নাতাশা আয়নায় নিজেকে দেখতে পেল, কিন্তু অন্যের প্রতিচ্ছবি থেকে নিজেকে আলাদা করে চিনতেই পারল না। সব যেন মিলেমিশে একটা মিছিলের সামিল হয়ে গেছে। নাচঘরে ঢুকে লোকের কলগুঞ্জন, পায়ের শব্দ, আর আপ্যায়নে তার কানে তালা লেগে গেল, আলো ঝলমলানি তার চোখকে আরো বেশি করে ধাধিয়ে দিল। গৃহকর্তা ও গৃহকত্রী আধঘণ্টা ধরে দরজায় দাঁড়িয়ে একই কথা আপনাকে দেখে খুশি হলাম বলে সকলকেই অভ্যর্থনা করছে, সেই একইভাবে রস্তভদের ও পেরোনস্কায়াকেও অভ্যর্থনা জানাল।
নাচঘরে অতিথিরা ম্রাটের প্রতীক্ষায় দরজার কাছে ভিড় জমিয়েছে। কাউন্টেস নিজের জন্য ভিড়ের একেবারে সামনের সারিতে একটা জায়গা করে নিয়েছে। সব দেখেশুনে নাতাশা বুঝতে পারল, বেশ কয়েকজন তার কথা জিজ্ঞাসা করছে, তাকে দেখছে। সে আরো বুঝল, যারা তাকে দেখছে তারাই তাকে পছন্দ করছে, এতে তার মন বেশ শান্ত হল।
ভাবল, কেউ কেউ আমাদেরই মতো, আবার কেউ বা খারাপ।
পেয়োনায়া নাচের আসরে সমবেত বড় বড় লোকদের দিকে আঙুল বাড়িয়ে কাউন্টেসকে দেখাচ্ছে।
দেখতে পাচ্ছ? উনি হচ্ছেন হল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত! ঐ যে পাকাচুল মাথায় লোকটি।
হেলেনকে দেখিয়ে বলল, এই তো এসে পড়েছে পিটার্সবুর্গের রানী কাউন্টেস বেজুখভা। কী সুন্দর! একেবারে মারিয়া আন্তনভনার সমক্ষক। দেখ, যুবক-বৃদ্ধ সকলেই তাকে সম্মান দেখাচ্ছে। যেমন সুন্দরী, তেমনি চটপটে…লোকে বলে প্রিন্স–তার জন্য একেবারে পাগল। আর ঐ দুটিকে দেখ, দেখতে সুশ্রী না হলেও অনেকেই ওদের পিছনে ছোটে।
সাদাসিধে পোশাকের মেয়েকে নিয়ে একটি মহিলা ঘরটা পার হয়ে গেল, তাদের দেখিয়েই পেরোনস্কায়া শেষের কথাগুলি বলল।
কলাইকুর্তকে দেখিয়ে কাউন্টেস তার পরিচয় জানতে চাইলে পেরোনস্কায়া বলল, আরে, উনি তো স্বয়ং ফরাসি রাষ্ট্রদূত! দেখ না, ঠিক যেন রাজা। যাই বল, ফরাসিরা মনোরম, খুব মনোরম। আর-এই তো তিনি-সকলের সেরা সুন্দরী আমাদের মারিয়া আন্তনভনা! কী সাদাসিধে পোশাক! চমৎকার! আর চশমা-পরা ঐ শক্তসমর্থ মানুষটি, পিয়েরকে দেখিয়ে সে বলতে লাগল, উনি হলেন ভ্রাতৃসংঘের সদস্য। স্ত্রীর পাশে ওকে দাঁড় করিয়ে দেখ, মনে হবে যেন একটি ভাঁড়।
নাতাশা সানন্দে পিয়েরের পরিচিত মুখের দিকে তাকাল। সে জানে, পিয়ের তাদেরই খোঁজ করছে, বিশেষ করে তার। সে কথা দিয়েছে, বল-নাচে উপস্থিত থেকে তার নাচের জুটি ঠিক করে দেবে।
কিন্তু তাদের কাছে আসবার আগেই পিয়ের একটি সুদর্শন মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে পড়ল। লোকটির উচ্চতা মাঝারি, গায়ের রং গাঢ়, পরনে সাদা ইউনিফর্ম, জানালার পাশে দাঁড়িয়ে সে তারকা ও ফিতেয় সজ্জিত একটি লোকের সঙ্গে কথা বলছে। সাদা ইউনিফর্মের বেঁটে যুবকটিকে দেখেই নাতাশা চিনতে পারল : সে বলকনস্কি, নাতাশার মনে হল সে আগের চাইতে আরো কমবয়সী, আরো সুখী এবং আরো সুদর্শন হয়ে উঠেছে।
প্রিন্স আন্দ্রুকে দেখিয়ে নাতাশা বলল, দেখতে পাচ্ছ মামণি, আরো একজনকে আমরা চিনি-বলকনস্কি তোমার মনে আছে অত্রাদণুতে একটা রাত সে আমাদের বাড়িতে কাটিয়েছিল?
