সে ভাবল, ওদের দুইজনের মধ্যে একটা গুরুতর কিছু ঘটছে, সঙ্গে সঙ্গে একাধারে খুশির ও বেদনার একটা অনুভূতি দেখা দিল তার মনে, খেলার দিকে তার মনে রইল না।
ছটা রাবার খেলার পরে সেনাপতি খেলা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল, বলল, এভাবে খেলে কোনো লাভ নেই, পিয়েরও মুক্তি পেল। একদিকে নাতাশা কথা বলছিল সোনিয়া ও বরিসের সঙ্গে, আর সূক্ষ্ম হাসি হেসে ভেরা কি যেন বলছিল প্রিন্স আন্দ্রুকে। পিয়ের বন্ধুর দিকে এগিয়ে গেল এবং তারা কোনো গোপন কথা বলছে কিনা জানতে চেয়ে তাদের পাশেই বসে পড়ল। সে লক্ষ্য করল ভেরা তার নিজের কথা নিয়েই মশগুল হয়ে আছে, আর প্রিন্স আন্দ্রুকে কেমন যেন বিব্রত মনে হচ্ছে, অথচ তার বেলায় এরকমটা বড় একটা ঘটে না।
বাঁকা হাসি হেসে ভেলা বলল, আপনি কি মনে করেন প্রিন্স? একবার দেখেই তো আপনি মানুষের চরিত্র এত ভালো বুঝতে পারেন। নাতালির ব্যাপারে আপনি কি মনে করেন? তার অনুরাগ কি স্থায়ী হবে? অন্য নারীর মতো (সে যেন নিজেকেই বোঝাতে চাইছিল) সে কি কোনো পুরুষকে চিরদিনের মতো ভালোবাসতে পারে, চিরকাল তার প্রতি বিশ্বস্ত থাকতে পারে? আমি তো সেটাকেই সত্যিকারের ভালোবাসা বলে মনে করি। আপনি কি বলেন প্রিন্স?
ঈষৎ ব্যঙ্গের হাসি হেসে প্রিন্স আন্দ্রু বলল, আপনার বোনকে আমি এত অল্প জানি যে এধরনের কোনো সূক্ষ্ম প্রশ্নের মীমাংসা করা সম্ভব নয়, তাছাড়া আমি দেখেছি একটি নারী যত কম আকর্ষণীয়া হয় সে তত বেশি বিশ্বস্ত হয়ে থাকে। এই কথা বলে সে পিয়েরের দিকে মুখ তুলে তাকাল।
ভেরা বলতে লাগল, হ্যাঁ, সেকথা ঠিক প্রিন্স। আমাদের একালে মেয়েরা এত স্বাধীনতা ভোগ করে যে পূর্বরাগের আনন্দ অনেক সময়ই তাদের অনুভূতিকে ভের্তা করে দেয়। আর একথা তো স্বীকার করতেই হবে যে নাতালি খুবই স্পর্শকাতর। নাতালির প্রসঙ্গ ওঠায় প্রিন্স আন্দ্রুর ভুরু দুটি অস্বস্তিতে জুড়ে গেল, সে উঠতেই যাচ্ছিল, কিন্তু ভেরা আবার কথা বলতে শুরু করল।
আমি তো মনে করি তার সঙ্গে যত মানুষ ভাব জমাতে আসে তেমন আর কারো বেলায় ঘটেনি, তবু ইদানীংকাল পর্যন্ত কারো দিকে তার মন সেভাবে ঢলেনি। তারপর পিয়েরকে বলল, কি জানেন কাউন্ট, নিজেদের মধ্যে বলেই বলছি, এই যে আমাদের আদরের ভাই বরিস এতদূর এগিয়ে গেছে…
প্রিন্স আন্দ্রু ভুরু কুঁচকে চুপ করে রইল।
তার সঙ্গে তো আপনার খুব বন্ধুত্ব, তাই না? ভেরা শুধাল।
হ্যাঁ, আমি তাকে চিনি… ।
আশা করি নাতাশার প্রতি ছেলেমানুষী ভালোবাসার কথা সে আপনাকে বলেছে?
অপ্রত্যাশিতভাবে লজ্জায় লাল হয়ে প্রিন্স আন্দ্রু হঠাৎ জিজ্ঞাসা করল, ওহো, ওটা তাহলে একটা ছেলেমানুষী ভালোবাসা?
