.
পরদিন বরিসকে একান্তে ডেকে কাউন্টেস তার সঙ্গে কথা বলল। তারপর থেকেই সে রস্তভদের বাড়িতে আসা বন্ধ করে দিল।
.
অধ্যায়-১৪
১৮১০ সালের নববর্ষের পূর্ব সায়াহ্ন ৩১শে ডিসেম্বরে ক্যাথারিনের সময়কার এক বুড়ো জমিদার একটি বল নাচ ও মধ্যরাত্রিক ভোজনের আয়োজন করল। কূটনৈতিক মহলের ব্যক্তিরা এবং সম্রাট স্বয়ং সেখানে হাজির হবে।
ইংলিশ জাহাজঘাটার উপর অবস্থিত জমিদারের বিখ্যাত প্রাসাদটি অসংখ্য আলোয় ঝলমল করছে। উজ্জ্বলরূপে আলোকিত ফটকে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে, সেখানে পাতা হয়েছে লাল কার্পেট, আর শুধু সৈনিকরা নয়, ডজন-ডজন পুলিশ-অফিসার এমন কি স্বয়ং পুলিশ-মাস্টার পর্যন্ত ফটকে দাঁড়িয়ে আছে। গাড়ি থেকে নামছে ইউনিফর্ম, তারকা ও ফিতেয় সজ্জিত পুরুষের দল, আর মহিলারা সাটিন ও সাদা লোমের পোশাক পরে গাড়ি থেকে সাবধানে নেমেই দ্রুত অথচ নিঃশব্দ পায়ে কার্পেটের উপর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে।
যতবার একটা নতুন গাড়ি আসছে প্রায় ততবারই ভিড়ের মধ্যে একটা গুঞ্জন উঠছে, আর সকলেই টুপি খুলছে।
সম্রাট কি?…না, একজন মন্ত্রী…প্রিন্স…রাষ্ট্রদূত। পালক দেখছ না?
…জনতার কণ্ঠে ফিসফিস কথা।
অন্য সকলের চাইতে বেশি সুসজ্জিত একজন অতিথি তো উচ্চপদস্থ অনেকেরই নাম ধরে ডাকতে লাগল, মনে হল সে প্রায় সকলকেই চেনে।
অতিথিদের এক-তৃতীয়াংশ এর মধ্যেই এসে গেছে, কিন্তু রস্তভরা এখনো সাজগোজ নিয়েই ব্যস্ত।
এই বল-নাচকে কেন্দ্র করে রস্তভ পরিবারে অনেক আলোচনা ও প্রস্তুতি চলেছে। হয়তো আমন্ত্রণই আসবে না, পোশাক-পরিচ্ছদই হয় তো তৈরি হবে না, অথবা যেমনটি হওয়া উচিত তেমন ব্যস্থাটি করা যাবে না।
নাতাশা এই প্রথম বড় মাপের বল-নাচে যাচ্ছে। সকাল আটটায় সে ঘুম থেকে উঠেছে, সারাটা দিন প্রবল উত্তেজনা ও কাজকর্মের মধ্যে কেটেছে। সকাল থেকে একটা ব্যাপারেই তার সকল শক্তি নিয়োগ করেছে, তারা সকলেই সে নিজে, ও মামণি তো তার হাতেই নিজেদের সম্পূর্ণ ছেড়ে দিয়েছে। সোনিয়া সাজগোজ করে ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। একটা পিন আটকাতে গিয়ে তার সুন্দর আঙুলে লাগতেই সে চেঁচিয়ে উঠল ।
ওভাবে নয় সোনিয়া, ওভাবে নয়! মাথাটা ঘুরিয়ে নাতাশা চেঁচিয়ে বলল। বো-টা ঠিক হয়নি। এখানে এস!
সোনিয়া বসে পড়ল, নাতাশা অন্যভাবে পিন দিয়ে ফিতেটা আটকে দিল।
দাসী নাতাশার চুল বেঁদে দিচ্ছিল। সে বলল, আমাকে দেখিয়ে দাও মিস! আমি ওভাবে করতে পারি না।
আহা বাপু! তাহলে অপেক্ষা কর। ঠিক আছে সোনিয়া।
তোমরা এখনো তৈরি হওনি? প্রায় দশটা বাজে, কাউন্টেসের গলা শোনা গেল।
এই হয়ে গেল! এই হয়ে গেল। আর তুমি মামণি?