পেরোনস্কায়া বলল, আরে, তোমরা ওকে চেন? আমি ওকে সহ্য করতে পারি না। এখন তো ভালো-মন্দ আবহাওয়া সবই ওর উপর নির্ভর করে। লোকটি বড়ই অহংকারী। ঠিক বাবার মতো। স্পেরোনস্কির সঙ্গে খুব দহরম মহরম, কোনোনা কোনো প্রকল্প লেখার কাজ নিয়েই আছে। দেখ না, মহিলাদের সঙ্গে কেমন ব্যবহার করছে। যে কেউ কথা বলতে যাচ্ছে অমনি মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। আমার সঙ্গে ওরকম ব্যবহার করলে ঢিট করে দিতাম।
.
অধ্যায়-১৬
হঠাৎ সকলে নড়েচড়ে উঠল, কথা বলতে শুরু করল, একবার এগিয়ে গেল, আবার পিছিয়ে এল, এবং এইভাবে সমবেত সকলে দুই দিকে সরে যাওয়ায় তার ভিতর দিয়ে সম্রাট প্রবেশ করল। সঙ্গে সঙ্গে বাজনা শুরু হয়ে গেল। তার পিছনেই প্রবেশ করল গৃহকর্তা ও গৃহকত্রী। একবার ডাইনে, একবার বয়ে মাথা নোয়াতে নোয়াতে সম্রাট দ্রুতপায়ে হাঁটতে লাগল, যেন অভ্যর্থনার প্রাথমিক মুহূর্তগুলিকে তাড়াতাড়ি শেষ করাই তার ইচ্ছা। আলেক্সান্দার, এলিসাবেতা, আমাদের সকলের হৃদয় আপনি হরণ করেছেন-এই কথার তালে তালে তৎক্কালে প্রচলিত পলোনেসের ব্যান্ড বাজতে লাগল। সম্রাট বসবার ঘরে চলে গেল, একদল লোক উত্তেজিত মুখে সেখানে ঢুকেই আবার পিছিয়ে এল। সাজপোশাকের ক্ষতি হবে জেনেও কিছু মহিলা ভদ্রতার সীমা ভুলে গিয়ে সেইদিকে এগিয়ে গেল। এদিকে পুরুষরা যার যার জুটি বেছে নিয়ে পলোনেস নাচের জন্য জায়গা বেছে নিতে শুরু করে দিল।
সকলে সরে দাঁড়াল, গৃহকত্রীর হাত ধরে হাসতে হাসতে ঘরে ঢুকল সম্রাট, তার পা তখন আর বাজনার তালে তালে পড়ছে না। তাদের পিছনে গৃহকর্তা ঢুকল মারিয়া আন্তনভনা নারিস্কিনাকে সঙ্গে নিয়ে, তারপর একে একে ঢুকল যত রাষ্ট্রদূত, মন্ত্রী ও সেনাপতির দল, পেরোনস্কায়া অনেক কষ্টে তাদের প্রত্যেকের নাম বলে যেতে লাগল। বেশির ভাগ মহিলা ইতিমধ্যে তাদের জুটি বেছে নিয়ে পলোনেস-নাচের জন্য তৈরি হয়ে গেছে। নাতাশার মনে হল, কেউ তাকে নাচে ডাকবে না, যে অল্পকিছু মহিলা দেয়ালের কাছে ভিড় করে আছে, মা ও সোনিয়াকে নিয়ে তাকেও সেখানেই পড়ে থাকতে হবে। দুর্বল হাত দুটি নামিয়ে সে দাঁড়িয়ে রইল, তার অনুন্নত বুকটা নিয়মিত উঠছে-নামছে। রুদ্ধশ্বাসে ভীত, চকিতদৃষ্টি সম্মুখে প্রসারিত করে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে, যেন চূড়ান্ত সুখ বা দুঃখের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করছে। সম্রাটকে নিয়ে, অথবা যেসব মহারথীদের নাম পেরোনস্কায়া ঘোষণা করছে তাদের নিয়ে তার কোনো মাথাব্যথা নেই-তার মনে একটিমাত্র চিন্তা : এও কি সম্ভব যে কেউ আমাকে ডাকবে না, প্রথম যারা নাচবে তাদের একজন আমি হতে পারব না? এও কি সম্ভব যে এত লোকের মধ্যে একজনও আমার দিকে নজর ফেরাবে না? মনে হচ্ছে, তারা যেন আমাকে দেখতেই পাচ্ছে না, অথবা দেখতে পেলেও তারা এমনভাবে তাকাচ্ছে যেন বলতে চাইছে: আহা, আমি যাদের খুঁজছি এ তো তাদের কেউ নয়, কাজেই তার দিকে তাকিয়ে লাভ নেই! না, এ অসম্ভব। নাচবার যে আমার কত ইচ্ছা, আমি যে কী চমৎকার নাচতে পারি, আমার সঙ্গে নাচলে তাদের যে কত ভালো লাগবে, এসব তাদের জানাতেই হবে।
