পলোনেসের যে সুর অনেকক্ষণ ধরে বাজছে এবার যেন সেটা নাতাশার কানে দুঃখের স্মৃতি হয়ে বাজতে শুরু করেছে। তার কান্না পেল। পেরোনস্কায়া তাদের রেখে অন্যত্র গেছে। কাউন্ট গেছে ঘরের অপর কোণে। সে, কাউন্টেস ও সোনিয়া যেন একলা দাঁড়িয়ে আছে একটা গভীর জঙ্গলের মধ্যে, চারদিকে অপরিচিত মানুষের ভিড়, তাদের প্রতি কারো কোনো আগ্রহ নেই, কেউ তাদের চাইছে না। একটি মহিলাকে নিয়ে প্রিন্স আন্দ্রু পাশ দিয়ে চলে গেল, তাদের চিনতেই পারল না। সুদর্শন আনাতোল সঙ্গিনীকে বাহুবন্ধনে ধরে তার সঙ্গে কথা বলছে, আর এমনভাবে নাতাশার দিকে তাকাচ্ছে যেন সে একটা দেয়ালমাত্র। বরিস দুইবার তাদের পাশ দিয়ে গেল, প্রতিবারই মুখটা ঘুরিয়ে নিল। বের্গ ও তার স্ত্রী তাদের দিকে এগিলে এল।
এই পারিবারিক জমায়েতটা নাতাশার কাছে অসম্মানকর মনে হতে লাগল-যেন কথা বলবার জন্য তাদের এখানে আসা ছাড়া গত্যন্তর ছিল না। ভেরা নিজের সবুজ পোশাকটা সম্পর্কে কি যেন বলছিল, নাতাশা তাতে কানই দিল না।
অবশেষে সম্রাট তার শেষ জুটির পাশে থেমে গেল (তিনজনের সঙ্গে তার নাচ হয়ে গেছে), সঙ্গে সঙ্গে বাজনাও থেমে গেল। একজন বিব্রত এড-ডি-কং রস্তভদের কাছে ছুটে এসে তাদের আরো পিছনে সরে যেতে বলল, অথচ তারা তখন প্রায় দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে। গ্যালারি থেকে ভালসের মধুর সুর ভেসে এল। সম্রাট হাসিমুখে নাচঘরের দিকে তাকাল। এক মিনিট পার হয়ে গেল, কিন্তু কেউ নাচ শুরু করল না। একজন এড় ডি-কং কাউন্টেস বেজুখভার কাছে গিয়ে তাকে নাচতে বলল। সেও হেসে তার কাঁধে হাত রাখল, একবার ফিরেও দেখল না সে কে। এড-ডি-কংটি নাচের ব্যাপারে খুব ওস্তাদ, সঙ্গিনীটির কোমরটাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে পরিপূর্ণ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে প্রথমে ধীরে ধীরে বৃত্তের প্রান্ত ঘেঁষে একপাক ঘুরে নিয়ে ঘরের একটা কোণে গিয়ে হেলেনের বাঁ হাতটা ধরে তাকে ঘুরিয়ে দিল, দ্রুততালের বাজনার শব্দ ছাড়া একমাত্র শব্দ শোনা যেতে লাগল তার কাটা-মারা জুতোর অনায়াস সহজ গতির সুরেলা ঠুকঠুক আওয়াজ, আর প্রতি তৃতীয় তালটির সঙ্গে সঙ্গে সঙ্গিনীটি ঘুরে যেতে লাগল এবং তার ভেলভেটের পোশাক বাতাসে উড়তে লাগল। সেদিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে নাতাশার কান্না পেয়ে গেল, কারণ ভালস-নাচের প্রথম নাচটাও তার কপালে জুটল না।
অশ্বারোহী কর্নেলের সাদা ইউনিফর্ম, মোজা ও নাচের জুতো পরে প্রিন্স আন্দ্রু রস্তভদের থেকে অনেক দূরে দীপ্ত মুখে একেবারে সামনের সারিতেই দাঁড়িয়েছিল। পরের দিন রাষ্ট্রীয় পরিষদের যে প্রথম অধিবেশন বসবে সে সম্পর্কে ব্যারন ফিরহপ তার সঙ্গে কথা বলছিল। প্রিন্স আন্দ্রু কিন্তু ফিরহপের কথায় কান না দিয়ে একবার সম্রাটকে, আর একবার নাচে অংশগ্রহণেচ্ছু লোকদেরই দেখছিল।
