কিন্তু তার কথা?
সে তোমাকে ভালোবাসে।
হেসে পিয়েরের চোখে চোখ রেখে প্রিন্স আন্দ্রু বলল, বাজে কথা বল না…
পিয়ের হিংস্র গলায় বলে উঠল, সে ভালোবাসে, আমি জানি।
পিয়েরের হাত চেপে ধরে প্রিন্স আন্দ্রু বলল, কিন্তু মন দিয়ে শোন। আমি কি অবস্থায় আছি তা কি তুমি জান? তা নিয়ে কারো সঙ্গে কথা বলতেই হবে।
বলে যাও, বলে যাও। আমি খুব খুশি, পিয়ের বলল। এবার সত্যি তার মুখটা বদলে গেল, ভুরু সমান হয়ে গেল, খুশি মনে সে প্রিন্স আন্দ্রুর কথা শুনতে লাগল। দেখে মনে হল, প্রিন্স আন্দ্রু সম্পূর্ণ আলাদা, সম্পূর্ণ নতুন এক মানুষ হয়ে গেছে, আসলেও তাই হয়েছে। কোথায় গেল তার ঈর্ষা, তার জীবনের প্রতি ঘৃণা, তার মোহভঙ্গ? পিয়েরই একমাত্র লোক যার কাছে সে খোলাখুলি সব কথা বলবে বলে স্থির করল, আর মনের সব কথাই তাকে বলল। এবার সে বহুদূর প্রসারিত ভবিষ্যতের পরিকল্পনা করে ফেলল, জানাল যে বাবার খেয়ালের জন্য সে নিজের সুখকে বিসর্জন দিতে পারবে না, হয় সে এ বিয়েতে বাবার সম্মতি আদায় করে নাতাশাকে ভালোবাসবে, অথবা তার সম্মতি ছাড়াই যা করবার তা করবে।
প্রিন্স আন্দ্রু বলল, আমি যে এভাবে ভালোবাসতে পারি একথা অন্য কেউ বললে আমি বিশ্বাস করতাম না। অতীতে যা আমি জানতাম এটা মোটেই সেরকম অনুভূতি নয়। আমার কাছে গোটা জগৎটাই এখন দুই ভাগে ভাগ হয়ে গেছে : তার একভাগ নাতাশা, সেখানে শুধুই আনন্দ, আশা ও আলো : আর অন্য ভাগে আছে। সবকিছু যেখানে সে নেই, সেখানে শুধু দুঃখ ও অন্ধকার…।
অন্ধকার ও দুঃখ, পিয়ের কথাটা আর একবার উচ্চারণ করল, ঠিক, ঠিক, আমি সব বুঝতে পারি।
আলোকে ভালো না বেসে আমি পারি না। সেটা তো আমার দোষ নয়। আর আমি কত সুখী! আমার কথা বুঝতে পারছ? আমি জানি, আমার জন্য তুমিও খুশি।
হ্যাঁ, হ্যাঁ, বন্ধুর দিকে ব্যথিত, বিষণ্ণ দৃষ্টি মেলে পিয়ের কথাটা মেনে নিল। তার চোখে প্রিন্স আন্দ্রুর কপাল যত উজ্জ্বল হতে লাগল, তার নিজের কপাল হয়ে উঠল ততই বিষণ্ণতর।
.
