বলল, এই–এই!
নাতাশা বলল, মামণি, একটু কথা বলতে পারি? পারি তো? এবার তাহলে তোমার গলায় একটা, আর…এতেই হবে! মার গলা জড়িয়ে ধরে চুমো খেল।
বালিশগুলো ঠিকঠাক করে দিয়ে দুইজনে লেপ মুড়ি দিয়ে শোবার পরে মা বলল, আরে, আজ রাতে এসব কি হচ্ছে?
কাউন্ট ক্লাব থেকে ফিরে আসার আগে রাতে নাতাশার একবার করে মার কাছে আসাটা মা ও মেয়ে দুইজনের কাছেই একটা বড় আনন্দের ব্যাপার।
আজ রাতে এসব কি?-কিন্তু আমি তোমাকে বলতে চাই…
নাতাশা মার মুখের উপর হাতটা রাখল।
গম্ভীর গলায় বলল, বরিসের কথা তো…আমি জানি। সেইজন্যই তো এসেছি। কিছু বল না–আমি জানি। না, আমাকে বল! নাতাশা হাতটা সরিয়ে নিল। বল মামণি! সে খুব ভালো, নয়?
নাতাশা, তোমার বয়স ষোল। তোমার বয়সে আমার বিয়ে হয়েছিল। তুমি বলছ বরিস ভালো। সে খুব ভালো, আমি তাকে ছেলের মতো ভালোবাসি। কিন্তু তাতে কি? তুমি কি ভেবেছ? তার মুণ্ডুটা যে একেবারেই ঘুরিয়ে দিয়েছ তা তো দেখতেই পাচ্ছি…
বলতে বলতে কাউন্টেস মেয়ের দিকে তাকাল। খাটের এক কোণে মেহগনি কাঠের উপর খোদাই-করা ফিনস্কের মূর্তিটার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে নাতাশা শুয়ে ছিল। কাজেই কাউন্টেস মেয়ের মুখের রেখাচিত্রটাই শুধু দেখতে পেল। সে মুখের কঠিন গম্ভীর ভাব দেখে সে অবাক হল।
নাতাশা কি যেন ভাবছে।
বলল, বেশ, তারপর?
তার মুণ্ডুটা তো একেবারে ঘুরিয়ে দিয়েছ, কিন্তু কেন? তাকে নিয়ে কি করতে চাও? তুমি তো জান তাকে বিয়ে করতে পারবে না।
কেন নয়? একভাবে শুয়ে থেকেই নাতাশা বলল।
কারণ তার বয়স অল্প, কারণ সে গরীব, কারণ সে আত্মীয়…এবং কারণ তুমি নিজেও তাকে ভালোবাস না।
কি করে জানলে?
আমি জানি। এটা ঠিক নয় বাছা!
কিন্তু আমি যদি চাই… নাতাশা বলল।
বাজে কথা রাখ, কাউন্টেস বলল।
কিন্তু আমি যদি চাই…
নাতাশা, আমি কিন্তু আন্তরিকভাবেই…
নাতাশা তাকে কথাটা শেষ করতে দিল না। কাউন্টেসের হাতটা টেনে নিয়ে তার পিঠে চুমো খেল, তারপর তালুতে চুমো খেল, আবার হাতটাকে উল্টে নিয়ে প্রথমে একটা গাঁটে চুমো খেল, তারপর দুই গাঁটের মাঝখানের জায়গাটাতে, তারপর পরের গাঁটে, আর ফিসফিস করে বলতে লাগল, জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি, মার্চ, এপ্রিল, মে। বল মামণি, তুমি কিছু বলছ না কেন? কথা বল!
