১৮০৫ সালে বরিস যখন সেনাদলে যোগ দিতে মস্কো থেকে চলে গিয়েছিল তারপরে রস্তদের সঙ্গে তার আর দেখা হয়নি। বারকয়েক সে মস্কো এসেছে, অস্ত্রাদ-র কাছ দিয়েও গেছে, কিন্তু কখনো তাদের সঙ্গে দেখা করতে যায়নি।
কখনো কখনো নাতাশার মনে হয়েছে যে বরিস আর তার সঙ্গে দেখা করতে চায় না, বড়রাও তার সম্পর্কে যে সুরে কথা বলে তাতেও তার এই অনুমানই সমর্থিত হয়।
বরিসের কথা উঠলেই কাউন্টেস বলে, আজকাল পুরনো বন্ধুদের কেউ মনে রাখে না।
আন্না মিখায়লভনাও আজকাল আগের তুলনায় অনেক কম আসে, সবসময় একটা গাম্ভীর্য বজায় রেখে চলে, এবং ছেলের গুণপনা ও উজ্জ্বল ভবিষ্যতের কথা নিয়েই উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে। রস্তভরা পিটার্সবুর্গে এলে বরিস তাদের সঙ্গে দেখা করতে এল।
বেশ উত্তেজনা নিয়েই সে তাদের বাড়ি গেল। নাতাশার স্মৃতি তার কাছে খুবই কাব্যময়। কিন্তু এই দৃঢ় সংকল্প নিয়েই সে গেল যে নাতাশাকে ও তার বাবা-মাকে বুঝিয়ে দেবে, নাতাশার সঙ্গে তার ছেলেমানুষী সম্পর্কটা দুইজনের কারো পক্ষেই বাধ্যতামূলক হতে পারে না। কাউন্টেস বেজুখভের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার দৌলতে সমাজে সে সুষ্ঠুভাবে প্রতিষ্ঠিত, একজন পদস্থ ব্যক্তির পৃষ্ঠপোষকতার দৌলতে চাকরিক্ষেত্রেও তার সম্ভাবনা সুউজ্জ্বল, এবং পিটার্সবুর্গের জনৈকা অন্যতম ধনী উত্তরাধিকারিণীকে বিয়ে করার ব্যবস্থাও সে শুরু করে দিয়েছে, আর সে ব্যবস্থা সহজেই বাস্তবে রূপায়িত হতে পারবে। সে যখন রস্তভদের বসবার ঘরে ঢুকল তখন নাতাশা ছিল তার নিজের ঘরে। বরিসের আসার সংবাদ পেয়ে সে লজ্জায় লাল হয়ে মধুর হাসিতে উজ্জ্বল হয়ে দৌড়ে সেখানে এসে হাজির হল।
বরিস চার বছর আগে নাতাশাকে যেমনটি দেখেছিল, সেই খাটো পোশাক পরা, কোঁকড়া চুলের নিচে উজ্জ্বল দুটি কালো চোখ, সেই ছেলেমানুষী উচ্ছল হাসি, নাতাশার সেই চেহারাটাই এখনো তার মনে আছে। কাজেই যখন সম্পূর্ণ আলাদা এক নাতাশা এসে ঘরে ঢুকল তখন সে যেন একটু অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল, একটা উচ্ছ্বসিত বিস্ময় ফুটে উটল তার মুখে।
কাউন্টেস শুধাল, আচ্ছা, তোমার সেই ছোট পাগলি খেলার সাথীটিকে চিনতে পারছ কি?
নাতাশার হাতে চুমো খেয়ে বরিস বলল তার এই পরিবর্তন দেখে সে অবাক হয়ে গেছে।
তুমি কত সুন্দর হয়েছ?
তাই তো মনে হয়! নাতাশার হাসিভরা চোখ দুটি জবাব দিল।
বলল, পাপা কি খুব বড় হয়েছে?
