তার কাছে এগিয়ে নাতাশা থেমে গেল। প্রিন্স আন্দ্রু তার হাতখানা ধরে তাতে চুমো খেল।
তুমি আমাকে ভালোবাস?
হ্যাঁ, হ্যাঁ, যেন বিরক্ত হয়েই অনুচ্চ কণ্ঠে নাতাশা বলল। তারপর সশব্দে দীর্ঘশ্বাস ফেলে দ্রুত শ্বাস টানতে টানতে হঠাৎ ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল।
একি হল? ব্যাপার কি?
ওঃ, আমি কত সুখী! নাতাশা জবাব দিল, চোখের জলের ভিতর দিয়ে হাসি ফুটিয়ে তার আরো কাছে এগিয়ে গেল, একমুহূর্ত থেমে যেন জানতে চাইল সে কাজটা করতে পারে কি না, তারপরই তাকে চুমা খেল।
প্রিন্স আন্দ্রু তার হাত দুটি ধরল, চোখে চোখ রাখল, কিন্তু নিজের অন্তরে নাতাশার প্রতি আগেকার ভালোবাসাকে খুঁজে পেল না। তার মধ্যে কি যেন হঠাৎ বদলে গেছে, আগেকার সেই কাব্যময় ও রহস্যময় বাসনার মোহ যেন আর নেই, শুধু আছে নাতাশার নারীসুলভ, শিশুসুলভ দুর্বলতার প্রতি করুণা, তার অনুরাগ ও বিশ্বস্ততার জন্য ভয়, আর আছে একটি আনন্দময় কর্তব্যবোধ যা তাকে চিরকালের মতো এই মেয়েটির সঙ্গে একসূত্রে বেঁধে দিয়েছে। এখনকার এই অনুভূতি আগেকার মতো উজ্জ্বল ও কাব্যময় না হলেও তার চাইতে অধিক শক্তিশালী ও গুরুতর।
তখনো নাতাশার চোখের দিকে তাকিয়ে প্রিন্স আন্দ্রু বলল, তোমার মা কি বলেছেন যে বিয়েটা এক বছরের মধ্যে হতে পারছে না?
নাতাশা ভাবল, এও কি সম্ভব যে এখন আমি এই অপরিচিত, প্রিয়, চৌকোস লোকটির স্ত্রী ও সমকক্ষ হব, অথচ আমার বাবা পর্যন্ত একে উঁচু নজরে দেখে? একি সত্যি হতে পারে? একি সত্যি হতে পারে যে এখন থেকে আর জীবন নিয়ে খেলা করা চলবে না, আমি এখন বড় হয়েছি, আমার প্রতিটি কথা ও কাজের দায়িত্ব এখন আমার নিজের? হ্যাঁ, কিন্তু সে আমাকে কি বলল?
প্রিন্স আন্দ্রুর প্রশ্নটা বুঝতে না পেরেই সে জবাব দিল, না।
প্রিন্স আন্দ্রু বলল, আমাকে ক্ষমা কর। কিন্তু তুমি এখনো এত ছোট, আর আমি জীবনের কত পথ পার হয়ে এসেছি। তোমার জন্য আমার ভয় হয়, এখনো তুমি নিজেকেই চেনো না।
গভীর মনোযোগের সঙ্গে নাতাশা কথাগুলি শুনল, কিন্তু চেষ্টা করেও তার অর্থ বুঝতে পারল না।
প্রিন্স আন্দ্রু বলতে লাগল, এই যে একটা বছর আমার সুখকে বিলম্বিত করে দিল সেটা খুবই কঠোর, তবু এই এক বছর তুমি নিজে নিশ্চিত হবার সময় পাবে। আমি অনুরোধ করছি, এক বছর পরে তুমি আমাকে সুখী করবে, কিন্তু তুমি থাকবে মুক্ত : আমাদের বাকদান গোপন থাকবে, আর তুমি যদি বোঝ যে আমাকে ভালোবাস না, অথবা যদি ভালোবাস… অস্বাভাবিক হাসির সঙ্গে প্রিন্স আন্দ্রু বলল।
নাতাশা তাকে বাধা দিল, ও কথা কেন বলছ? তুমি তো জান, প্রথম যেদিন অত্রাদতে এসেছিলে সেদিন থেকেই তোমাকে ভালোবেসেছি।
