তার গলা কাঁপতে লাগল, প্রায় কেঁদে ফেলার উপক্রম, কিন্তু কোনোরকমে নিজেকে সংযত করে বলল :
আমি মোটেই বিয়ে করতে চাই না। তাকে আমি ভয় করি : এবার আমি শান্ত হয়েছি, একেবারে শান্ত হয়েছি।
পরদিন নাতাশা সেই পুরনো পোশাকটা পরল যেটা পরলে, তার বিশ্বাস, সকাল বেলায় মন প্রফুল্ল থাকে, আর সেদিন থেকেই আবার সে পুরনো জীবনযাত্রায় ফিরে গেল যেটা সে বল-নাচের দিন থেকে ছেড়ে দিয়েছিল। সকালের চা খাওয়া শেষ করে সে তার নাচের ঘরে চলে গেল এবং গান গাইতে শুরু করল।
হলের ফটকটা খুলে গেল, কে যেন জিজ্ঞাসা করল, বাড়ি আছে। তারপরেই পায়ের শব্দ শোনা গেল। নাতাশা তখন আয়নার দিকে তাকিয়ে ছিল, কিন্তু নিজেকে দেখছিল না। তার কান ছিল হলের শব্দের দিকে। যখন নিজেকে দেখতে পেল, তার মুখটা ম্লান হয়ে গেছে। সে এসেছে। বন্ধ দরজার ভিতর দিয়ে কণ্ঠস্বরের সামান্য আঁচ পেলেও সে ঠিক বুঝতে পেরেছে।
উত্তেজিত, বিবর্ণ মুখে নাতাশা বসবার ঘরে ছুটে গেল।
বলল, মামণি! বলকনস্কি এসেছে! মামণি, এ যে ভয়ংকর, এ যে অসহ্য! আমি আর…যন্ত্রণা ভোগ করতে চাই না। আমি কি করব?…
কাউন্টেস জবাব দেবার আগেই প্রিন্স আন্দ্রু উত্তেজিত, গম্ভীর মুখে ঘরে ঢুকল। নাতাশাকে দেখামাত্রই তার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে কাউন্টেসের ও নাতাশার হাতে চুমো খেল, সোফার পাশে বসল।
অনেকদিন হল তোমার দেখা…কাউন্টেস বলতে শুরু করামাত্রই প্রিন্স আন্দ্রু তাকে বাধা দিয়ে তাড়াতাড়ি তার প্রশ্নের জবাবটাই দিয়ে দিল।
এতদিন আপনাদের সঙ্গে দেখা করতে আসতে পারিনি, কারণ আমি বাবার কাছে গিয়েছিলাম। তাঁর সঙ্গে একটা গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা ছিল। সবে গতকাল রাতেই ফিরেছি। একটু থেমে আবার বলল, আপনার সঙ্গে একটু কথা বলতে চাই কাউন্টেস।
কাউন্টেস চোখ নামিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
অস্পষ্ট গলায় বলল, বল, আমি শুনছি।
নাতাশা বুঝতে পারল যে তার চলে যাওয়া উচিত, কিন্তু যেতে পারল না, কিসে যেন তার গলা চেপে ধরল, তারপর আচরণের নিয়মকানুন না মেনেই বড় বড় চোখ মেলে সোজা প্রিন্স আন্দ্রুর দিকে তাকাল।
এখনই? এই মুহূর্তে!…না, তা হতে পারে না! সে ভাবল।
প্রিন্স আন্দ্রু আবার নাতাশার দিকে তাকাল, সেই দৃষ্টি থেকেই নাতাশার ধারণা দৃঢ়তর হল যে সে ভুল বোঝেনি। হ্যাঁ, এখনই, এই মুহূর্তেই তার ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে যাক।
কাউন্টেস চুপি চুপি বলল, যাও নাতাশা! আমি তোমাকে ডাকব।
প্রিন্স আন্দ্রুর দিকে ও মায়ের দিকে ভীত, অনুনয়ভরা চোখে তাকিয়ে নাতাশা বেরিয়ে গেল।
আমি এসেছি কাউন্টেস, আপনার মেয়ের পাণি প্রার্থনা করতে, প্রিন্স আন্দ্রু বলল।
