বাড়ি পৌঁছে প্রিন্স আন্দ্রু গত চার মাসের পিটার্সবুর্গের জীবনের কথা ভাবতে বসল, যেন এটা তার কাছে একটা নতুন অভিজ্ঞতা। নিজের নানাবিধ সংস্কার প্রচেষ্টা ও গণ্যমান্য লোকদের সঙ্গে দেখাসাক্ষাতের কথা মনে পড়ল। তারপর স্পষ্টরূপে মনে করতে চেষ্টা করল বোচারোভোর কথা, গ্রামে গিয়ে তার কাজকর্মের কথা, রিয়াজান যাত্রার কথা, সেখানকার চাষী ও গ্রাম-প্রধান দ্রোনের কথা। আর সঙ্গে সঙ্গে এখানে এইসব অদরকারী কাজে এত সময় কাটিয়েছে ভেসে সে অবাক হয়ে গেল।
.
অধ্যায়-১৯
পরদিন প্রিন্স আন্দ্রু এমন কয়েকটা বাড়িতে দেখা করতে গেল যেখানে আগে যাওয়া হয়নি। রস্তভদের বাড়িতেও গেল, বল-নাচের আসরে তাদের সঙ্গে নতুন করে পরিচয় হয়েছে। ভদ্রতার খাতিরেও একবার যাওয়া দরকার, তাছাড়াও যে কচি মেয়েটি তার মনে একটা মধুর প্রভাব ছড়িয়েছে, তার নিজের বাড়িতে তার সঙ্গে দেখা করার একটা ইচ্ছাও তার হল।
নাতাশার সঙ্গেই প্রথম দেখা হল। তার পরনে ছিল গাঢ় নীল রঙের ঘরোয়া পোশাক, তাতে এখন তাকে বল-নাচের পোশাক থেকেও ভালো লাগছে। সে ও রস্ত পরিবারের অন্য সকলেই তাকে সাদর অভ্যর্থনা জানাল। যে পরিবারটিকে আগে সে কঠোরভাবে সমালোচনা করেছিল এখন তাদের সকলকেই চমৎকার, সরল, সদয় মানুষ বলে মনে হল। বুড়ো কাউন্টের আতিথেয়তা ও সুন্দর স্বভাব প্রিন্স আন্দ্রুর এতই ভালো লাগল যে ডিনারে যোগদানের প্রস্তাবকে সে প্রত্যাখ্যান করতে পারল না। মনে মনে বলল, এরা চমৎকার লোক, কিন্তু নাতাশা যে কী রত্ন সে বিষয়ে ধারণাই এদের নেই। জীবন-রসে টইটম্বুর এই কাব্যময়ী মনোরমা মেয়েটির উপযুক্ত পরিবেশই তারা রচনা করে আছে!
ডিনারের পরে প্রিন্স আন্দ্রুর অনুরোধে নাতাশা ক্ল্যাভিকর্ডে গিয়ে গান গাইতে শুরু করল। জানালার পাশে দাঁড়িয়ে মহিলাদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে প্রিন্স আন্দ্রু গান শুনতে লাগল। একটা কথার মাঝখানে সে হঠাৎ থেমে গেল, হঠাৎ তার মনে হয় কান্নায় গলা আটকে আসছে, অথচ সে জানত যে তার পক্ষে এটা অসম্ভব। সে তাকিয়ে নাতাশাকে গান গাইতে দেখছে, আর একটা নতুন, আনন্দময় কি যেন তার বুকের মধ্যে উত্তাল হয়ে উঠছে। যুগপৎ হর্ষ ও বিষাদ তাকে আচ্ছন্ন করে দিল। কাঁদবার কোনো কারণই ছিল না, অথচ কাঁদতেই সে চায়। কিসের জন্য? প্রাক্তন প্রিয়ার জন? ছোট প্রিন্সেসের জন্য নিজের স্বপ্নভঙ্গের জন্য?…ভবিষ্যতের জন্য?…হা এবং না। এ অবস্থার প্রধান কারণ নিজের অন্তরের অসীম ও অন্তহীন মহত্ত্বের সঙ্গে তার, এমন কি নাতাশারও সীমিত ও বাস্তব সত্তার মধ্যে এক প্রচণ্ড বিরোধ। এই বিরোধই তার মনের উপর চেপে বসেছে, আবার গান শুনতে শুনতে তাকে উৎফুল্ল করে তুলেছে।
