সন্ধ্যায় প্রিন্স আন্দ্রু চলে গেলে কাউন্টেস নাতাশার কাছে গিয়ে চুপিচুপি বলল : তারপর, কি হল?
মামণি! ঈশ্বরের দোহাই, এখন আমাকে কিছু জিজ্ঞাসা করো না। সেকথা কেউ মুখে বলতে পারে না, নাতাশা বলল।
তা সত্ত্বেও সেদিন রাতে কখনো উত্তেজিত, কখনো ভীত মনে অনেকক্ষণ পর্যন্ত সে মায়ের বিছানায় শুয়ে সামনের দিকে তাকিয়ে রইল। প্রিন্স আন্দ্রু যে তার প্রশংসা করেছে, নিজের বিদেশে যাবার কথা বলেছে, গ্রীষ্মকালটা তারা কোথায় কাটাতে যাবে সেকথা জানতে চেয়েছে, এবং বরিস সম্পর্কেও অনেক কথা জিজ্ঞাসা করেছে–এ সবই সে একে একে মাকে বলল।
আর বলল, কিন্তু এরকম…এরকম…কখনো আমার হয়নি। সে কাছে এলেই আমার কেমন ভয় করে। তার কাছে থাকলেই ভয় করে। তার অর্থ কি? তার কি এই অর্থ যে এটাই আসল জিনিস? কি বল? ঘুমিয়ে পড়লে মামণি?
না বাছা, আমি নিজেও ভয় পাচ্ছি, মা জবাব দিল। এবার যাও!
যাই বল, আমি ঘুমতে পারব না। ঘুমিয়ে পড়াটা কী বোকামি! মামণি! মামণি! আগে কখনো তো আমার এরকম হয়নি। আমরা কি কখনো ভাবতে পারতাম!…
নাতাশার মনে হতে লাগল, অত্রাদণু-তে প্রথম যখন প্রিন্স আন্দ্রুকে দেখেছিল তখনই তাকে ভালোবেসেছিল। যাকে সে সেদিনই পছন্দ করেছিল তার সঙ্গেই আবার দেখা হওয়ার এবং সেই মানুষটিকে তার প্রতি অনুরক্ত দেখার এই অপ্রত্যাশিত বিচিত্র সুখটাকেই যেন তার যত ভয়।
আমরা যখন এখানে এলাম তখনই যে সেও বিশেষ করে পিটার্সবুর্গেই আসবে এটাই ঘটতে বাধ্য। বল নাচে তার সঙ্গে আমাদের যে দেখা হবে সেটাও ঘটতে বাধ্য। এটাই নিয়তি। স্পষ্টত এটাই নিয়তি, সবকিছুর এখানেই পরিণতি! যখনই তাকে দেখলাম তখনই একটা অদ্ভুত অনুভূতি জাগল আমার মনে।
সে তোমাকে আর কি বলেছে? কবিতাগুলোই বা কিসের? সেগুলি পড় তো… প্রিন্স আন্দ্রু নাতাশার এ্যালবামে যে কবিতাগুলি লিখে দিয়েছে তার কথাই মা বলল।
মামণি, সে যে বিপত্নীক তা নিয়ে কি লজ্জা পাবার কিছু আছে?
লজ্জা পাবে কেন নাতাশা! ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা কর। বিয়ের ব্যবস্থা স্বর্গে বসে তিনিই করেন। মা বলল।
লক্ষ্মী মামণি, তোমাকে আমি কত ভালোবাসি! আমি কত সুখী! নাতাশা চেঁচিয়ে বলল, তারপর আনন্দে ও উত্তেজনায় চোখের জল ফেলতে ফেলতে মাকে জড়িয়ে ধরল।
ঠিক সেই সময়েই প্রিন্স আন্দ্রু পিয়েরের সঙ্গে বসে তাকে বলতে লাগল, নাতাশাকে সে ভালোবাসে, তাকে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করতে সে দৃঢ়সংকল্প।
.