হ্যাঁ, আপনি তো জানেন জ্ঞাতি বাই-বোনের ঘনিষ্ঠতা অনেকসময় ভালোবাসা হয়ে দেখা দেয়। জ্ঞাতি ভাই-বোনের কাছাকাছি থাকাটা বড়ই বিপজ্জনক।
প্রিন্স আন্দ্রু বলে উঠল, হ্যাঁ, নিঃসন্দেহে! তারপরেই হঠাৎ অস্বাভাবিক তৎপরতার সঙ্গে মস্কোর পঞ্চাশ বছর বয়সের জ্ঞাতি বোনদের সম্পর্কে সতর্ক হবার জন্য পিয়েরকে ঠাট্টা করতে শুরু করল এবং সেইসব ঠাট্টার কথা বলতে বলতেই পিয়েরের হাত ধরে তাকে একপাশে টেনে নিয়ে গেল।
বন্ধুর মুখ-চোখের উদ্দীপনাপূর্ণ ভাব দেখে এবং সে যে বারবার নাতাশার দিকে তাকাচ্ছে সেটা লক্ষ্য করে পিয়ের শুধাল, ব্যাপার কি?
তোমাকে…তোমাকে একটা কথা বলা দরকার, প্রিন্স আন্দ্রু বলল। আমি…কিন্তু না, পরে বলব। তার চোখে একটা বিচিত্র আলো ফুটে উঠল, চালচলনে কেমন যেন একটা অস্থিরতা। প্রিন্স আন্দ্রু নাতাশার কাছে গিয়ে তার পাশে বসল। পিয়ের দেখল, প্রিন্স আন্দ্রু নাতাশাকে কি যেন বলল, আর জবাব দিতে গিয়ে তার চোখমুখ লাল হয়ে উঠল।
ঠিক সেইমুহূর্তে বের্গ এসে পিয়েরকে বলল, স্পেনের ব্যাপার নিয়ে সেনাপতি ও কর্নেলের মধ্যে যে বিতর্ক শুরু হয়েছে তাতে তাকে অবশ্যই যোগ দিতে হবে।
বের্গ যেমন খুশি, তেমনই সুখী। তার মুখের উপর থেকে খুশির হাসিটুকু কখনই মিলিয়ে যাচ্ছে না। তার মজলিসটা অন্য সব মজলিসের মতোই খুব সফল হয়েছে। আর সবই যেমনটি হয়ে থাকে ঠিক তেমনটি হয়েছে। শুধু পুরুষদের মধ্যে জোর গলায় আলোচনা এবং একটা কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে বিতর্কেরই অভাব ছিল এতক্ষণ। এবার সেনাপতি সেই বিতর্কের সূত্রপাত করেছে, আর তাই বের্গ এসে পিয়েরকে সেখানে টেনে নিয়ে গেল।
.
অধ্যায়-২২
পরদিন কাউন্টের আমন্ত্রণে প্রিন্স আন্দ্রু রস্তভদের সঙ্গে আহার করল এবং সারাটা দিন সেখানেই কাটাল।
প্রিন্স আন্দ্রু কার জন্য এসেছে বাড়ির সকলেই সেটা বুঝতে পেরেছে, আর সেও সেটা না লুকিয়ে সারাদিন নাতাশার সঙ্গে সঙ্গেই থাকতে চেষ্টা করল। ভীত অথচ সুখী ও উচ্ছ্বসিত নাতাশার অন্তরেই শুধু নয়, সারা বাড়িটাতেই এমন একটা ভীতির অনুভূতি দেখা দিল যে একটা গুরুতর কিছু ঘটতে যাচ্ছে। প্রিন্স আন্দ্রু যখনই নাতাশার সঙ্গে কথা বলছে তখনই কাউন্টেস বিষণ্ণ, রূঢ় দৃষ্টিতে তার দিকে তাকাচ্ছে এবং তার চোখে চোখ পড়লেই যেকোন একটা তুচ্ছ বিষয় নিয়ে আলোচনা শুরু করছে। সোনিয়ায় ভয়-নাতাশা তাকে ছেড়ে যাবে। মুহূর্তের জন্য প্রিন্স আন্দ্রুর সঙ্গে একলা হলেই প্রত্যাশার আতংকে নাতাশার মুখ সাদা হয়ে যাচ্ছে। প্রিন্স আন্দ্রুর ভীরুতা তাকে বিস্মিত করছে। সে বুঝতে পারছে, প্রিন্স আন্দ্রু তাকে কিছু বলতে চাইছে, কিন্তু সাহসে কুলোচ্ছে না।
