একটি বাগদত্তা দম্পতির উপস্থিতিতে বাড়িতে যে ধরনের কাব্যিক একঘেয়েমি ও প্রশান্তি বিরাজ করে, এ বাড়িতেও সেই আবহাওয়া চলতে লাগল। অনেক সময়ই সকলে একসঙ্গে বসেও প্রত্যেকেই চুপচাপ থাকে। কখনো বা সকলে সেখান থেকে চলে যায়, ওরা দুজন একলা থাকে, কিন্তু তবু চুপচাপ বসে থাকে। ভবিষ্যৎ জীবনের কথা তারা কদাচিৎ বলে। সেসব কথা বলতে প্রিন্স আন্দ্রুর ভয় করে, সে লজ্জা পায়। অন্য সবকিছুর মতোই নাতাশা প্রিন্স আন্দ্রুর এই মনোভাবেরও অংশীদার হয়। একবার নাতাশা প্রিন্স আন্দ্রুকে তার ছেলের কথা জিজ্ঞাসা করলে যে যথারীতি লজ্জায় লাল হয়ে উঠল, তার এই ভাবটা নাতাশার খুব পছন্দ-বলল যে ছেলে তাদের সঙ্গে থাকবে না।
কেন থাকবে না? নাতাশা সভয়ে জানতে চাইল।
তার ঠাকুরদার কাছ থেকে তাকে সরিয়ে নিতে আমি পারব না, আর তাছাড়া…
তার মনের কথা বুঝে নিয়ে নাতাশা সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল, আমি তাকে কত ভালোবাসতাম! কিন্তু আমি জানি আমাদের দোষ ধরার যে-কোনো কারণকে তুমি এড়িয়ে চলতে চাও।
কখনো বা বুড়ো কাউন্ট নিজে এসে প্রিন্স আন্দ্রুকে চুমো খায়, পেতয়ার লেখাপড়া বা নিকলাসের সম্পর্কে তার পরামর্শ চায়। তাদের দিকে তাকিয়ে বুড়ি কাউন্টেস দীর্ঘশ্বাস ফেলে। সোনিয়ার মনে সবসময়ই ভয় পাছে সে দুজনের মিলনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, আর তাই যেকোন ছুতোনাতায় সে তাদের একলা রেখে সরে পড়ে। প্রিন্স আন্দ্রু যখন কথা বলে (সে খুব ভালো গল্প বলতে পারে) নাতাশা তখন গর্বের সঙ্গে তা শোনে; আর নাতাশা লক্ষ্য করে যে যখনই সে কথা বলে তখনই প্রিন্স আন্দ্রু গভীর মনোযোগর সঙ্গে তার দিকে তাকিয়ে থাকে। বিব্রত হয়ে সে নিজেকেই প্রশ্ন করে : আমার মধ্যে সে কী খোঁজে? আমার দিকে তাকিয়ে কিছু আবিষ্কারের চেষ্টা করছে কী! যা খুঁজছে যদি না পায়? প্রিন্স আন্দ্রু কদাচিৎ হাসে, কিন্তু যখন হাসে তখন মন-প্রাণ ঢেলে দিয়ে হাসে, আর সেই হাসির পরেই নাতাশার মনে হয় সে যেন তার আরো অনেক কাছে এসে গেছে। নাতাশার এই সুখ ষোলকলায় পূর্ণ হত যদি না তাদের আসন্ন বিচ্ছেদের চিন্তা তাতে শংকিত করে তুলত, সেই একই চিন্তায় প্রিন্স আন্দ্রুর মুখটাও বিবর্ণ ও কঠিন হয়ে ওঠে।
পিটার্সবুর্গ থেকে চলে যাবার প্রাক্কালে প্রিন্স আন্দ্রু একদিন পিয়েরকে সঙ্গে নিয়ে এল, বল-নাচের পরে পিয়ের একদিনও রস্তভদের বাড়ি আসেনি। তাকে খুবই বিষণ্ণ ও বিব্রত মনে হল। সে কাউন্টেসের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করল। নাতাশা ও সোনিয়া একটা ছোট দাবার ছক নিয়ে বসেছিল। তাদের ডাক শুনে প্রিন্স আন্দ্রুও সেখানে গেল।
বলল, বেজুখভকে তো তুমি অনেকদিন ধরেই চেন? তাকে কেমন লাগে?
