সে অনবরতই প্রিন্সেস মারির মনে আঘাত দেয়, তাকে যন্ত্রণা দেয়, সে কিন্তু সহজভাবেই প্রিন্সকে ক্ষমা করে। তার বাবা তাকে ভালোবাসে, সে কি তাকে কষ্ট দিতে পারে, তার প্রতি অবিচার করতে পারে? ন্যায়বিচার কি? ন্যায়বিচার এই গর্বিত শব্দটার কথা প্রিন্সেস কখনো ভাবেনি। তার কাছে মানুষের সব জটিল আইনকানুনই একটিমাত্র স্পষ্ট ও সরল আইনে কেন্দ্রায়িত-ভালোবাসা ও আত্মত্যাগের আইন : নিজে ঈশ্বর হয়েও যিনি মানুষকে ভালোবেসে তার জন্য নির্যাতন ভোগ করেছেন এ আইন তিনিই শিখিয়েছেন। অন্য মানুষের ন্যায়-অন্যায় দিয়ে সে কি করবে? তার কাজ সহ্য করা, ভালোবাসা, আর তাই সে করে চলেছে।
শীতকালে প্রিন্স আন্দ্রু বল্ড হিলসে ফিরে গেল; এবার সে অনেক বেশি হাসিখুশি, শান্ত ও স্নেহশীল হয়েছে; প্রিন্সেস মারি অনেকদিন তাকে এরকমটা দেখেনি। সে বুঝল যে একটা কিছু ঘটেছে, কিন্তু প্রিন্স আন্দ্রুন্তু নিজে কিছুই বলল না। বাড়ি থেকে যাবার আগে কি নিয়ে যেন সে বাবার সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা করল, প্রিন্সেস মারি লক্ষ্য করল, যাবার আগে দুজনই পরস্পরের প্রতি অসন্তুষ্ট হয়েছে।
প্রিন্স আন্দ্রু চলে যাবার পরেই প্রিন্সেস মারি পিটার্সবুর্গে বন্ধু জুলি কুরাগিনকে চিঠি লিখল। তাকে সে স্বপ্নে দেখেছে (সব মেয়েরাই এরকম স্বপ্ন দেখে) তুরস্কে দাদার মৃত্যু হওয়ায় বেচারি এখন শোকে দিন কাটাচ্ছে। চিঠিতে দাদার সঙ্গে তার বিয়ের প্রস্তাবের কথাই সে লিখল।
প্রিয় মিষ্টি বন্ধু জুলি, মনে হয় দুঃখ আমাদের সকলেরই ললাট-লিখন।
তোমার এ ক্ষতি এতই ভীষণ যে নিজের কাছে আমি এর শুধু একটা ব্যাখ্যাই খুঁজে পাইতোমাকে ও তোমার মাকে ভালোবেসে তোমাদের পরীক্ষা করবার জন্যই ঈশ্বর এই বিশেষ ব্যবস্থাটি করেছেন। হায় বন্ধু! ধর্ম, একমাত্র ধর্মই পারে–আমাদের সান্ত্বনা দিতে পারে বলব না-হতাশা থেকে আমাদের রক্ষা করতে। মানুষ যা বুঝতে পারে না একমাত্র ধর্মই তা বুঝিয়ে দিতে পারে : কেন, কি কারণে, যেসব দয়ালু মহৎ লোক জীবনে সুখলাভে সক্ষম-যারা শুধু যে অন্যের ক্ষতি করে না তাই নয়, অনেক সুখের পক্ষে একান্ত দরকারি–তাদেরই ডাক আসে ঈশ্বরের কাছ থেকে, অথচ যে সব নিষ্ঠুর, অদরকারি, ক্ষতিকর মানুষ শুধু নিজেদেরই নয় অন্যের পক্ষেও বোঝাস্বরূপ তাদেরই বাঁচতে দেওয়া হয়। জীবনে প্রথম যে মৃত্যু আমি প্রত্যক্ষ করেছি, যা আমি কোনোদিন ভুলব না–আমার আদরের বৌদির মৃত্যু–সেই মৃত্যুই আমাকে একথা শিখিয়েছে। তুমি যেমন নিয়তিকে প্রশ্ন করছ, কেন তোমার এমন চমৎকার দাদাকে মরতে হল, তেমনই আমিও প্রশ্ন করেছিলাম, দেবদূতের মতো যে লিজা কখনো কারো প্রতি অন্যায় করেনি, কোনো অশুভ চিন্তা কখনো যার মনে আসেনি, তাকে কেন মরতে হল। প্রিয় বন্ধু, তোমার কি মনে হয়? তারপরে পাঁচটি বছর কেটে গেছে, এর মধ্যেই আমার ক্ষুদ্র বুদ্ধিতে আমি পরিষ্কার বুঝতে পারছি কেন তাকে মরতে হয়েছিল, কীভাবে