আগন্তুক বিৎস্কি, লোকটি নানা কমিটিতে কাজ করে, পিটার্সবুর্গের সবরকম মহলে চলাফেরা করে, নতুন ধ্যান-ধারণা ও স্পেরানস্কির একজন অনুরাগী ভক্ত, এবং পিটার্সবুর্গের পরিশ্রমী সংবাদসগ্রাহকদের একজন। কোনোরকমে টুপিটা রেখেই সে ছুটে গেল প্রিন্স আন্দ্রুর ঘরে, সঙ্গে সঙ্গে বকবক করতে শুরু করল। রাষ্ট্রীয় পরিষদের প্রাতঃকালীন অধিবেশন ও সম্রাট কর্তৃক উদ্বোধনের কথা সে এইমাত্র শুনে এসেছে, সেই কথাই সে সবিস্তারে বলতে লাগল। সম্রাট একটি অসাধারণ ভাষণ দিয়েছে। এ রকম ভাষণ একমাত্র নিয়মতান্ত্রিক সম্রাটরাই দিতে পারে।
হ্যাঁ, হ্যাঁ, আজকের ঘটনা একটি যুগান্তের সূচনা করেছে, এটি আমাদের ইতিহাসের সবচাইতে যুগান্তকারী ঘটনা, এই বলে সে শেষ করল।
প্রিন্স আন্দ্রু মন দিয়ে সব কথা শুনল। একটা খুব সহজ চিন্তা তার মনে এল : রাষ্ট্ৰীয় পরিষদে সম্রাট দয়া করে কি বললেন তাতে আমার বা বিৎস্কির কি যায়-আসে? এতে কি আমার সুখ বাড়বে, না ভালো কিছু হবে?
এই সহজ চিন্তাটি সহসা আসন্ন সংস্কার-প্রচেষ্টাগুলি সম্পর্কে প্রিন্স আন্দ্রুর সব আগ্রহকে নষ্ট করে দিল। সেদিন সন্ধ্যায় অল্প কয়েকজন বন্ধুসহ তার স্পেরানস্কির বাড়িতে খাবার কথা আছে। যে মানুষটিকে সে এত শ্রদ্ধা করে তার গৃহ-পরিবেশে এই ভোজনের ব্যবস্থার প্রতি প্রিন্স আন্দ্রুর অপরিসীম আগ্রহ ছিল, বিশেষত আজ পর্যন্ত সে স্পেরানস্কিকে তার পারিবারিক পরিবেশে কখনো দেখেনি, কিন্তু এখন তার মনে সেখানে যাবার ব্যাপারে একটা অনিচ্ছা দেখা দিল।
যাই হোক, নির্দিষ্ট সময়ে সে স্পেরানস্কির তারিদা গার্ডেন্সের সাধারণ বাড়িটাতে হাজির হল। বাড়িটা ছোট হলেও খুব পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন (একটা মঠের কথা মনে করিয়ে দেয়)। প্রিন্স আন্দ্রুর একটু দেরি হয়ে গেছে, সে যখন ঢুকল ততক্ষণে পাঁচটা নাগাদ পরিচিত বন্ধুজনরা এসে গেছে। স্পেরানস্কির ছোট মেয়ে ও তার শিক্ষয়িত্রী ছাড়া অন্য কোনো মহিলা সেখানে ছিল না। বাইরের ঘরে থাকতেই উঁচু গলার কথাবার্তা এবং একটা উচ্চগ্রামের হাসি-যে ধরনের হাসি রঙ্গমঞ্চেই শোনা যায়–প্রিন্স আন্দ্রুর কানে এল। কে যেন-গলাটা স্পেরানস্কির বলেই মনে হল-হো-হো করে হাসছে। স্পেরানস্কির বিখ্যাত হাসি প্রিন্স আন্দ্রু আগে কখনো শোনেনি, একজন কূটনীতিকের গলার এমন কলকণ্ঠ, জোরালো হাসি তার মনে একটা অদ্ভুত ভাবের সৃষ্টি করল।
সে খাবার ঘরে ঢুকল। দুটো জানালার মাঝখানে ছোট টেবিলেটাকে ঘিরে সকলেই দাঁড়িয়ে আছে। হাসতে হাসতেই স্পেরানস্কি তার নরম সাদা হাতটা প্রিন্স আন্দ্রুর দিকে বাড়িয়ে দিল।
