বেৰ্গদের মতো লোকদের নিচু জগতের লোক মনে করে তাদের আমন্ত্রণকে প্রত্যাখ্যান করার মতো নিষ্ঠুরতা একমাত্র কাউন্টেস হেলেনের পক্ষেই সম্ভব। বের্গের সব কথা শুনে পিয়ের আপত্তি করতে পারল না, যাবে বলে কথা দিল।
কিন্তু দেরি করবেন না কাউন্ট, যদি অভয় দেন তো বলি : দয়া করে আটটা বাজবার দশ মিনিট আগেই আসুন। এক রাবার খেলা হতে পারবে। আমাদের সেনাপতিও আসছেন। তিনি আমার প্রতি খুব সদয়। রাতের খাবার ব্যবস্থাও থাকবে। কাজেই এটুকু অনুগ্রহ আমাকে করবেন।
কোথাও যেতে পিয়ের সাধারণতই দেরি করে থাকে, কিন্তু সেদিন সে বেৰ্গদের বাড়িতে পৌঁছল আটটার দশ মিনিট নয় পনেরো মিনিট আগে।
পার্টির সব উদ্যোগ-আয়োজন শেষ করে বের্গ-দম্পতি অতিথিদের আগমনের জন্যই অপেক্ষা করছিল। ছোট ঘোট আবক্ষ মূর্তি, ছবি ও আসবাবে সুসজ্জিত নতুন ও পরিচ্ছন্ন পড়ার ঘরে বের্গ ও তার স্ত্রী বসেছিল। বোম আটকানো নতুন ইউনিফর্ম পরে স্ত্রীর পাশে বসে বের্গ তাকে বোঝাচ্ছিল, মাথার উপরকার লোকদের সঙ্গে আলাপ-পরিচয় করাই উচিত, কারণ একমাত্র তাতেই আলাপ-পরিচয়ে মজাটা ভোগ করা যায়।
সেখানে তুমি কিছু জানতে পার, কিছু চাইতে পার। এই দেখ না, আমার প্রথম পদোন্নতিটা কীভাবে বাগিয়েছি (বেৰ্গ জীবনটাকে মাপে পদোন্নতি দিয়ে, বছর দিয়ে নয়)। আমরা সহকর্মীরা এখনো কিছুই হতে পারেনি,অথচ একটা রেজিমেন্টের কমান্ডার হবার জন্য আমি শুধু একটা সুযোগের অপেক্ষায় আছি, আর তোমার স্বামী হবার সুখলাভ করেছি। এসব কি করে পেলাম? প্রধানত কাদের সঙ্গে পরিচয় করব সেটা জানি বলেই। অবশ্য উপরে উঠতে হলে যে বিবেকবান ও শৃঙ্খলাপরায়ণ হতে তবে সেকথা তো বলাই বাহুল্য।
সে যে এই দুর্বল নারীটির অনেক উপরের মানুষ একথা ভেবে বের্গ একটু হাসল, ভাবল, তার এই দুর্বল স্ত্রীটি জানেই না মানুষের মর্যাদা কাকে বলে, কাকে বলে মানুষ হওয়া। ওদিকে বিবেকবান স্বামীর তুলনায় সে যে অনেক উপরের মানুষ একথা ভেবে ভেরাও হাসতে লাগল, ভাবল, সব পুরুষ মানুষের মতোই সেও জীবনটাকে ভুলই বুঝেছে। স্ত্রীকে দিয়ে বিচার করে বের্গ মনে করে যে সব নারীই দুর্বল ও নির্বোধ। স্বামীকে দিয়ে বিচার করে ভেরাও মনে করে যে যদিও পুরুষরা কিছুই বোঝে না, যদিও তারা দাম্ভিক ও স্বার্থপর, তবু ভাবে যে একমাত্র তারাই সাধারণ বুদ্ধির অধিকারী।
বের্গ উঠে সযত্নে স্ত্রীকে আলিঙ্গন করল, তার ঠোঁটে চুমো খেল।
অবচেতন মনের একটা চিন্তার জের টেনে বলল, একমাত্র কথা হল অচিরেই আমাদের সন্তানলাভ করা চাই।
ভেরা জবাব দিল, আমি সেটা মোটেই চাই না। আমাদের বাঁচতে হবে সমাজের জন্য।