অধ্যায়-২৩
বিয়েতে বাবার সম্মতি প্রয়োজন, তাই সম্মতি পাবার জন্য প্রিন্স আন্দ্রু পরদিনই দেশের উদ্দেশে যাত্রা করল।
তার বাবা ভিতরে রাগ ও বাইরে শান্ত ভাব নিয়ে ছেলের সব কথা শুনল। সে বুঝতে পারল না, নিজের জীবনই যখন শেষ হয়ে এসেছে তখন সে কেমন করে সে জীবনের পরিবর্তন ঘটাতে অথবা কোনো নতুন কিছু সেখানে প্রবর্তন করতে ইচ্ছুক হতে পারে। বুড়ো মানুষটি ভাবল, শুধু তারা যদি আমার ইচ্ছামতো আমার দিনগুলোকে কাটাতে দেয় তাহলে তারা যা খুশি তাই করুক। অবশ্য ছেলের সঙ্গে সে সেই চালটি দিল যা সে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের জন্য তুলে রাখে, শান্ত গলায় সব ব্যাপারটা নিয়ে সে আলোচনা করল।
প্রথমত জন্ম, সম্পত্তি ও পদমর্যাদার বিচারে বিয়েটা খুব একটা ভালোকিছু নয়। দ্বিতীয়ত, এখন আর সে আগের মতো যুবকটি নয়, তার স্বাস্থ্যও খারাপ, আর মেয়েটি তরুণী। তৃতীয়ত, তার একটি ছেলে আছে যাকে ঐ প্রতারক মেয়েটির হাতে তুলে দিলে সেটা খুবই দুঃখের ব্যাপার হবে। চতুর্থত এবং শেষ কথা, বিয়েটা তুমি এক বছর বন্ধ রাখ : বিদেশে যাও, আরোগ্য লাভ কর, এবং যেমনটি চেয়েছিলে প্রিন্স নিকলাসের জন্য একজন জার্মান শিক্ষক সংগ্রহ কর। তোমার ভালোবাসা, বা কামনা, বা একগুয়েমি যা খুশি বলতে পার-যদি তখনো আজকের মতোই জোরদার থাকে তো বিয়ে করো! আর এ ব্যাপারে এটাই আমার শেষ কথা। মনে রেখো, শেষ কথা! কাউন্ট এমন গলায় কথাটা শেষ করল যাতে বোঝা গেল যেকোন অবস্থাতেই তার এই সিদ্ধান্তের পরিবর্তন ঘটবে না।
প্রিন্স আন্দ্রু পরিষ্কার বুঝতে পারল, বুড়ো আশা করছে যে তার মনোভাব অথবা তার বাকদত্তার মনোভাব এক বছরের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারবে না, অথবা তার আগেই সে (বুড়ো প্রিন্স স্বয়ং) নিজেই মারা যাবে, কাজেই বাবার ইচ্ছাটাকে মেনে নেয়াই সে স্থির করল–বিয়ের প্রস্তাব করে এক বছরের জন্য বিয়েটাকে স্থগিত রাখবে।
রস্তভদের সঙ্গে শেষ সন্ধ্যাটা কাটাবার তিন সপ্তাহ পরে প্রিন্স আন্দ্রু পিটার্সবুর্গে ফিরে গেল।
মার সঙ্গে সে রাতের কথাবার্তার পরের দিন নাতাশা সারাটা দিন বলকনস্কির জন্য অপেক্ষা করে রইল, কিন্তু সে এল না। দ্বিতীয় দিন ও তৃতীয় দিনেও সেই একই অবস্থা। পিয়েরও আর আসেনি, প্রিন্স আন্দ্রুন্ডু যে বাবার সঙ্গে দেখা করতে গেছে সেকথা জানত না বলে তার অনুপস্থিতির কারণ নাতাশা কিছুই বুঝতে পারল না।
এইভাবে তিন সপ্তাহ পার হয়ে গেল। নাতাশা বাইরে কোথাও যায় না, ছায়ার মতো এ-ঘর থেকে ও ঘরে ঘুরে বেড়ায়, রাতে গোপন চোখের জল ফেলে, সন্ধ্যায় মার কাছেও যায় না। অনবরত চোখ-মুখ লাল করে থাকে, মেজাজ খিটখিটে হয়ে উঠেছে। তার মনে হয়, সকলেই তার এই হতাশার কথা জানে, তাকে দেখে হাসে, করুণা করে। একে মনোকষ্টের অন্ত নেই, তার উপর এভাবে অহংকারে আঘাত লাগায় তার কষ্ট আরো বেড়ে গেছে।
একসময় মার কাছে গেল, কিছু বলতে চেষ্টা করল, তারপর হঠাৎ কেঁদে ফেলল।
কাউন্টেস নাতাশাকে সান্ত্বনা দিল, কিছুক্ষণ মার কথা কান পেতে শুনে হঠাৎ সে বাধা দিয়ে বলল, ওকথা থাক মামণি। ও নিয়ে আমি ভাবি না, ভাবতে চাই না। সে এসেছিল, চলে গেছে, চলে গেছে…
