এই চেঁচামেচির পরে প্রিন্স এ নিয়ে আর একটি কথাও বলেনি। কিন্তু ছেলের এই আচরণের দরুন চাপা বিরক্তি প্রকাশ পেতে লাগল মেনের প্রতি ব্যবহারে। আগেকার ঠাট্টা-বিদ্রুপের সঙ্গে একটা নতুন বিষয় যুক্ত হল-সৎ-মার কথা এবং মাদময়জেল বুরিয়ের নম্র স্বভাবের কথা।
মেয়েকে শুধায়, আমি কেন তাকে বিয়ে করব না? সে তো একটি চমৎকার প্রিন্সেস হবে!
বিস্ময়বিমূঢ় ভাবে প্রিন্সেস মারি লক্ষ্য করতে লাগল যে ইদানীং তার বাবা সেই ফরাসি মেয়েটির সঙ্গে খুবই দহরম-মহরম শুরু করে দিয়েছে। চিঠিটার ভাগ্যে যা ঘটেছে সে-কথা প্রিন্স আন্দ্রুকে সে চিঠি লিখে জানিয়ে দিল, তবে তাকে এই আশা দিয়ে সান্ত্বনা জানাল যে বাবা মত করে দিতে পারবে।
ছোট্ট নিকলাস ও তার লেখাপড়া, দাদা আন্দু এবং ধর্ম-এই হল প্রিন্সেস মারির আনন্দ ও সান্ত্বনা; কিন্তু এছাড়াও প্রত্যেক মানুষেরই যেমন কতকগুলি ব্যক্তিগত আশা থাকে তেমনই প্রিন্সেস মারিও তার অন্তরের গভীরতম কোণে এমন একটি গোপন স্বপ্ন ও আশাকে লালন করে যা তার জীবনের প্রধান সান্ত্বনা। এই সান্ত্বনাভরা স্বপ্ন ও আশা তাকে এনে দেয় ঈশ্বরের আপনজনরা–সেইসব আধ-পাগলা ও অন্য তীর্থযাত্রীর দল যারা প্রিন্সের অজ্ঞাতসারে তার সঙ্গে দেখা করে। যত বেশিদিন সে বাঁচছে, জীবনের অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণ যত বাড়ছে, ততই সেইসব স্বল্পদৃষ্টি মানুষকে দেখে সে বেশি অবাক হচ্ছে যারা এই পৃথিবীতেই আনন্দ ও সুখের খোঁজ করছে : সেই অসম্ভব, অবাস্তব, পাপপূর্ণ সুখকে পাবার জন্য পরিশ্রম করছে, যন্ত্রণা ভোগ করছে, সংগ্রাম করছে এবং পরস্পরের ক্ষতি করছে। প্রিন্স আন্দ্রুন্তু স্ত্রীকে ভালোবাসল, সে মারা গেল, কিন্তু তাও যথেষ্ট হল না, আর একটি মেয়েমানুষের সঙ্গে সে নিজের সুখকে বাধতে চাইল। বাবা এতে আপত্তি করলেন, কারণ আন্দ্রুর জন্য তিনি চান আরো খ্যাতি ও অর্থসম্পন্ন একটি কনে। আর এমন কিছুকে পাবার জন্যে তারা সকলেই লড়াই করল, কষ্ট পেল, একে অন্যকে যন্ত্রণা দিল, তাদের আত্মাকে, শাশ্বত আত্মাকে ক্ষত-বিক্ষত করল, যা একান্তই ক্ষণস্থায়ী। একথা যে আমরা নিজেরাও জানি তাই শুধু নয়, ঈশ্বর-পুত্র খৃস্টও পৃথিবীতে নেমে এসে আমাদের বললেন যে এই জীবন মুহূর্তের খেলাঘর মাত্র; তথাপি আমরা একেই আঁকড়ে ধরে থাকি, এই জীবনেই সুখের খোঁজ করি। প্রিন্সেস মারি ভাবল, একথা কেউ বোঝে না কেন? বোঝে শুধু ঈশ্বরের সেইসব ঘৃণিত আপনজনরা, ঝোলা পিঠে নিয়ে পিছনের দরজা দিয়ে যারা আমার কাছে আসে পাছে প্রিন্স তাদের দেখে ফেলেন এই ভয়ে; তার কাছ থেকে খারাপ ব্যবহার পাবার ভয়ে নয়, পাছে তার পাপ হয় সেই ভয়ে। পরিবার, বাড়িঘর ও পার্থিব সুখের সব চিন্তা ছেড়ে, কোনো কিছুকে আঁকড়ে না ধরে শনের কম্বলে শরীর ঢেকে একটা নতুন নাম নিয়ে এক জায়গা থেকে আর এক জায়গায় ঘুরে বেড়ানো, কারো কোনো ক্ষতি না করে যারা তাড়িয়ে দেয় আর যারা আশ্রয় দেয় তাদের সকলের জন্যই প্রার্থনা করা : এই জীবন ও সত্যের চাইতে মহত্তর কোনো জীবন বা সত্য নেই!