সেই মৃত্যু সৃষ্টিকর্তার অসীম কল্যাণময় তারই প্রকাশমাত্র, আমাদের কাছে দুর্বোধ্য হলেও যার প্রতিটি কাজ জীবের প্রতি তার অসীম ভালোবাসারই প্রকাশ। প্রায় ভাবি, তার দেবদূতের মতো নির্দোষ স্বভাবের পক্ষে মায়ের সব কর্তব্য পালনের মতো শক্তিই তার ছিল না। তরুণী বধূ হিসেবে সে নিন্দার অতীত, হয়তো বা মা হিসেবে সে তা নাও হতে পারত। যাই হোক, সে আমাদের ছেড়ে গেছে, বিশেষ করে ছেড়ে গেছে প্রিন্স আন্দ্রু, রেখে গেছে শুধু দুঃখ আর স্মৃতি, কিন্তু সম্ভবত সেখানে সে এমন একটি আসন পাবে যেটা পাবার আশা আমি নিজে করতে পারি না। কিন্তু শুধু তার কথাই বা বলি কেন, যত দুঃখই পেয়ে থাকি তবু সেই ভয়ংকর অকাল মৃত্যু আমার ও দাদার জীবনে অতীব কল্যাণময় প্রভাব বিস্তার করেছে। তখন সেই ক্ষতির মুহূর্তে এসব চিন্তা আমার মনে আসেনিঃ তখন হয় তো এসব চিন্তাকে সভয়ে দূরে ঠেলে দিতাম, কিন্তু সে চিন্তা এখন আমার কাছে স্পষ্ট ও নিশ্চিত। প্রিয় বন্ধু, সুসমাচারের যে সত্যবাণী আমার জীবনের মন্ত্র হয়ে দেখা দিয়েছে তার সত্যতায় তোমাকে উদ্বুদ্ধ করার জন্যই তোমাকে এত কথা লিখলাম : তার ইচ্ছা ভিন্ন আমাদের মাথার একগাছি চুলও পড়তে পারে না। আর তার ইচ্ছা তো পরিচালিত হয় একমাত্র আমাদের প্রতি অসীম ভালোবাসার দ্বারা, আর তাই আমাদের জীবনে যা কিছু ঘটে আমাদের ভালোর জন্যই ঘটে।
তুমি জানতে চেয়েছ আগামী শীতকালটা আমরা মস্কোতে কাটাব কি না। তোমাকে দেখার অনেক ইচ্ছা সত্ত্বেও তা হবে বলে মনে করি না, আর আমি তা চাইও না। শুনে অবাক হবে যে বোনাপার্টই এর কারণ! ব্যাপারটা এই : বাবার স্বাস্থ্য খুবই খারাপ হয়ে পড়েছে, আমার কোনো প্রতিবাদই তিনি সহ্য করতে পারেন না, ক্রমেই খিটখিটে হয়ে উঠছেন। তুমি তো জান, রাজনৈতিক সমস্যাই এর কারণ। ইউরোপের সব রাষ্ট্রনায়কের সঙ্গে, বিশেষ করে মহান ক্যাথারিনের পৌত্র আমাদের সম্রাটের সঙ্গে বোনাপার্ট যে সমমর্যাদায় সন্ধির আলোচনা করছে–এটা বাবা কিছুতেই সহ্য করতে পারছেন না। তুমি জান, রাজনীতির দিকে আমার কোনো আগ্রহ নেই কিন্তু বাবার কথাবার্তা এবং মাইকেল আইভানভিচের সঙ্গে তার আলোচনা থেকে পৃথিবীর কোথায় কি হচ্ছে সবই আমি জানতে পারি–বিশেষ করে বোনাপার্টের উপর যেসব সম্মান বর্ষিত হয়েছে সেকথা তো বটেই। আমার তো মনে হয়, সারা পৃথিবীতে একমাত্র বল্ড হিলসেই তাকে মহাপুরুষ তো দূরের কথা, ফ্রান্সের সম্রাট বলেও স্বীকার করা হয় না। বাবা এসব সহ্যই করতে পারেন না। আমার তো মনে হয়, রাজনৈতিক মতামতের জন্যই বাবা মস্কো যাবার কথা বলতে অনিচ্ছুক; কারণ তিনি জানেন যে কারো তোয়াক্কা না করে নিজের মতামত প্রকাশ করলেই সেখানে সংঘর্ষ বেধে যাবে। বোনাপার্টকে নিয়ে বিতর্ক তো অনিবার্য, আর তার ফলে চিকিৎসায় যেটুকু ভালো ফল হবে তাও বিফলে যাবে। যাই হোক, শীঘ্রই এ ব্যাপারে একটা সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