এক বছরের মধ্যে তুমি নিজেকে জানতে শিখবে…
একটা পুরো বছর! নাতাশা হঠাৎ কথাটা বলল, যেন এইমাত্র সে বুঝতে পেরেছে যে বিয়েটা এক বছর পিছিয়ে দিতে হবে। কিন্তু এক বছর কেন? এক বছর কেন?…
প্রিন্স আন্দ্রু বিলম্বের কারণটা বুঝিয়ে বলতে লাগল, কিন্তু নাতাশা কিছুই শুনল না।
সে শুধু জিজ্ঞেস করল এটাকে কি বদলানো যায় না? প্রিন্স আন্দ্রু জবাব দিল না, কিন্তু তার মুখই বলে দিল যে এ সিদ্ধান্ত বদলানো অসম্ভব।
এ যে ভয়ংকর! ওঃ, এ যে ভয়ংকর! ভয়ংকর! নাতাশা হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠেই ফুঁপিয়ে কেঁদে ফেলল। এক বছর অপেক্ষা করতে হলে আমি মরে যাব : এ অসম্ভব, এ ভয়ংকর! প্রেমিকের মুখের দিকে তাকিয়ে সেখানে দেখতে পেল সহানুভূতি ও বিচলিত ভাবের মিশ্র দৃষ্টি।
হঠাৎ চোখের পানি সংবরণ করে সে বলে উঠল, না, না, আমি সব করব! আমি আজ কত সুখী!
বাবা ও মা ঘরে ঢুকে বাগদত্তা দম্পতিকে আশীর্বাদ করল।
সেদিন থেকে প্রিন্স আন্দ্রু নাতাশার বাগদত্তা প্রেমিকরূপেই রস্ত পরিবারে আসা-যাওয়া শুরু করল।
.
অধ্যায়-২৪
কোনওরকম বাগদান অনুষ্ঠান হল না, বলকনস্কির সঙ্গে নাতাশার বিয়ের কথা ঘোষণা করাও হল না, প্রিন্স আন্দ্রুন্তু এটাই চেয়েছিল। সে বলল, যেহেতু বিলম্বের জন্য সেই দায়ী, সেইহেতু সবটা বোঝা তাকেই বইতে হবে, সে কথা দিয়েছে, চিরজীবনের মতো নিজেকে বেঁধেছে, কিন্তু নাতাশাকে সে বাঁধতে চায় না, সে তাকে পরিপূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছে। ছমাস পরে সে যদি বোঝে যে আমাকে ভালোবাসে না, তাহলে তাকে প্রত্যাখ্যান করবার পূর্ণ অধিকার নাতাশার থাকবে। স্বভাবতই নাতাশা বা তার বাবা-মা এ কথা শুনতে চাইল না, কিন্তু প্রিন্স আন্দ্রু সংকল্পে অটল। সে রোজ রস্তভদের বাড়িতে আসে, কিন্তু নাতাশার সঙ্গে বাগদত্তা প্রেমিকের মতো আচরণ করে না, তাকে ঘনিষ্ঠ নামে ডাকে না, চুমো খায় শুধু তার হাতে। তাদের দেখে মনে হয় যেন এর আগে তাদের মধ্যে কোনো পরিচয়ই ছিল না। যখন তারা কেউ কারো বিশেষ কিছু ছিল না তখন তারা পরস্পরকে যে চোখে দেখতে সেকথা স্মরণ করতে দুজনই ভালোবাসে, এখন তারা নিজেদের সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র মানুষ বলে মনে করে : তখন তারা ছিল কৃত্রিম, এখন তারা স্বাভাবিক ও আন্তরিক। প্রথম দিকে প্রিন্স আন্দ্রুর সঙ্গে চলাফেরা করতে রস্ত পরিবার বেশ অসুবিধা বোধ করত। ধীরে ধীরে তারা অভ্যস্ত হয়ে উঠল এবং তার উপস্থিতিতেই অসংকোচে নিজেদের জীবনযাত্রা অব্যাহত রেখে চলতে লাগল, আর প্রিন্স আন্দ্রুও তাতে অংশ নিতে লাগল।
