.
অধ্যায়-১৭
প্রিন্স আন্দ্রুর পরে বরিস এসে নাতাশাকে তার সঙ্গে নাচতে বলল, তারপর এল সেই এড-ডি-কং যে আসরের উদ্বোধন করেছিল, আর তারপরে আরো কয়েকটি যুবক, ফলে বাড়তি জুটিদের সোনিয়াকে দিয়ে রক্তিম মুখে, খুশিভরা মনে নাতাশা সারাটা সন্ধ্যা একটানা নেচে গেল। অন্য কে কি করল না করল সে-দিকে সে চোখ কান কিছুই দিল না। আহারের আগে একটা মজার সমবেত নাচে প্রিন্স আন্দ্রু আবার তার জুটি হল। সেইসময় প্রিন্স আন্দ্রু নাতাশাকে স্মরণ করিয়ে দিল, অত্রানুর পথে তাদের প্রথম দেখা হয়েছিল, সেই জ্যোৎস্না রাতে নাতাশা একটুও ঘুমতে পারেনি, অনিচ্ছা সত্ত্বেও তার সব কথা সে লুকিয়ে শুনে ফেলেছিল। সেসব কথা মনে পড়ায় নাতাশার মুখ লাল হয়ে উঠল, যেন এর মধ্যে লজ্জা পাবার মতো কিছু আছে।
যেসব পুরুষ মানুষ সমাজের উঁচু মহলের মধ্যে বড় হয়ে ওঠে তাদের সকলের মতোই প্রিন্স আন্দ্রুও এমন কাউকেই পছন্দ করে যার উপর তথাকথিত সমাজের ছাপ পড়েনি। ঠিক তেমনি মেয়ে নাতাশা, তার বিস্ময়, তার খুশি, তার লজ্জা, এমন কি তার ভুল করে ফরাসি বলাটাও আর পছন্দ। বিশেষ যত্ন ও আদরের সঙ্গে সে নাতাশার সঙ্গে ব্যবহার করল, তার পাশে বসে খুব সরল ও সাধারণ বিষয় নিয়ে আলোচনা করল, তা চোখের দৃষ্টি ও মুখের হাসির সানন্দ উজ্জ্বলতার প্রশংসা করল। অপর একজন নাচিয়ে যখন তাকে বেছে নিয়ে ঘরময় নাচতে লাগল তখনো প্রিন্স আন্দ্রু তার সলজ্জ মাধুর্যের প্রশংসা করতে লাগল। মজলিসের মাঝামাঝি সময়ে নাতাশা যখন হাঁপিয়ে উঠে তার আসনে ফিরে যাচ্ছিল তখন আর একটি নাচিয়ে এসে তাকে নাচতে ডাকল। নাতাশা তখন ক্লান্ত, হাঁপাচ্ছে, একবার ভাবল লোকটিকে ফিরিয়ে দেবে, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই প্রিন্স আন্দ্রুর দিকে তাকিয়ে ঈষৎ হেসে লোকটির কাঁধে হাত রাখল।
আপনার পাশে বসে একটু বিশ্রাম নিতে পারলে খুশি হতাম : আমি ক্লান্ত, কিন্তু দেখছেন তো সকলেই আমাকে নাচতে ডাকছে, আর সেটা আমার ভালোই লাগছে। আমি খুশি, সকলকেই ভালোবাসি, আপনি আর আমিই তো একথা জানি। মুখের কথার চাইতে তার হাসিটা অনেক বেশি কথা বলল। সঙ্গীটি চলে গেলে সে দুটি মহিলাকে বেছে নিতে ছুটে গেল।
সে যদি প্রথমে তার জ্ঞাতি দিদির কাছে যায় এবং তারপরে যায় অন্য মহিলাটির কাছে তাহলে সে আমার স্ত্রী হবে, মনে মনে কথাটা বলেই প্রিন্স আন্দ্রু অবাক হয়ে গেল। নাতাশা কিন্তু প্রথমে দিদির কাছে গেল না।
এক এক সময় কী যে আজেবাজে কথা মাথার মধ্যে ঢোকে! প্রিন্স আন্দ্রু ভাবল, কিন্তু একটা কথা ঠিক যে মেয়েটি এতই মনোরমা, এতই কচি যে একমাস নাচবার আগেই তার বিয়ে হয়ে যাবে…ওর মতো মেয়ে এখানে বিরল। বডিসের উপর থেকে খসেপড়া গোলাপটাকে ঠিক জায়গায় আটকাতে আটকাতে নাতাশা তার পাশেই এসে বসল।
মজলিস শেষ হয়ে গেলে বুড়ো কাউন্ট তার নীল কোট পরে নাচিয়েদের কাছে এল। প্রিন্স আন্দ্রুকে তাদের বাড়িতে আমন্ত্রণ জানাল, আর মেয়েকে জিজ্ঞাসা করল তার বেশ ভালো লেগেছে কি না। নাতাশা সঙ্গে সঙ্গে কোনো জবাব দিল না, শুধু মুখ তুলে হাসল, সে হাসি যেন তিরস্কার করে বলল : এরকম প্রশ্ন তুমি করলে কেমন করে?