কাউন্টেসের মুখ গরম হয়ে উঠল, কিন্তু মুখে কিছুই বলল না।
অবশেষে গম্ভীর গলায় বলতে শুরু করল, তোমার প্রস্তাবে… প্রিন্স আন্দ্রু নীরব। তোমার প্রস্তাব আমাদের কাছে গ্রহণীয় এবং…আমি তোমার প্রস্তাব গ্রহণ করছি। আমি খুশি হয়েছি। আর আমার স্বামীও…আশা করি…কিন্তু সবকিছু নির্ভর করছে নাতাশার উপর…
আপনার সম্মতি পেলেই আমি তার সঙ্গে কথা বলব।…আপনি সম্মতি দিলেন তো? প্রিন্স আন্দ্রু বলল।
হ্যাঁ, কাউন্টেস জবাব দিল। সে প্রিন্স আন্দ্রুর দিকে হাতটা বাড়িয়ে দিল, আর প্রিন্স যখন সেই হাতে চুমো খাবার খাবার জন্য নিচু হল তখন বিরোধ ও মমতার মিশ্র অনুভূতির সঙ্গে তার কপালে ঠোঁট দুটি স্পর্শ করল। ইচ্ছা হল, ছেলের মতো তাকে ভালোবাসে, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে মনে হল যে তার কাছে প্রিন্স একটি অপরিচিত ও ভয়ংকর লোক। আমি নিশ্চিত যে আমার স্বামী সম্মতি দেবেন, কিন্তু তোমার বাবা…।
বাবাকে সব কথা বলেছি, তিনি এই সুস্পষ্ট শর্তে সম্মতি দিয়েছেন যে বিয়েটা হবে এক বছর পরে। আর সে কথাই আপনাকে বলতে এসেছি, প্রিন্স আন্দ্রু বলল।
একথা ঠিক যে নাতাশা এখনো ছেলেমানুষ, কিন্তু-তাই বলে এত দেরি?…
এটা অনিবার্য, দীর্ঘশ্বাস ফেলে প্রিন্স আন্দ্রু বলল।
মেয়েকে তোমার কাছে পাঠিয়ে দিচ্ছি, এই কথা বলে কাউন্টেস ঘর থেকে চলে গেল।
মেয়েকে খুঁজতে খুঁজতে বার বার বলল, প্রভু আমাদের করুণা করুন!
সোনিয়া বলল, নাতাশা তার শোবার ঘরেই আছে। ম্লান মুখে শুকনো চোখে বিছানার উপর বসে নাতাশা একদৃষ্টিতে দেবমূর্তির দিকে তাকিয়ে আছে এবং অতি ক্রুশ-চিহ্ন আঁকতে আঁকতে ফিসফিস করে কি যেন বলছে। মাকে দেখেই সে লাফ দিয়ে যেন উড়ে তার কাছে চলে এল। ।
এই যে মামণি?…তারপর?…
যাও, তার কাছে যাও। সে তোমার পাণি প্রার্থনা করেছে, কাউন্টেসের কথাগুলি নাতাশার কানে কেমন যেন উদাসীন শোনাল। বিন্ন সুরে, কিছুটা তিরস্কারের ভঙ্গিতেই মা আবার বলল, যাও…যাও, মেয়ে ছুটে বেরিয়ে গেল।
কেমন করে সে যে বসবার ঘরে ঢুকেছিল নাতাশা তা মনেও করতে পারে না। ভিতরে ঢুকে প্রিন্স আন্দ্রুকে দেখেই সে থমকে দাঁড়াল। এও কি সম্ভব যে এই অপরিচিত লোকটিই এখন আমার সর্বস্ব হয়ে উঠেছে? নিজেকে প্রশ্ন করে সঙ্গে সঙ্গেই সে জবাব দিল, হা, সর্ব! জগতের সবকিছু অপেক্ষা সেই এখন আমার প্রিয়তর। চোখ দুটি নত করে প্রিন্স আন্দ্রু তার দিকে এগিয়ে গেল।
প্রথম দেখার মুহূর্ত থেকেই তোমাকে আমি ভালোবেসেছি। আমি কি আশা করতে পারি?
নাতাশার দিকে তাকিয়ে তার মুখের গম্ভীর আবেগহীন ভাব দেখে প্রিন্স আন্দ্রু অবাক হয়ে গেল। তার মুখ । বলছে : কেন জিজ্ঞাসা করছ? যা তুমি জেনেছ তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করছ কেন? মনের কথা যখন কথায় প্রকাশ করা যায় না, তখন কথা বলছ কেন?
