প্রিয় কাউন্টেস, কী যুগ পড়েছে…বেচারি মেয়েটা একেবারে কাহিল হয়ে পড়েছে…রাজুমভস্কিদের বল নাচে…আর কাউন্টেস এপ্রাক্সিনা…আমি তো খুব খুশি…, পোশাকের খসখস আর চেয়ার টানার ঘসঘস শব্দের সঙ্গে গলা মিশিয়ে এবং পরস্পরের গলার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নানা নারীকণ্ঠের উচ্ছ্বসিত শব্দ ভেসে আসতে লাগল। তারপর শুরু হয় সেইসব আলোচনা যা ততক্ষণ পর্যন্ত চলতে থাকে যতক্ষণ না অতিথিরা। পোশাক খসখসিয়ে উঠে বলতে থাকে, আমি খুব খুশি হয়েছি…মামণির স্বাস্থ্য…আর কাউন্টেস এপ্রাক্সিনা…; তারপর আবার সেই খসখসানি, সামনের ঘরে গমন, জোব্বা অথবা আলখাল্লা পরিধান এবং প্রস্থান। আলোচনার বিষয়বস্তু সেদিনকার প্রধান ঘটনা : ক্যাথারিনের ধনবান ও খ্যাতিমান প্রেমিক কাউন্ট বেজুকভের অসুস্থতা এবং তার অবৈধ সন্তান পিয়ের যে নাকি আন্না পাভলভনার ভোজের আসরে অত্যন্ত খারাপ ব্যবহার করেছে।
অতিথি বলল, বেচারি কাউন্টের জন্য আমার দুঃখ হয়। একে তার স্বাস্থ্য খারাপ, তার উপর ছেলেকে নিয়ে এই বিরক্তিই তাকে মেরে ফেলবে!
কাউন্টেস যদিও এর আগেই পনেরো বারের মতো কাউন্ট বেজুকভের দুঃখের কথা শুনেছে তবু সে যেন কিছুই জানে না এমনি বাব দেখিয়ে বলে উঠল, সে আবার কি?
অতিথি সোচ্চারে বলল, আধুনিক শিক্ষার এই তো ফল। মনে হয়, কাউন্ট যখন বিদেশে ছিলেন তখন এই ছেলেটি যেমন খুশি চলাফেরা করত, এখন তো পিটার্সবুর্গে শুনলাম সে এমন সব ভয়ংকর কাণ্ডকারখানা করে চলেছে যে পুলিশ তাকে তাড়িয়ে দিয়েছে।
এমন কথা বলবেন না! কাউন্টেস বলল।
আন্না মিখায়লভনা গলা মেলাল, যত সব কুসঙ্গী জুটিয়েছে। প্রিন্স ভাসিলির ছেলে, সে আর কে এক দলোখভ মিলে কী যে কাণ্ডকারখানা করে বেড়াচ্ছে তা একমাত্র ঈশ্বরই জানেন। আর সেজন্য তাদের কষ্টও ভোগ করতে হয়েছে। দলোখভের পদাবনতি ঘটেছে, আর বেজুকভের ছেলেকে মস্কোতে ফেরৎ পাঠিয়ে দিয়েছে। আনাতোল কুরাগিনের বাবা কোনোরকমে ছেলের ব্যাপার-স্যাপার চাপা দিলেও তাকেও পিটার্সবুর্গ ছেড়ে যাবার হুকুম দেওয়া হয়েছে।
কিন্তু তারা করেছেটা কি? কাউন্টেস শুধাল।
অতিথি জবাব দিল, তারা তো সব রীতিমতো গুণ্ডা, বিশেষ করে দলোখভ। সে তো মারিয়া আইভানভনা দলোখভার ছেলে। মহিলা ভালোমানুষ, আর তার কপালে এই। তাই ভাবুন। ঐ তিনজন মিলে কোথা থেকে একটা ভালুক যোগাড় করেছে, আর সেটাকে গাড়িতে তুলে নিয়ে গেছে এক অভিনেত্রীর সঙ্গে দেখা করতে! পুলিশ বাধা দিতে চেষ্টা করেছিল, কিন্তু তিন ছোকরা কি করল? পুলিশ ও ভালুকটাকে পিঠে-পিঠ দিয়ে বেঁধে ফেলে দিল ময়লা খালের জলে। আর ভালুকটা সেই পুলিশকে পিঠে নিয়ে সাঁতরাতে লাগল!