গান শেষ করে নাতাশা তার কাছে গিয়ে শুধাল, গলাটা তার কেমন লাগল। প্রশ্নটা করেই কেমন যেন বিব্রত বোধ করল, মনে হল প্রশ্নটা করা উচিত হয়নি। প্রিন্স আন্দ্রু তার দিকে তাকিয়ে হাসল, বলল, গান খুব ভালো লেগেছে, তার সবকিছুই তার ভালো লাগছে।
রস্তভদের বাড়ি থেকে বেশ দেরি করেই প্রিন্স আন্দ্রু বাড়ি ফিরল। অভ্যাসবশতই শুতে গেল, কিন্তু অচিরেই বুঝতে পারল যে ঘুম আসবে না। মোমবাতি জ্বালিয়ে বিছানায় উঠে বসল, তারপর উঠল, আবার শুয়ে পড়ল : ঘুম আসছে না বলে মনে কোনো কষ্টই নেই : তার মনটা এতই তাজা ও আনন্দে ভরপুর যেন একটা দমবন্ধ করা ঘর থেকে ঈশ্বরের খোলা হাওয়ায় সে পা ফেলেছে। সে যে নাতাশার প্রেমে পড়েছে সেকথা তার মাথায়ই ঢোকেনি, নাতাশার কথাই সে ভাবছে না, নিজের মনে শুধু তার ছবি আঁকছে, আর তাতেই তার সারা জীবন নতুন আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠছে। নিজের মনেই বলল, একটা জীবন, একটা গোটা জীবন যখন এত আনন্দ নিয়ে আমার সামনে অবারিত রয়েছে, তখন এই সংকীর্ণ, বদ্ধ দেহের খাঁচার মধ্যে কেন আমি পরিশ্রম করছি, সংগ্রাম করছি আর দীর্ঘকালের মধ্যে এই প্রথম সে ভবিষ্যতের মধুর পরিকল্পনা রচনায় মেতে উঠল। স্থির করল, একজন শিক্ষক জোগাড় করে ছেলের লেখাপড়ার ব্যবস্থা করবে, তারপর চাকরি থেকে অবসর নিয়ে বিদেশে যাত্রা করবে, দেখবে ইংল্যান্ড, সুইজারল্যান্ড ও ইতালি। মনে মনে বলল, এত শক্তি ও যৌবন যখন আমার মধ্যে রয়েছে তখন আমি স্বাধীনভাবেই চলব। পিয়ের যথার্থই বলে যে সুখী হতে হলে সুখের সম্ভাবনায় বিশ্বাস রাখতেই হবে, এখন তার সেকথা আমি বিশ্বাস করি। যা কিছু মৃত তা কবরে যাক, যার জীবন এখনো আছে সে বাঁচুক, সুখী হোক!
.
অধ্যায়-২০
পিয়েরের পরিচিত কর্নেল অ্যাডলফ বের্গ একদিন সকালে তার সঙ্গে দেখা করতে এল। তার পরনে আনকোরা নতুন ইউনিফর্ম, পমেড মাখানো চুল সম্রাট আলেক্সান্দারের কেতায় পিছন দিকে বুরুশ করা।
একটু হেসে বলল, এইমাত্র আপনার স্ত্রী কাউন্টেসের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম। দুঃখের বিষয় তিনি আমার অনুরোধ রাখলেন না, কিন্তু আমি আশা করি আপনার বেলায় আমার ভাগ্য প্রসন্নই হবে।
আপনি কি চান কর্নেল? আপনার সেবায় আমি প্রস্তুত।
দেখুন কাউন্ট, সবেমাত্র আমার নতুন বাসায় স্থিতি হয়ে বসেছি, তাই আমার ইচ্ছা আমার নিজের ও আমার স্ত্রীর বন্ধুদের নিয়ে একটা ছোট পার্টির আয়োজন করি। কাউন্টেসকে অনুরোধ করেছিলাম, তিনি যেন চায়ে ও নৈশভোজে যোগ দিয়ে আমাদের সম্মানিত করেন।
