আমার দাদা আন্দ্রুর অনুপস্থিতি ছাড়া আমাদের পারিবারিক জীবন আগেকার মতোই চলছে। তোমাকে আগের চিঠিতেও লিখেছি, ইদানীং সে খুব বদলে গেছে। সেই দুঃখের পরে এবছরই তাকে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক হতে দেখলাম। ছেলেবেলায় তাকে যেমন দেখেছি : দয়ালু, স্নেহশীল, সোনায় মোড়া অদ্বিতীয় অন্তরের অধিকারী, আবার সে ঠিক সেই রকমটি হয়েছে। মনে হচ্ছে, সে বুঝতে পেরেছে যে তার জীবন শেষ হয়ে যায়নি। কিন্তু মানসিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে দৈহিক দিক থেকে সে আরো অনেক দুর্বল হয়ে পড়েছে। অনেক শুকিয়ে গেছে, স্নায়ু দুর্বল হয়েছে। তাকে নিয়ে উদ্বেগে আছি, তবে সুখের বিষয় অনেক আগেই ডাক্তাররা তাকে বিদেশে যাবার যে পরামর্শ দিয়েছিল এতদিনে সে কাজটা সে করছে। আশা করছি, এবার সে ভালো হয়ে উঠবে। তুমি লিখেছ, পিটার্সবুর্গে সকলেই বলে সে একজন সক্রিয়, সংস্কৃতিসম্পন্ন, সক্ষম যুবক। আত্মীয় হিসেবে আমার অহংকার ক্ষমা করো, কিন্তু এবিষয়ে কোনোদিনই আমার কোনো সন্দেহ ছিল না। এখানকার চাষী থেকে দ্ৰজন পর্যন্ত সকলের যে উপকার সে করেছে তা অপরিমেয়। পিটার্সবুর্গে পৌঁছে সে তার প্রাপ্যটুকুই পেয়েছে। আমি অবাক হয়ে ভাবি গুজব কত তাড়াতাড়ি পিটার্সবুর্গ থেকে মস্কোতে ছড়াতে পারে, বিশেষ করে যে মিথ্যা গুজবের কথা তুমি লিখেছ-ছোট্ট রস্তভার সঙ্গে দাদার বাগদানের কথাই আমি বলছি। আমার তো মনে হয় না দাদা আর কখনো বিয়ে করবে, সে মেয়েকে তো কিছুতেই নয়, আর তার কারণ : প্রথম, আমি জানি যদিও সে হারানো স্ত্রীর কথা কদাচিৎ বলে থাকে, তবু সেই হারানোর ব্যথা তার অন্তরের এত গভীরে প্রবেশ করেছে যে তার জায়গায় অন্য কাউকে বসানো এবং আমাদের ছোট্ট দেবদূতের জন্য একজন সৎ-মা এনে দেওয়া একেবারেই অসম্ভব। দুই, আমি যতদূর জানি, তাকে খুশি করার মতো মেয়ে সে নয়। তাই আমি মনে করি না যে তাকে সে স্ত্রীরুপে বেছে নেবে, আর সত্যি কথা বলতে কি আমিও সেটা চাই না। কিন্তু চিঠিটা অনেক বড় হয়ে যাচ্ছে, দ্বিতীয় পাতার শেষে পৌঁছে গেছি। বিদায় বন্ধু। ঈশ্বর তার পবিত্র ও সরল মেহে তোমাকে রক্ষা করুন। প্রিয় বন্ধু, মাদময়জেল বুরিয়েও তোমাকে চুম্বন পাঠাচ্ছে। —মারি
.