একটি তীর্থযাত্রী প্রিন্সেস মারির বড়ই প্রিয়; নাম থিয়োদসিয়া, বয়স পঞ্চাশ বছর, ছোটখাট শান্ত মানুষটি, মুখভর্তি দাগ; খালি পায়ে ভারি শিকল পরে তিরিশ বছরের অধিককাল ঘুরে বেড়াচ্ছে। একদা একটা ঘরে দেবমূর্তির সামনে জ্বালানো স্বল্পালোকিত বাতির নিচে বসে থিয়োদসিয়া যখন তার জীবনের কথা বলছিল তখন একমাত্র থিয়োদসিয়াই যে জীবনের সত্য পথের সন্ধান চেয়েছে সহসা এই চিন্তা এত তীব্রভাবে প্রিন্সেস মারির মনে জেগে উঠল যে সে স্থির করল নিজেও তীর্থযাত্রী হয়ে যাবে। থিয়োদসিয়া ঘুমতে চলে গেলে প্রিন্সেস মারি অনেকক্ষণ এ নিয়ে ভাবল, এবং শেষপর্যন্ত মনস্থির করে ফেলল যে যত অদ্ভুতই মনে হোক সে তীর্থযাত্রায় বের হবেই। কেবলমাত্র তার দীক্ষাগুরু সন্ন্যাসী আকিনফি বাবার কাছেই এই সিদ্ধান্তের কথা জানাল আর সেও তার অভিপ্রায়কে সমর্থন করল। তীর্থযাত্রীদের উপহার দেবার অছিলা করে সে নিজের জন্য একপ্রস্থ তীর্থযাত্রীর পোশাক তৈরি করাল; মোটা কাপড়ের একটা আলখাল্লা, কাঠের জুতো, মোটা কাপড়ের কোট ও কালো রুমাল। যে সিন্ধুকটাতে তার নিজস্ব গোপন অর্থাদি আছে বারকয়েক সেটার কাছে গিয়েও প্রিন্সেস মারি থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল; পরিকল্পনা মতো কাজ করবার সময় হয়েছে কি না তা নিয়ে ইতস্তত করতে লাগল।
যাত্রীদের কাহিনী শুনতে বসে তাদের সরল কথাবার্তায় প্রায়ই সে এত বেশি উত্তেজিত হয়ে পড়ে যে অনেকবারই সবকিছু ছেড়েছুঁড়ে সে বাড়ি থেকে পালিয়ে যেতে উদ্যত হয়েছে। কল্পনায় সে যেন দেখতে পায়, মোটা কম্বলে দেহ জড়িয়ে হাতে একটা লাঠি নিয়ে পিঠে বোঁচকা ফেলে থিয়োদসিয়ার পাশে পাশে হাঁটতে হাঁটতে সে এক সন্তের স্থান থেকে অন্য সন্তের স্থানে এগিয়ে চলেছে; মন থেকে বিদায় নিয়েছে যত ঈর্ষা দ্বেষ, জাগতিক ভালোবাসা ও কামনা এবং অবশেষে পৌঁছে গেছে সেই স্থানে যেখানে দুঃখ নেই, দীর্ঘশ্বাস নেই, আছে শুধু শাশ্বত সুখ ও পরমানন্দ।
প্রিন্সেস মারি ভাবে : এক জায়গায় গিয়ে সেখানে প্রার্থনা করব; সেখানে থাকতে অভ্যস্ত হবার বা সে জায়গাটাতে ভালোবাসার আগেই আরো এগিয়ে যাব। যতদিন পা চলে ততদিনই এগিয়ে চলবো, তারপর কোনো এক জায়গায় শরীরটা এলিয়ে দিয়ে মরে যাব এবং শেষপর্যন্ত পৌঁছে যাব সেই শাশ্বত, শান্ত আবাসে যেখানে কোনো দুঃখ নেই, দীর্ঘশ্বাস নেই…।
