.
অধ্যায়-১১
দুটো বছর গ্রামে কাটিয়েও রস্তভদের আর্থিক অবস্থার কোনোরকম উন্নতি হল না।
যদিও নিকলাস রস্তভ তার সংকল্পে অটল থেকে অপেক্ষাকৃত অল্প খরচে একটা নগণ্য রেজিমেন্টে খুব সাদাসিধেভাবে দিন কাটাচ্ছে, ওদিকে অত্রাদ-র জীবনযাত্রা বিশেষ করে মিতিংকার গৃহস্থালি-এমনভাবে চলছে যাতে প্রতিবছরই ঋণের পরিমাণ অনিবার্যভাবেই বেড়ে চলেছে। একটা সরকারি পদের জন্য আবেদন করাই তখন বুড়ো কাউন্টের সামনে একমাত্র পথ আর তার খোঁজেই সে পিটার্সবুর্গে এসেছে, আর এই ফাঁকে মেয়েরাও শেষবারের মতো একটু আমোদ-আহ্লাদ করে নিতে পারবে।
পিটার্সবুর্গে আসার কিছুদিন পরেই বের্গ ভেরাকে বিয়ের প্রস্তাব করে এবং তা গৃহীত হয়।
মস্কোর মতো পিটার্সবুর্গেও রস্ত পরিবার সেই একই আতিথেয়তার রীতি বজায় রেখেই চলেছে, তাদের নৈশভোজনে নানা ধরনের লোক এসে মিলিত হয়। অত্রানুর পল্লী অঞ্চলের প্রতিবেশীরা, দুস্থ অবস্থার প্রাচীন জমিদার ও তাদের কন্যারা, সম্ভ্রান্ত মহিলা পেরোনায়া, পিয়ের বেজুখব, আর তাদের জেলা পোস্টমাস্টারের পিটার্সবুর্গে চাকরিরত ছেলেটি। পুরুষদের মধ্যে যারা অচিরেই রস্তভদের পিটার্সবুর্গের বাড়ির নিয়মিত অতিথি হয়ে উঠল তাদের মধ্যে রয়েছে বরিস, পিয়েরকে তো কাউন্ট রাস্তায় দেখতে পেয়ে জোর করেই বাড়িতে টেনে এনেছে, আর বের্গ সারাটাদিন রস্তভদের বাড়িতেই কাটায় এবং বড় মেয়ে কাউন্টেস ভেরার প্রতি সেইরকম মনোযোগ দিয়ে চলে, একটি যুবক বিয়ের প্রস্তাব করার আগে ভাবী কনের প্রতি যতটা মনোযোগ দিয়ে থাকে।
বের্গ যে অস্তারলিজে আহত ডান হাতটা সকলকেই দেখিয়ে বেড়ায় এবং একটা সম্পূর্ণ অদরকারী তলোয়ার বাঁ হাতে নিয়ে চলে সেটাও বৃথা যায়নি। সেই ঘটনাকে সে এতবার বলেছে আর এমন গুরুত্বের সঙ্গে বলেছে যে সকলেই তার সেই কাজটির গুণ ও প্রয়োজনীয়তায় বিশ্বাস করেছে। অস্তারলিজের জন্য সে দুটো সম্মান-চিহ্নও পেয়েছে।
কিছু কিছু নিন্দুক বের্গের গুণাবলীর কথা শুনে হাসলেও একথা অস্বীকার করা যায় না যে সে একজন পরিশ্রমী ও সাহসী অফিসার, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তার সম্পর্ক চমৎকার, আর একজন সচ্চরিত্র যুবক হিসেবে তার সামনে আছে উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ ও সমাজে একটি সুনিশ্চিত আসন।
চার বছর আগে মস্কোর একটি থিয়েটারের স্টলে জনৈক জার্মান সহকর্মীর সঙ্গে দেখা হলে বে ভেরা রন্তভাকে দেখিয়ে তাকে জার্মান ভাষায় বলেছিল, ঐ মেয়েটি আমার ভাবীবধূ, আর সেই মুহূর্ত থেকেই সে স্থির করেছে যে ভেরাকেই বিয়ে করবে। এবার পিটার্সবুর্গে এসে রস্তভদের অবস্থা ও নিজের অবস্থা বিবেচনা করে সে স্থির করল যে এবার বিয়ের প্রস্তাব করার সময় এসেছে।