নাতাশা বসল, কাউন্টেসের সঙ্গে বরিসের কথাবার্তায় যোগ না দিয়ে সে নীরবে তার ছেলেবেলাকার প্রণয়ীকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল। বরিসও সেটা বুঝতে পেরে বার বার নাতাশার দিকে তাকাতে লাগল।
বরিসের ইউনিফর্ম, কাঁটা-মারা জুতো, টাই, চুল ব্রাশ করার ভঙ্গি, সবই একেবারে হাল-ফ্যাশনের। সবই নাতাশার নজরে পড়ল। কাউন্টেসের পাশের হাতল চেয়ারটায় সে আরাম করে বসেছে, ডান হাত দিয়ে পরিষ্কার দুটি দস্তানাকে এমনভাবে পরল যেন সে দুটি হাতের চামড়াই হয়ে গেল, ঠোঁট দুটিকে সুন্দরভাবে চেপে পিটার্সবুর্গের উঁচু মহলের আমোদ-প্রমোদের কথা বলছে, আর মৃদু বিদ্রুপের সঙ্গে মস্কোর পুরনো দিনের কথা ও পরিচিত লোকজনদের কথাও উল্লেখ করছে।
বরিস দশ মিনিটের বেশি সেখানে থাকল না, আসন থেকে উঠে বিদায় নিল। দুটি সপ্রশ্ন, ঠাট্টাভরা, দৃষ্টি তখনো তার দিকে তাকিয়ে আছে। এই প্রথম সাক্ষাতের পরে বরিস নিজেকে বোঝাল, নাতাশা তাকে আগের মতোই আকর্ষণ করেছে, কিন্তু এই আকর্ষণের কাছে ধরা দিলে চলবে না, কারণ সম্পত্তিহীন এই মেয়েটিকে বিয়ে করা মানেই তার ভবিষ্যৎ উন্নতির সর্বনাশ করা আবার তাকে বিয়ে করার ইচ্ছা না থাকলেও তার সঙ্গে নতুন করে ভাব জমানোটা অসম্মানজনক। বরিস স্থির করল নাতাশার সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ করবে না, কিন্তু সে সংকল্প সত্ত্বেও কয়েকদিন পরেই আবার দেখা করতে গেল এবং প্রায়ই দেখা করতে লাগল এবং রস্তভদের বাড়িতে সারাটাদিন কাটাতে লাগল। তার মনে হল, নাতাশার সঙ্গে তার একটা বোঝাঁপড়া হওয়া দরকার, তাকে জানানো দরকার যে পুরনো দিনের কথা ভুলে যেতে হবে, যত যাই হোক…সে তার স্ত্রী হতে পারে না, তার কোনো সামর্থ্য নেই, আর নাতাশার বাবা-মাও তার সঙ্গে নাতাশার বিয়ে দেবে না। দিনের পর দিন সে ক্রমেই জড়িয়ে পড়তে লাগল। তার মার ও সোনিয়ার মনে হল, নাতাশা আগের মতোই বরিসকে ভালোবাসে। সে বরিসকে তার প্রিয় গানগুলি গেয়ে শোনায়, নিজের ছবির অ্যালবাম তাকে দেখায়, বরিসকে দিয়ে তাতে কিছু লিখিয়ে নেয়, পুরনো কথা তুলতেই দেয় না, বর্তমান যে কত সুখের শুধু সেই কথাই বলে, প্রতিদিনই সেই একই কুয়াশার মধ্যে সে বিদায় নেয়, যা বলতে চায় তা বলা হয় না, কি করছে, কেন এখানে আসছে, কোথায় এর শেষ–তাও সে জানে না। হেলেনের সঙ্গে দেখা করা ছেড়ে দিল, প্রতিদিনই তার কাছ থেকে তিরস্কারপূর্ণ চিঠি পেতে লাগল, তবু তার দিনগুলি কাটতে লাগল রস্তভদের বাড়িতেই।
.
অধ্যায়-১৩
একদিন রাতে বুড়ি কাউন্টেস যখন রাত-টুপি ও ড্রেসিং-জ্যাকেট পরে কম্বলের উপর হাঁটু ভেঙে বসে দীর্ঘশ্বাস ফেলতে ফেলতে আর্তনাদ করছিল আর মেঝেতে উপুড় হয়ে প্রার্থনা করছিল, তখন তার ঘরের দরজাটা কাঁচ ক্যাচ শব্দ করে উঠল এবং ড্রেসিং-জ্যাকেট গায়ে ও খালি পায়ে চটি পরে নাতাশা দৌড়ে এসে ঘরে ঢুকল। কাউন্টেসের প্রার্থনার মেজাজ চলে গেল, ভুরু কুঁচকে চারদিকে তাকাল। এও কি হতে পারে যে এই কোচটিই হবে আমার সমাধি?–এই শেষ প্রার্থনাটিই কাউন্টেস শেষ করতে যাচ্ছিল। মাকে প্রার্থনা করতে দেখে নাতাশা হঠাৎ ছোটা বন্ধ করে অর্ধেক বসার ভঙ্গিতে নিজের অজ্ঞাতেই জিভটা বের করল, যেন নিজেকেই তিরস্কার করতে চাইল। যখন দেখল প্রার্থনা করেই চলেছে তখন সে পা টিপে টিপে বিছানায় গেল এবং তাড়াতাড়ি এক পা দিয়ে অন্য পায়ের চটি খুলে ফেলে দিয়ে একলাফে বিছানায় উঠে গেল–একটু আগেই কাউন্টেস আশংকা করেছিল যে এই বিছানাটাই বুঝি তার সমাধি হবে। কোচটা উঁচু, পালকের গদি ও পাঁচটা বালিশ, প্রত্যেকটা নিচেরটার চাইতে কিছু ছোট। লাফ দিয়ে উঠেই নাতাশা পালকের গদিতে ডুব দিল পাক খেয়ে দেয়ালের দিকে সরে গেল, বিছানার চাদর নিয়ে খেলতে শুরু করে দিল, একবার আপাদমস্তক ঢেকে ফেলল, আবার মুখ বের করে মার দিকে তাকাল। প্রার্থনা শেষ করে কাউন্টেস কঠিন মুখে বিছানার কাছে এগিয়ে গেল, কিন্তু নাতাশার মাথাটা ঢাকা দেওয়া থাকায় তার মুখে দেখা দিল সদয়, দুর্বল হাসি।