আমার শুধু টুপিটা আটকানো বাকি।
নাতাশা বলল, ওটা আমাকে ছাড়া করো না। তুমি ঠিকমতো পারবে না।
কিন্তু দশটা যে বাজে।
তোমরা কখন তৈরি হবে? দরজার কাছে এসে কাউন্ট শুধাল। এই যে আতরটা নাও। পেরোনস্কায়া নিশ্চয় বসে বসে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। কাউন্টেসের বান্ধবী পেরোনস্কায়াকে পথে তুলে নিয়ে যাবার কথা আছে।
নাতাশা পোশাক পরতে শুরু করল।
কাউন্ট দরজাটা খুলতেই সে চেঁচিয়ে উঠল, এক মিনিট! এক মিনিট! বাপি, ভিতরে এস না!
সোনিয়া সশব্দে দরজাটা ঠেলে দিল। এক মিনিট পরে কাউন্টকে ঢুকতে দিল।
তার পরনে নীল রংয়ের চাতক পাখির লেজওয়ালা কোট, জুতো, মোজা, গায়ে আতর মেখেছে, আর চুলে পমেড।
জামার ভাঁজ পালিশ করতে করতে ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে নাতাশা বলে উঠল, আঃ, বাপি! তোমাকে কী সুন্দর দেখাচ্ছে! চমৎকার!
ঠিক সেইমুহূর্তে আস্তে পা ফেলে সলজ্জ ভঙ্গিতে কাউন্টেস ঘরে ঢুকল, মাথায় টুপি, পরনে ভেলভেট গাউন।
উ-উ, সুন্দরী আমার! কাউন্ট উচ্ছ্বসিত স্বরে বলে উঠল, ওকে তো তোমাদের সকলের চাইতে ভালো দেখাচ্ছে।
কাউন্ট হয় তো তাকে জড়িয়ে ধরত, কিন্তু পাছে পোশাক কুঁচকে যায় এই ভয়ে কাউন্টেস লজ্জায় সরে গেল।
সাজপোশাক সেরে শেষপর্যন্ত সোয়া দশটার সময় তারা গাড়িতে চেপে রওনা হল। এখনো তরিদা বাগান থেকে পেরোনস্কায়াকে তুলে নেওয়া বাকি আছে।
পেরোনস্কায়া তৈরি হয়েই ছিল। বয়স হলেও সেও রস্তভদের মতো এই প্রথায় সাজগোজ করেছে। কুশ্রী বুড়ো শরীরটাকে ধধায়ামোছা করেছে, আতর মেখেছে, পাউডার ঘষেছে। বান্ধবী তার সাজপোশাকের প্রশংসা করল। সেও রস্তভদের সাজগোজের প্রশংসা করল। সকলের চুলের বিনুনি ও পোশাক আর একবার ঠিকঠাক করে নিয়ে এগারোটার সময় তারা গাড়িতে উঠে বসল। গাড়ি ছেড়ে দিল।
.
অধ্যায়-১৫
ভোর থেকে নাতাশার একমুহূর্ত সময় হাতে ছিল না, আর তার সামনে কি অপেক্ষা করে আছে সে একবারও ভাববার সময় পায়নি।
বাইরে ঠাণ্ডা ভিজে হাওয়ায় এবং ভিতরে লোকে-ঠাসা গাড়ির দুলুনিতে এই সে প্রথম পরিষ্কার করে ভাববার সময় পেল সেখানে বল-নাচের আসরে-গান, ফুল, নাচ, সম্রাট এবং পিটার্সবুর্গের সব ঝকঝকে যুবকদের মধ্যে সেই সব আলোকিত উজ্জ্বল ঘরের মধ্যে তার ভাগ্যেও কি ঘটতে পারে। সেখানে যেসব ভালো ঘটনা ঘটতে পারে তা এই ঠাণ্ডা অন্ধকার আর গাড়ির ভিড়ের সঙ্গে বেমানান যে বিশ্বাস করাই শক্ত। ফটকের লাল কার্পেটের উপর পা ফেলে সে যখন হল-ঘরে ঢুকল, লোমের জোব্বাটা খুলে ফেলল, এবং সোনিয়াকে পাশে নিয়ে মার আগে আগে উজ্জ্বল আলোকিত সিঁড়ির ফুলেঢাকা ধাপগুলিতে পা দিতেই সে যেন বুঝতে পারল বল-নাচে তাকে কীভাবে চলতে হবে, আর সঙ্গে সঙ্গে এই পরিবেশে যে গাম্ভীর্যপূর্ণ ভঙ্গিমা একটি মেয়ের পক্ষে অপরিহার্য বলে মনে হল, নিজের আচরণে সেই ভঙ্গিমাটি ফুটিয়ে তুলতে সচেষ্ট হল।