বলল, আপনাকে দেখে খুশি হলাম প্রিন্স। এক মিনিট… অন্যদের দিকে আমোদ-প্রমোদের জন্য, কাজকর্মের একটা কথাও এখানে বলা হবে না। এই বলে সে আবার হাসতে লাগল।
প্রিন্স আন্দ্রু বিস্ময়, বিষাদ ও মোহভঙ্গের সঙ্গে হাস্যমুখর স্পেরানস্কিকে দেখতে লাগল। তার মনে হল এ যেন স্পেরানস্কি নয়, অন্য কেউ। এর আগে স্পেরানস্কির যা কিছু তার কাছে মনে হতো রহস্যময় ও আকর্ষনীয়, হঠাৎ সে সবকিছুই অতি সাধারণ হয়ে উঠল, তার কোনো আকর্ষণই রইল না।
খাবার সময় মুহূর্তের জন্যও কথার বিরাম ঘটল না, মনে হল কোনো হাসি-তামাশার বইয়ের পাতা থেকে বুঝি সকলেই কথা বলছে। প্রিন্স আন্দ্রুও বারকয়েক আলোচনায় যোগ দিতে চেষ্টা করল, কিন্তু তার কথাগুলিকে প্রতিবারই একপাশে ঠেলে সরিয়ে দেওয়া হল। তাদের মতো করে তামাশা করতে সে জানে না।
ডিনারের পরে স্পেরানস্কির মেয়ে ও তার শিক্ষয়িত্ৰী উঠে পড়ল। সাদা হাতে মেয়ের পিঠ চাপড়ে দিয়ে সে তাকে চুমো খেল। ভঙ্গিটাও প্রিন্স আন্দ্রুর কাছে অস্বাভাবিক ঠেকল।
অন্য সকলে টেবিলেই বসে থাকল সামনে পোর্টের বোতল নিয়ে–এটাই ইংরেজি কেতা। নেপোলিয়নের স্পেনসংক্রান্ত ব্যাপারের আলোচনায় সকলেই তাকে সমর্থন করলেও প্রিন্স আন্দ্রু ভিন্ন মত প্রকাশ করল। স্পেরানস্কি একটু হাসল, আর আলোচনাটা যাতে অপ্রীতিকর হয়ে না উঠতে পারে সেজন্য এমন একটা গল্প বলতে শুরু করল যার সঙ্গে পূর্বের আলোচনার কোনো সম্পর্কই ছিল না। কয়েক মিনিট সকলেই চুপচাপ রইল।
আরো কিছুক্ষণ টেবিলে বসে থেকে কথা বলতে বলতে বসবার ঘরে গেল। জনৈক পত্রবাহক দুটো চিঠি দিল স্পেরানস্কির হাতে। চিঠি নিয়ে সে পড়ার ঘরে চলে গেল। অতিথিরা নিজেদের মধ্যে কথা বলতে লাগল।
ফিরে এসে স্পেরানস্কি বলল, এবার আবৃত্তি হোক! সঙ্গে সঙ্গে ম্যাগনিৎস্কি নামক অতিথিটি পিটার্সবুর্গের নানা খ্যাতনামা লোকদের নিয়ে ফরাসিতে তার নিজের লেখা হাসির কবিতাগুলো পর পর আবৃত্তি করতে লাগল। প্রশংসা-ধ্বনিতে বার বার তার আবৃত্তিতে বাধা পড়ল। আবৃত্তি শেষ হলে প্রিন্স আন্দ্রু স্পেরানস্কির কাছে গিয়ে চলে যাবার অনুমতি চাইল।
আপনি এত তাড়াতাড়ি চলে যাচ্ছেন কেন? স্পেরানস্কি শুধাল।
একটা অভ্যর্থনা-সভায় যাব বলে কথা দিয়েছি।
কেউ কিছু বলল না। সেই আয়নার মতো স্বচ্ছ অথবা দুর্ভেদ্য চোখ দুটির দিকে তাকিয়ে প্রিন্স আন্দ্রুর মনে হল স্পেরানস্কির কাছ থেকে বড় কিছুর প্রত্যাশা করাই তার ভুল হয়েছিল। বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাবার পরে অনেকক্ষণ পর্যন্ত সেই নিরানন্দ উচ্চহাসি তার কানে বাজতে লাগল।