পিয়ের এগিয়ে এসে তার হাত ধরল।
তুমি তো সর্বত্রই নাচ। এখানে আমার একটি পরিচিতা আছে-তরুণী রস্তভা। তাকে ডেকে নাও, সে বলল।
কোথায় তিনি? বলকনস্কি শুধাল, তারপর ব্যারনের দিকে ঘুরে বলল, মাফ করবেন–ও আলোচনাটা অন্য সময় শেষ করা যাবে–বলনাচে এসে নাচটাই আগে। পিয়েরের ইঙ্গিতে সে এগিয়ে গেল। নাতাশার মুখের হতাশ, বিষণ্ণ ভাবটা তার চোখে পড়ল। সে নাতাশাকে চিনতে পারল, তার মনের কথাটা অনুমানে বুঝে নিল, বুঝল যে এ ধরনের আসরে এই তার প্রথম আবির্ভাব, জানালার পাশে তার কথাগুলি মনে পড়ল, মুখে একটা খুশির ভাব ফুটিয়ে সে কাউন্টেস রস্তভার দিকে এগিয়ে গেল।
কাউন্টেস বলল, আমার মেয়ের সঙ্গে আপনার পরিচয় করিয়ে দিচ্ছি।
তার কঠোর ব্যবহার সম্পর্কে পেরোনস্কায়ার মন্তব্যকে সম্পূর্ণ মিথ্যা প্রমাণ করে দিয়ে প্রিন্স আন্দ্রু অত্যন্ত ভদ্রভাবে মাথাটা নিচু করে অভিবাদন জানিয়ে বলল, কাউন্টেসের যদি স্মরণ থেকে থাকে তো বলি, পরিচয়ের সৌভাগ্য আমার আগেই হয়েছে। নাতাশার দিকে এগিয়ে গিয়ে নাচের আমন্ত্রণ জানানোর কাজটা শেষ না করেই সে নাতাশার কোমর জড়িয়ে ধরবার জন্য হাতটা বাড়িয়ে দিল। ভালস নাচের আমন্ত্রণ। নাতাশার মুখের কাঁপা ভাবটা সরে গিয়ে হঠাৎ সেখানে ফুটে উঠল সকৃতজ্ঞ খুশির শিশুর মতো হাসি।
প্রিন্স আন্দ্রুর কাঁধে হাতটা রাখতে গিয়ে শংকার চোখের জলের পরিবর্তে যে হাসি সে হাসল তা যেন বলতে চাইল, তোমার জন্য আমি অনেকক্ষণ অপেক্ষা করে আছি। নাচের আসরে প্রবেশকারী তারাই দ্বিতীয় জুটি। প্রিন্স আন্দ্রু সেসময়কার শ্রেষ্ঠ নাচিয়েদের একজন, আর নাতাশাও চমৎকার নাচে। সাটিনের নাচের জুতো পরা তার ছোট পা দুইখানি দ্রুত লয়ে, হাল্কা চালে নাচতে লাগল, আর তার মুখটা উচ্ছ্বসিত আনন্দে ঝলমল করতে লাগল। প্রিন্স আন্দ্রুন্দ্ৰ নাচতে ভালোবাসে, রাজনৈতিক ও চটুল আলোচনায় সকলে তাকে যেভাবে ঘিরে ধরেছিল, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তার হাত থেকে পালাবার জন্যই সে নাচতে শুরু করেছে, আর পিয়ের নাতাশাকে দেখিয়ে দিয়েছে বলেই সে তাকে বেছে নিয়েছে, তাছাড়া, এই সুন্দরী মেয়েটিই প্রথম তার চো খেও পড়েছে, কিন্তু তার সেই নরম, ক্ষীণ তনুটিকে জড়িয়ে ধরে, তার দেহের নৈকট্য অনুভব করে ও এত কাছে থেকে তাকে হাসতে দেখে নাতাশার আকর্ষণের সুরা যেন একেবারে তার মাথায় উঠে গেল, এবং নাচের শেষে তাকে ছেড়ে দিয়ে সে যখন জোরে জোরে নিঃশ্বাস ফেলতে ফেলতে অন্যদের নাচ দেখতে লাগল তখন তার মনে হল সে বুঝি নতুন জন্ম, নবীন যৌবন লাভ করেছে।