হাসতে হাসতে খুন হয়ে কাউন্ট বলে উঠল, আহা, পুলিশটার অবস্থা না জানি কী মধুরই হয়েছিল!
ওঃ, কী ভয়ংকর! একথা শুনে আপনি হাসতে পারছেন কাউন্ট?
অথচ মহিলারা নিজেরাও হাসি সংবরণ করতে পারল না।
অতিথি বলতে লাগল, শেষপর্যন্ত অবশ্য তারা সে বেচারিকে উদ্ধার করেছিল। আর ভেবে দেখুন, সিরিল ব্লাদিমিরভিচ বেজুকভের ছেলে হয়ে সে এমনভাবে মজা করতে পারে! অথচ সকলে বলে সে সুশিক্ষিত ও চতুর। বিদেশী শিক্ষা তো তাকে এই তৈরি করেছে! আশা করি, যতই টাকাপয়সা থাকুক মস্কোতে কেউ তাকে অভ্যর্থনা জানাবে না। আমার সঙ্গে তার পরিচয় করাতে তারা চেয়েছিল, কিন্তু আমি সোজা ফিরিয়ে দিয়েছি; নিজের মেয়ের কথা তো আমাকে ভাবতে হবে।
এ কথার সঙ্গে সঙ্গে মেয়েরা অমনোযোগের ভান করল। তাদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে কাউন্টেস বলল, এই যুবককে আপনি এত ধনী বলছেন কেন? তার ছেলেরা তো সকলেই অবৈধ। আমার তো মনে হয় পিয়েরও অবৈধ সন্তান।
অতিথি হাত নেড়ে একটা ভঙ্গি করে দেখাল।
আমার তো ধারণা এ রকম সন্তান তার এককুড়ি আছে।
প্রিন্সেস মিখায়লভনা এবার আলোচনায় যোগ দিল; সে যে উঁচু মহেলের মানুষ, আর সমাজে কি চলছে তা যে তার ভালোই জানা আছে সেটাই সে বোঝাতে চায়।
অর্থপূর্ণভাবে ফিসফিস করে সে বলল, আসল ব্যাপার হল কাউন্ট সিরিলের সুখ্যাতি সকলেরই জানা।…ছেলেমেয়েদের অনেককে তিনি হারিয়েছেন, কিন্তু এই পিয়ের তার খুব প্রিয় ছিল।
কাউন্টেস বলল, মাত্র এক বছর আগেও এই বুড়ো মানুষটি কী সুন্দরই না ছিলেন! তার চাইতে সুন্দর পুরুষ মানুষ আমি আর দেখি নি।
আন্না মিখায়লভনা বলল, এখন তিনি অনেক বদলে গেছেন। হ্যাঁ, যে কথা বলছিলাম, তাঁর স্ত্রীর দিক থেকে প্রিন্স ভাসিলিই তার উত্তরাধিকারী; কিন্তু কাউন্ট পিয়েরকে খুব ভালোবাসেন, তার লেখাপড়ার উপর নজর রাখেন, এমন কি সম্রাটকেও তার কথা লিখেছেন; যাতে তাঁর মৃত্যু হলে তিনি যে রকম অসুস্থ তাতে যে কোনো সময় তাঁর মৃত্যু হতে পারে; ডা. লোরাইনও পিটার্সবুর্গ থেকে এসে হাজির হয়েছে তার প্রভূত সম্পত্তির অধিকারী কে হবে, পিয়ের না প্রিন্স ভাসিলি, তা কেউ জানে না। চল্লিশ হাজার ভূমিদাস আর লক্ষ লক্ষ রুবল! সবকিছু আমি ভালোই জানি, কারণ প্রিন্স ভাসিলি নিজে আমাকে বলেছেন। তাছাড়া, সিরিল ম্লাদিমিরভিচ আমার মায়ের সম্পর্কে ভাই হন। তিনি আমার বরি-র ধর্মবাপও বটে।
প্রিন্স ভাসিলি গতকাল এখানে এসেছে। শুনেছি, কোনো তদন্তের কাজে সে এসেছে অতিথিটি বলল।