এ চলবে না বাছা! ছেলেবেলাকার এই বন্ধুত্বকে সকলে বুঝবে না। তার সঙ্গে তোমার এই ঘনিষ্ঠতা দেখলে অন্য যেসব যুবক আমাদের বাড়িতে আসে তাদের মনে আঘাত লাগতে পারে। সবচাইতে বড় কথা, অকারণেই সেও কষ্ট পাবে। হয়তো ইতিমধ্যেই তার একটা ভালো অর্থকরী বিয়ের ব্যবস্থা হয়ে গেছে, আর এখন সে তো আধা পাগল হয়ে উঠেছে।
পাগল? নাতাশা কথাটা আবার বলল।
আমার নিজের কথা কিছুটা তোমাকে বলছি। আমার একটি জ্ঞাতিভাই ছিল…
আমি জানি! সিরিল মাভিচ…তিনি তো বুড়ো।
চিরদিন সে বুড়ো ছিল না। কিন্তু আমি এই করব নাতাশা, বরিসের সঙ্গে একবার কথা বলব। এত ঘন ঘন তার আসার দরকার নেই…
কিন্তু কেন, সে যদি আসতে চায়…
কারণ আমি জানি যে শেষপর্যন্ত এতে কিছুই লাভ হবে না…
তুমি কি করে জান? না মামণি, তার সঙ্গে কথা বল না! যত সব বাজে কথা! নাতাশা এমনভাবে কথা বলল যেন একটা সম্পত্তি হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। বেশ তো, আমি তাকে বিয়ে করব না, কিন্তু আসতে যদি তার ভালো লাগে, আমারও ভালো লাগে, তাহলে তাকে আসতে দাও। নাতাশা হেসে মার দিকে তাকাল। বিয়ে নয়, কিন্তু ঠিক বিয়ের মতো, সে যোগ করল।
বিয়ের মতো, সেটা কি বাছা?
বিয়ের মতো। তাকে বিয়ে করার কোনো দরকার নেই। কিন্তু…বিয়ের মতো।
বিয়ের মতো, বিয়ের মতো, কথাটা বারকয়েক আউড়ে কাউন্টেস হঠাৎ খোশ মেজাজে, অপ্রত্যাশিতভাবে, বুড়োদের মতো করে হেসে উঠল।
হেসো না, থাম! নাতাশা চেঁচিয়ে বলল। গোটা বিছানাটাকে কাঁপিয়ে দিচ্ছ! তুমি একেবারে আমার মতো, ঠিক আমার মতোই আর এক হাসির হররা।…দাঁড়াও…কাউন্টেসের দুই হাত ধরে সে কড়ে আঙুলের গাঁটে চুমো খেয়ে বলল, জুন, তারপর অন্য হাতে চুমো খেতে খেতে বলল, জুলাই, আগস্ট…কিন্তু মামণি, সে কি খুবই প্রেমে পড়েছে। তোমার কি মনে হয়? কেউ কি কোনোদিন তোমার এতখানি প্রেমে পড়েছিল সে তো খুব ভালো, খুব, খুব ভালো। শুধু ঠিক আমার মনের মতো নয়–তার মনটা এত সংকীর্ণ, ঠিক খাবার ঘরের ঘড়িটার মতো…বুঝতে পারলে না? সংকীর্ণ, জান তো-ধূসর, হাল্কা ধূসর…
কী বাজে কথা বলছ! কাউন্টেস বলল।
নাতাশা বলেই চলল :
তুমি সত্যি বুঝতে পারছ না? নিকলাস হলে বুঝত…বেজুখভ এখন নীল, গাঢ় নীল ও লাল (শরীরতত্ত্ববিদরা জানেন, শব্দ মানুষের কাছে রঙের তাৎপর্য বহন করে থাকে), আর সে তো সরল মানুষ।
কাউন্টে হেসে বলল, তুমি তো তার সঙ্গেও ঢলাঢলি কর।
না, সে যে ভ্রাতৃসংঘের সদস্য সেটা আমি জেনে ফেলেছি। সে ভালো মানুষ, গাঢ় নীল ও লাল…তোমাকে কেমন করে যে বোঝাব?
দরজার ওপাশ থেকে কাউন্টের গলা শোনা গেল, ছোট কাউন্টেস! ঘুমিয়ে পড়নি তো? নাতাশা লাফ দিয়ে উঠে চটি হাতে নিয়ে একদৌড়ে খালি পায়ে নিজের ঘরে চলে গেল।
অনেকক্ষণ পর্যন্ত তার ঘুম এল না। সে ভাবতে লাগল, সে যা বোঝে, তার মধ্যে যা কিছু আছে তা কেউ বুঝতে পারে না।
চেরুবিনির লেখা তার প্রিয় অপেরার একটুকরো গুন গুন করতে করতে সে বিছানায় এলিয়ে পড়ল, অচিরেই ঘুম আসবে এই মধুর চিন্তায় হাসতে লাগল। দাসী দুনিয়াশাকে ডেকে মোমবাতিটা নিভিয়ে দিতে বলল, আর দুনিয়াশা ঘর থেকে বেরিয়ে যাবার আগেই সে নিজে চলে গেল আর এক সুখের স্বপ্ন-জগতে যেখানে সবকিছুই হাল্কা আর সুন্দর, হয়তো আলাদা বলেই আরো বেশি সুন্দর।