প্রথমে বিয়ের প্রস্তাব শুনে কিছুটা বিব্রত বোধ করলেও নিজেদের আর্থিক অবস্থা ও ভেরার চব্বিশ বছর বয়স হয়ে যাওয়ার কথা চিন্তা করে রস্তভরা শেষপর্যন্ত এ-প্রস্তাবে সম্মতি দিল।
প্রায় একমাস হয়ে গেল বিয়ের কথা পাকা হয়ে গেছে, বিয়ের আর মাত্র এক সপ্তাহ বাকি, কিন্তু যৌতুকের ব্যাপারে কাউন্ট এখনো মনস্থির করতে পারেনি, বা স্ত্রীকে এ সম্পর্কে কিছু বলেনি। একসময়ে কাউন্ট ভেবেছিল, রিয়াজান জমিদারিটা মেয়েকে দিয়ে দেবে, বা একটা জঙ্গল বিক্রি করে দেবে, আবার কখনো ভেবেছে হ্যান্ড-নোটে টাকা ধার করবে। বিয়ের দিনকয়েক আগে একদিন সকালে বের্গ কাউন্টের পড়ার ঘরে ঢুকে স্মিত হাসির সঙ্গে সশ্রদ্ধভাবে ভাবী শ্বশুরের কাছে জানতে চাইল ভেরাকে কিরকম যৌতুক দেওয়া হবে। এই দীর্ঘ-প্রতীক্ষিত প্রশ্নে কাউন্ট এতই বিব্রত হয়ে পড়ল যে কোনো কিছু না ভেবেই প্রথম যে জবাবটা মাথায় এল সেটাই বলে ফেলল। এ ব্যাপারে তুমি যে পাকা ব্যবসায়ীর মতো কথা বলেছ তাতে আমি খুশি হয়েছি…এটাই আমি পছন্দ করি। তুমি যাতে সন্তুষ্ট হও তাই…
আলোচনায় ইতি টানবার ইচ্ছায় বের্গের পিঠটা চাপড়ে দিয়ে কাউন্ট উঠে পড়ল। বের্গ কিন্তু স্মিত হাসির সঙ্গে বলল, ভেরা কতটা কি পাবে সেটা নিশ্চিত করে না জানতে পারলে এবং যৌতুকের একটা অংশ আগাম না পেলে আমাকে হয়তো সমস্ত ব্যবস্থাটাই ভেঙে দিতে হবে। কারণ, ভেবে দেখুন কাউন্ট, স্ত্রীর ভরণপোষণের যথেষ্ট ব্যবস্থা ছাড়াই আমি যদি এখন বিয়ে করে বসি তাহলে কাজটা খুবই খারাপ হবে
কাউন্ট আর কথা না বাড়িয়ে জানিয়ে দিল যে আশি হাজার রুবলের একটা হ্যান্ড-নোট সে দেবে। বের্গ বিনীতভাবে হেসে কাউন্টের কাঁধে চুমো খেয়ে জানাল যে সে খুবই কৃতজ্ঞ বোধ করছে, কিন্তু তিরিশ হাজার নগদে না পেলে তার পক্ষে নতুন জীবনযাত্রার ব্যবস্থা করা অসম্ভব। তারপর বলল, অন্তত বিশ হাজার কাউন্ট, আর পরে মাত্র ষাট হাজারের হ্যান্ড-নোট।
কাউন্ট তাড়াতাড়ি বলল, হ্যাঁ, হ্যাঁ, ঠিক আছে। শুধু আমাকে ক্ষমা কর বাবা, আমি তোমাকে বিশ হাজারও দেব, আবার আশি হাজারের হ্যান্ড-নোটও দেব। হ্যাঁ, হ্যাঁ, আমাকে চুমো খাও!
.
অধ্যায়-১২
নাতাশার বয়স এখন ষোল, আর এটা সেই ১৮০৯ সাল, চার বছর আগে পরস্পরকে চুমো খাবার পর থেকে যে বছরটার জন্য বরিসের সঙ্গে সেও আঙুল গুনে চলেছে। সেই থেকে সে একদিনের জন্যও বরিসকে দেখেনি। সোনিয়াও তার মার সামনে কথাপ্রসঙ্গে বরিসের নাম উঠলে সে এমন সহভাবে সে সম্পর্কে কথা বলে যেন সেটা একটা অনেকদিন আগে ভুলে-যাওয়া ছেলেমানুষী ব্যাপার, সেটাকে মনে করে রাখার কোনো মানেই হয় না। কিন্তু বরিসের সেই বিয়ের প্রস্তাব একটা ঠাট্টামাত্র, না কি একটা গুরুতর প্রতিশ্রুতি এই প্রশ্ন মনের গভীর গহনে তাকে অনবরত যন্ত্রণা দিয়ে চলেছে।