সেদিনই কাউন্টেস হেলেনের বাড়িতে একটা মজলিসের আয়োজন করা হয়েছিল। সেখানে উপস্থিত ছিল ফরাসি রাষ্ট্রদূত, জনৈক বিদেশী প্রিন্স এবং অনেক উঁচুমহলের ভদ্রমহিলা ও ভদ্রলোক। পিয়ের নিচের তলায় এসে এ-ঘরে ও-ঘরে বেড়াতে লাগল, তার উদাসীন, মনমরা ভাব সকলেরই চোখে পড়ল।
বল-নাচের পর থেকেই তার মধ্যে একটা স্নায়বিক অবসন্নতা দেখা দিয়েছে, সেটাকে প্রতিরোধ করতে সেও আপ্রাণ চেষ্টা করছে। রাজবংশের প্রিন্সের সঙ্গে স্ত্রীর ঘনিষ্ঠতার পর থেকেই পিয়েরের মনে এই বিষণ্ণতা দেখা দিয়েছে, মানবজীবনের সবকিছুই বৃথা-এই অশুভ চিন্তা প্রায়ই তাকে পেয়ে বসে। সঙ্গে সঙ্গে নাতাশা ও প্রিন্স আন্দ্রুর পারস্পরিক সম্পর্কের কথা ভেবে এবং তার ও বন্ধুর অবস্থার পার্থক্যের কথা ভেবে তার এই বিষণ্ণতা যেন আরো বেড়ে ওঠে। স্ত্রীর চিন্তা এবং নাআশা ও প্রিন্স আন্দ্রুর চিন্তা এড়িয়ে চলতেই সে চেষ্টা করে, তখনই অনন্তকালের তুলনায় সব কিছুই তুচ্ছ মনে হয়, সেই একই প্রশ্ন : তাহলে কিসের জন্য? আবারও মনের সামনে ভেসে ওঠে, আর তখনই সে বেশি করে ভ্রাতৃসংঘের কাজের মধ্যে ডুবে যেতে চেষ্টা করে, সেই অশুভ শক্তিটাকে তাড়িয়ে দিতে চায়। মধ্যরাতে কাউন্টেসের বাসা থেকে বেরিয়ে এসে তার তামাকের ধোয়ায় আচ্ছন্ন নিচু ঘরের টেবিলে বসে একটা নোংরা ড্রেসিং-গাউন পরে সে যখন স্কটিশ আশ্রমের মূল কাগজপত্র নকল করার কাজ শুরু করল তখন কে যেন ঘরে ঢুকল। প্রিন্স আন্দ্রু।
আরে, তুমি! অসন্তুষ্ট গলায় পিয়ের বলল। আর দেখতেই তো পাচ্ছ, আমি বড়ই ব্যস্ত, পাণ্ডুলিপির খাতাটা দেখিয়ে বলল।
প্রিন্স আন্দ্রুর চোখ-মুখ নতুন জীবনের উচ্ছ্বাসে ঝলমল করছে। পিয়েরের সামনে দাঁড়িয়ে তার বিষণ্ণ দৃষ্টিটা লক্ষ্য না করে নিজের আনন্দেই সে হাসতে লাগল।
বলল, দেখ প্রাণের বন্ধু, কালই তোমাকে ব্যাপারটা বলতে চেয়েছিলাম, আজ বলতেই এসেছি। আগে কখনো এরকম অভিজ্ঞতা আমার হয়নি। আমি প্রেমে পড়েছি বন্ধু!
হঠাৎ একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে পিয়ের তার ভারি দেহটা সোফায় এলিয়ে দিল।
বলল, নাতাশা রস্তভার সঙ্গে, কি বল?
ঠিক, ঠিক! সে ছাড়া আর কে হবে? একথা আমি বিশ্বাস করতেই পারতাম না, কিন্তু প্রেম যে আমার চাইতে বেশি শক্তিশালী। কাল যন্ত্রণায় ক্ষত-বিক্ষত হয়েছি, কিন্তু পৃথিবীর কোনো কিছুর সঙ্গেই সে যন্ত্রণাকে আমি বদল করতে চাই না। এতদিন যেন আমি বেঁচেই ছিলাম না, অবশেষে বেঁচে উঠেছি, কিন্তু তাকে ছাড়া আমি বাঁচতে পারব না! কিন্তু সে কি আমাকে ভালোবাসবে?…তার কাছে আমি যেন বড় বেশি বুড়ো…তুমি কথা বলছ না কেন?
আমি? আমি? আমি তোমাকে কি বলেছি? হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে পিয়ের বলল, আর তারপরেই ঘরময় পায়চারি করতে লাগল। একথা আমি আগেই ভেবেছি…মেয়েটি একটি রত্ন…এরকম মেয়ে দেখা যায় না…প্রিয় বন্ধু, তোমাকে মিনতি করছি, কোনোরকম চিন্তা করো না, সংশয় করো না, বিয়ে কর, বিয়ে কর, বিয়ে কর…নিশ্চিত করে বলছি, তোমার চাইতে সুখী কেউ হবে না।