মুখে বলল, এত ভালো আগে আর কখনো লাগেনি! প্রিন্স আন্দ্রু দেখল, তার সরু হাত দুটি বাবাকে আলিঙ্গন করতে উঠেই আবার তৎক্ষণাৎ নেমে গেল। আজ নাতাশা যত সুখী হয়েছে এমনটা জীবনে আর কখনো হয়নি। সেই সুখের স্বর্গে সে উঠে গেছে যেখানে গেলে মানুষ সম্পূর্ণরূপে সদয় ও সৎ হয়ে ওঠে, পাপ, সুখের অভাব অথবা দুঃখের সম্ভাবনাকে পর্যন্ত বিশ্বাস করে না।
.
দরবার মহলে তার স্ত্রীর যে স্থান তা দেখে এই বল-নাচেই পিয়ের সর্বপ্রথম খুব অপমানিত বোধ করল। সে যেন কেমন বিষণ্ণ ও উদাসীন হয়ে পড়ল। তার কপাল জুড়ে একটা গভীর খাঁজ দেখা দিল, জানালার পাশে দাঁড়িয়ে সে চশমার ফাঁক দিয়ে দূরে তাকিয়ে রইল, কিন্তু কারো দিকে নজর দিল না।
খেতে যাবার পথে নাতাশা তার পাশ দিয়ে যাবার সময় পিয়েরের বিষণ্ণ, দুঃখী দৃষ্টি দেখে থমকে দাঁড়াল। পিয়েরকে সাহায্য করবার, নিজের সুখের প্রাচুর্য দিয়ে তাকে ঢেকে রাখবার বাসনা জাগল মনে।
বলল, কী সুখের ব্যাপার! তাই না কাউন্ট?
তার কথার অর্থ না বুঝেই পিয়ের অন্যমনস্কভাবে হাসল।
হ্যাঁ, আমি খুব খুশি, সে বলল।
নাতাশা ভাবল, কোনোকিছু নিয়ে মানুষ অখুশি হয় কেমন করে? বিশেষ করে বেজুখভের মতো এমন একজন বড়দরের মানুষ! নাতাশার চোখে নাচের আসরের সব মানুষই সমান ভালো, দয়ালু ও সহৃদয়, সকলেই পরস্পরকে ভালোবাসে, কেউ কারো ক্ষতি করতেই পারে না–আর তাই সকলেরই সুখী হওয়া উচিত।
.
অধ্যায়-১৮
পরদিন প্রিন্স আন্দ্রু বল-নাচের কথা চিন্তা করতে লাগল, কিন্তু সে চিন্তা বেশিক্ষণ তার মনে থাকল না। যা, নাচের আসরটা চমৎকার হয়েছিল, আর তার পরেই…যা, ছোট্ট রস্তভা খুবই মনোরমা। তার মধ্যে এমন কিছু তাজা, কচি ও পিটার্সবুর্গ-অসুলভ ভাব আছে যেটা একান্তভাবে তারই বৈশিষ্ট্য। গতকালের নাচের ব্যাপারে তার ভাবনা-চিন্তা ওই পর্যন্তই, তার পরেই সকালের চা খেয়ে সে কাজে মন দিল।
কিন্তু ক্লান্তির জন্যই হোক আর অন্দ্রিার জন্যই হোক, কাজে মন বসল না, ফলে কোনো কাজই হল না। সে বসে বসে নিজের কাজের সমালোচনা শুরু করল, আর ঠিক তখনই কারো আসার শব্দ শুনে খুশি হয়ে উঠল।