স্ত্রীর ত্রিকোণ গলবন্ধটা দেখিয়ে খুশির হাসি হেসে বের্গ বলল, প্রিন্সেস ইউসুপোভাও ঠিক এইরকম একটা পরেছিল।
ঠিক তখন কাউন্ট বেজুখভের আগমন ঘোষণা করা হল। স্বামী-স্ত্রী পরস্পরের দিকে তাকাল, আত্মসন্তুষ্ট ভঙ্গিতে দুইজনই হাসল, প্রত্যেকেই মনে মনে এই আগমনের সম্মানটা দাবি করল।
তারা নতুন ছোট বসার গরে বেজুখভকে স্বাগত জানাল। অনতিবিলম্বেই এসে হাজির হল বের্গের পুরনো সহকর্মী বরিস। বের্গ ও ভেরার প্রতি তার আচরণে কিছুটা করুণা প্রকাশ পেল। বরিসের পরেই কর্নেলকে সঙ্গে নিয়ে একটি মহিলা এল, তারপর স্বয়ং সেনাপতি এবং তারও পরে এল রস্তভরা। আর সব মিলিয়ে এ মজলিসটা হয়ে উঠল অন্য যেকোন সান্ধ্যমজলিসেরই মতো। সেনাপতি বসল কাউন্ট ইলিয়া রশুভের পাশে। বুড়োরা বসল বুড়োদের দলে, যুবকরা যুবকদের দলে, আর গৃহকত্রী বসল চায়ের টেবিলে, সে টেবিলেও অন্য সব মজলিসের মতোই রুপোর ঝুড়িতে সেই একইরকম কেক। অন্য সর্বত্র যেমনটি হয়ে থাকে এখানেও সবকিছু ঠিক সেইরকম।
.
অধ্যায়-২১
অন্যতম প্রধান অতিথি হিসেবে কাউন্ট রস্তভ, সেনাপতি ও কর্নেলের সঙ্গে পিয়েরকেই বস্টনের (একধরনের তাসখেলা, অনেকটা ব্রিজ খেলার মতো) টেবিলে বসতে হল। তাসের টেবিলে ঘটনাক্রমে তাকে বসতে হল নাতাশার একেবারে মুখোমুখি। সেদিনের বল-নাচের পরে আজ তার পরিবর্তন লক্ষ্য করে পিয়ের অবাক হয়ে গেল। সে চুপচাপ বসে আছে, চেহারায়ও সে জৌলুস নেই, আর সবকিছুতেই কেমন যেন উদাসীন।
তার দিকে তাকিয়ে পিয়ের ভাবল, ওর হয়েছে কি? চায়ের টেবিলে সে দিদির পাশে বসেছে, পাশেই বসেছে বরিস, তার প্রশ্নের জবাবে তার দিকে না তাকিয়েই একান্ত অনিচ্ছার সঙ্গে নাতাশা কি যেন একটা জবাব দিল। খেলার মাঝখানে পিয়ের আর একবার নাতাশার দিকে তাকাল।
আরো অবাক হয়ে পিয়ের ভাবল, ওর হয়েছে কি?
প্রিন্স আন্দ্রুর তার সামনে দাঁড়িয়ে কি যেন বলছে। নাতাশাও মুখ তুলে তার দিকে তাকাল, তার চোখ মুখ লাল হয়ে উঠল, শ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুততর হল। ভিতরের একটা চাপা আগুন যেন নতুন করে জ্বলে উঠল। নাতাশা সম্পূর্ণ বদলে গেল, একটা সাধারণ মেয়ের পরিবর্তে আবার সেই নাচের আসরের মেয়েটি হয়ে উঠল।
প্রিন্স আন্দ্রু পিয়েরের কাছে এগিয়ে গেল, পিয়ের দেখল বন্ধুর মুখে নতুন যৌবনের দীপ্তি উঠেছে।
খেলতে খেলতে পিয়ের বার বার আসন বদল করল, একবার বসল নাতাশার দিকে পিঠ দিয়ে, তারপর তার মুখোমুখি, কিন্তু পুরো ছটা রাবার খেলার সময় সে নাতাশা ও বন্ধুর উপর নজর রাখল।