অধ্যায়-২৬
গ্রীষ্মকালের মাঝামাঝি প্রিন্সেস মারি সুইজারল্যান্ড থেকে প্রিন্স আন্দ্রুর একটা অপ্রত্যাশিত চিঠি পেল। সে চিঠিতে একটা বিচিত্র ও বিস্ময়কর সংবাদ সে জানিয়েছে। নাতাশা রস্তভার সঙ্গে তার বিয়ের সংবাদ দিয়েছে। সারা চিঠিতে বাগদত্তার প্রতি প্রেমের উচ্ছ্বাস এবং বোনের প্রতি মমতা ছড়িয়ে আছে। লিখেছে, এমন ভালো সে কাউকে কোনোদিন বাসেনি, জীবন যে কি সে শুধু এখনই বুঝেছে ও জেনেছে। শেষবারের মতো বল্ড হিলসে গিয়ে তাকে এই সংকল্পের কথা জানায়নি বলে সে বোনের কাছে ক্ষমা চেয়েছে, যদিও একথা সে বাবাকে তখনই জানিয়েছে। বোনকে এই ভয়ে বলেনি যে প্রিন্সেস মারি তাহলে বাবার সম্মতি চাইত, তাকে বিরক্ত করে তুলত, তার অসন্তুষ্টির ধাক্কা সইত, অথচ ভালো কিছুই হত না। লিখেছে, তাছাড়া, তখন ব্যাপারটা এখনকার মতো পাকা হয়নি। বাবা তখন একবছর অপেক্ষা করার জন্য পীড়াপীড়ি করেছিলেন; এখন তার অর্ধেক সময় ছমাস পার হয়ে গেছে, কিন্তু আমার সংকল্প আগের চাইতে দৃঢ়তর হয়েছে। ডাক্তাররা যদি আমাকে আর এখানে আটকে না রাখে তাহলেই আমার রাশিয়াতে ফিরে যাওয়ার কথা, কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে আরো তিন মাস আমাকে এখানে থাকতে হবে। আমাকে তুমি চেন, বাবার সঙ্গে আমার সম্পর্ক তুমি জান। তার কাছ থেকে আমি কিছুই চাই না। চিরদিন স্বাধীন ছিলাম, আর তাই থাকব, কিন্তু হয়তো আর বেশিদিন তিনি আমাদের মাঝে থাকবেন না, তাই তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে তার বিরাগভাজন হলে আমার সুখের অর্ধেকটাই নষ্ট হয়ে যাবে। সেইকথা নিয়ে তাকেও একটা চিঠি লিখছি; আমার মিনতি, একটা ভালো সময় বুঝে চিঠিটা তার হাতে দিও, এবং আমাকে জানিও সমস্ত ব্যাপারটাকে তিনি কিভাবে নিয়েছেন এবং সময়টা চার মাস কমিয়ে আনতে তিনি সম্মতি দিতে পারেন এরকম কোনো আশা আছে কি না।
অনেক ইতস্তত, সন্দেহ ও প্রার্থনার পরে প্রিন্সেস মারি চিঠিটা বাবার হাতে দিল। পরদিন বুড়ো প্রিন্স তাকে শান্তভাবে বলল :
তোমার দাদাকে লিখে জানিয়ে দিও যেন আমার মৃত্যু পর্যন্ত অপেক্ষা করে…বেশি দিন লাগবে না–অচিরেই আমি তাকে মুক্তি দেব।
প্রিন্সেস জবাব দিতে যাচ্ছিল, কিন্তু বাবা তাকে কথাই বলতে দিল না, উত্তরোত্তর গলা চড়িয়ে চিৎকার করে বলল : বিয়ে কর, বিয়ে কর বাপু।…ভালো পরিবার…চমৎকার লোক, অ্যাঁ? ধনী, অ্যাঁ? হ্যাঁ, ছোট্ট নিকলাস সুন্দর একটি সৎ-মা পাবে। চিঠি লিখে তাকে জানিয়ে দাও, ইচ্ছা করলে সে কালই বিয়ে করতে পারে। সে হবে ছোট্ট নিকলাসের সৎ-মা, আর আমি বিয়ে করব বুরিয়েকে!…হা, হা, হা! তারও তো একজন সৎ-মা থাকা চাই। শুধু একটা কথা, আমার বাড়িতে আর মেয়েমানুষের দরকার নেই–বিয়ে করে সে যেন নিজের মতো বাস করে। তুমি হয়তো তার কাছে গিয়েই থাকবে? প্রিন্সেস মারির দিকে ফিরে বলল। ঈশ্বরের দোহাই, তাই যাও! বেরিয়ে যাও তুষার-ঝড়ের মধ্যে…তুষার-ঝড়…তুষার-ঝড়!