হ্যাঁ, সে ভালো, তবে খুবই খেয়ালি।
পিয়েরের কথা বলতে গিয়ে তার অন্যমনস্কতার অনেক কাহিনী সে বলে গেল, এমনকি কিছু বানিয়েও বলল।
প্রিন্স আন্দ্রু হঠাৎ গম্ভীর হয়ে বলল, তুমি কি জান আমাদের গোপন কথা সবই তাকে বিশ্বাস করে বলেছি। ছেলেবেলা থেকেই তাকে আমি চিনি। তার মনটা সোনা দিয়ে গড়া। তোমাকে মিনতি করছি নাতালি…আমি তো চলে যাচ্ছি, কী যে ঘটবে তা ঈশ্বরই জানেন। হয়তো তোমার ভালোবাসা… ঠিক আছে, আমি জানি সেটা আমার বলার কথা নয়। শুধু এইটুকু : আমি যখন এখানে থাকব না তখন তোমার যাই ঘটুক না কেন…।
কী ঘটতে পারে?
প্রিন্স আন্দ্রু বলতে লাগল, যত বিপদই আসুক, তোমাকে মিনতি করছি মাদময়জেল সোফি, যাই ঘটুক না কেন, পরামর্শ ও সাহায্যের জন্য একমাত্র তার দিকেই হাত বাড়িয়ে! সে খুবই অন্যমনস্ক ও খেয়ালি মানুষ, কিন্তু তার অন্তরটা সোনা দিয়ে গড়া।
প্রেমিকের কাছ থেকে এই বিচ্ছেদ নাতাশার উপর কি প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে সেটা কেউ বুঝতে পারেনি–তার বাবা নয়, মা নয়, সোনিয়া নয়, এমন কি প্রিন্স আন্দ্রুন্তু নিজেও নয়। মুখ লাল করে উত্তেজিতভাবে সে সারাদিন বাড়িময় ঘুরে বেড়াতে লাগল, তুচ্ছ জিনিস নিয়ে সময় কাটাতে লাগল। বিদায় নিয়ে প্রিন্স আন্দ্রু যখন তার হাতে চুমো খেল তখন সে কাঁদল না পর্যন্ত। শুধু এমন স্বরে বলল যেও না! যে প্রিন্স আন্দ্রু সবিস্ময়ে ভাবল তার এখান থেকে যাওয়াটা উচিত কি না; অনেকদিন পর্যন্ত সে স্বর তার মনে পড়ত। সে চলে যাবার পরেও নাতাশা কাঁদল না; কিন্তু কয়েকদিন ধরেই শুকনো চোখে নিজের ঘরে চুপচাপ বসে থাকে, কোনো কিছুতেই মন দেয় না, শুধু মাঝে মাঝেই বলে ওঠে, আঃ, কেন সে চলে গেল?
কিন্তু প্রিন্স আন্দ্রু চলে যাবার পক্ষকাল পরে আশপাশের সকলকে অবাক করে দিয়ে অত্যন্ত আকস্মিকভাবেই সেই মানসিক বিষণ্ণতাকে কাটিয়ে উঠে নাতাশা আবার তার আগেকার অবস্থায় ফিরে গেল, কিন্তু তার মধ্যে একটা নৈতিক পরিবর্তন দেখা দিল ঠিক যেরকমভাবে দীর্ঘ রোগভোগের পরে কোনো শিশুর মুখের ভাবের পরিবর্তন ঘটে।
.
অধ্যায়-২৫
ছেলে চলে যাবার পর থেকেই প্রিন্স নিকলাস বলকনস্কির স্বাস্থ্য ও মেজাজ আরো খারাপ হয়ে পড়ল। সে আরো খিটখিটে হয়ে উঠল, আর প্রায়ই তার অকারণ ক্রোধের ঝাঁপটা এসে পড়ত প্রিন্সেস মারির উপরেই। বেছে বেছে প্রিন্সেস মারির মনের নরম জায়গাগুলির উপরেই সে কঠোরভাবে আঘাত করত। প্রিন্সেস মারির জীবনে দুটোই আকর্ষণ আর দুটোই আনন্দ-ভাইপো ছোট নিকলাস, আর ধর্ম–আর এই দুটিই হয়ে উঠল প্রিন্সেস আক্রমণ ও ঠাট্টার প্রিয় বিষয়বস্তু। যে কথাই উঠুক সে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে বয়স্কা কুমারিদের কুসংস্কার এবং ছেলেমেয়েদের আদর দিয়ে নষ্ট করার প্রসঙ্গে চলে যেত। বলত, তুমি তো ওকে-ছোট নিকলাসকে-তোমার মতোই বুড়ি বানাতে চাইছ! কী দুঃখের কথা! প্রিন্স আন্দ্রুন্তু চাইছে একটি ছেলে, আর তুমি ওকে বানাচ্ছে একটা বুড়ি! অথবা মাদময়জেল বুরিয়ের দিকে ফিরে প্রিন্সেস মারির সামনেই তাকে জিজ্ঞাসা করত গ্রাম্য পুরোহিত ও দেবমূর্তিগুলিকে তার পছন্দ কি না, তাদের নিয়ে অনেকরকম ঠাট্টা রসিকতাও করত।
