়ের ওড়নার লেসের মধ্যে লুকিয়ে ফেলে হাসতে লাগল। হাসতে হাসতে ভাঙাভাঙা কথায় একটা পুতুলের কথা বুঝিয়ে বলে ফ্রকের ভাঁজের ভিতর থেকে সেটাতে বের করে দেখাল।
দেখতে পাচ্ছ?… আমার পুতুল…মিমি…দেখ…। নাতাশা শুধু এইটুকুই বলতে পারল (তার কাছে সব ব্যাপারটাই মজার খেলা)। মায়ের গায়ে ঠেস দিয়ে সে এমন প্রচণ্ডভাবে হো-হো করে হেসে উঠল যে গম্ভীর অতিথিটি পর্যন্ত সে হাসিতে যোগ না দিয়ে পারল না।
কঠোর হবার ভান করে মেয়েকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে মা বলল, এবার এখান থেকে পালাও, আর তোমার দস্যিপনাও সঙ্গে নিয়ে যাও। অতিথির দিকে ফিরে বলল, এটি আমার ছোট মেয়ে।
নাতাশা একমুহূর্তের জন্য মায়ের ওড়না থেকে মুখ তুলে তার দিকে তাকিয়ে আবার মুখটা লুকিয়ে ফেলল।
বাধ্য হয়ে এই পারিবারিক দৃশ্যের দর্শক হয়ে অতিথিটি ভাবল, তারও এতে অংশ নেওয়া দরকার।
সে নাতাশাকে বলল, বল তো সোনা, মিমি তোমার কে হয়? আমার তো মনে হয় মেয়ে, কি বল?
এ সব ছেলেমানুষি ব্যাপারে অতিথির নাম গলানো নাতাশার পছন্দ হল না; কোনো কথা না বলে সে গম্ভীরভাবে তার দিকে তাকাল।
ইতিমধ্যে ছোটদের দল : আন্না মিখায়লভনার ছেলে অফিসার বরিস; কাউন্টের বড় ছেলে উপ-স্নাতক নিকোলাস; কাউন্টের পনেরো বছর বয়সের ভাইঝি সোনিয়া, আর কাউন্টের ছোট ছেলে পেতয়া (পিটারের ডাকনাম)-সকলেই বসবার ঘরে জমিয়ে বসেছে এবং তাদের চোখে-মুখে যে উত্তেজনা ও উল্লাস ঝলমল করছে তাকে শোভন ব্যবহারের সীমার মধ্যে নিয়ন্ত্রিত রাখতে চেষ্টা করছে। স্পষ্টতই পিছনের যে ঘর থেকে তারা ছুটে বেরিয়ে এসেছে সেখানে যে সব আলোচনা চলছিল সেগুলি এই বসবার ঘরের সামাজিক কুৎসা, আবহাওয়া ও কাউন্টেস এপ্রাক্সিনাকে নিয়ে আলোচনার চাইতে অনেক বেশি মজার। অনেক কষ্টে হাসি চেপে তারা মাঝে মাঝেই একে অন্যের দিকে তাকাচ্ছিল।
ছাত্র ও অফিসার–দুটি যুবকই ছেলেবেলা থেকে বন্ধু; দুজনের এক বয়স, দেখতে এক রকম না হলেও দুজনই সমান সুন্দর। বরিস লম্বা, ফর্সা, তার মুখমণ্ডল শান্ত, সুদর্শন। নিকোলাস ছোটখাট, মাথায় কোঁকড়া চুল, সরল মুখ। উপরের ঠোঁটে ইতিমধ্যেই কালো লোম দেখা দিয়েছে; সারা মুখে আবেগ ও উৎসাহ সুস্পষ্ট। বসবার ঘরে ঢুকে নিকোলাস লজ্জা পেল। কিছু একটা বলতে চেষ্টা করল, কিন্তু পারল না। অপর দিকে বরিস সঙ্গে সঙ্গেই পায়ের নিচে মাটি পেয়ে গেল; শান্তভাবে হাসির মেজাজে সে বলতে লাগল-পুতুল মিমি যখন তরুণী ছিল, যখন তার নাকটা ভাঙে নি, তখন থেকে সে তাকে চেনে; এই পাঁচ বছরে চোখের সামনে সে কেমন বুড়ি হয়ে গেছে, খুলির মাঝবরাবর তার মাথাটা ফেটে চৌচির হয়ে গেছে। কথাগুলি বলে সে নাতাশার দিকে তাকাল। তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নাতাশা তাকাল তার ভাইয়ের দিকে; নিকোলাস তখন চোখ কুঁচকে চাপা হাসির দমকে কাঁপছে। তা দেখে রাগ সামলাতে না পেরে নাতাশা লাফ দিয়ে উঠে তার দুখানি ছোট পায়ে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ঘর থেকে ছুটে বেরিয়ে গেল। বরিস হাসল না।
