স্বপ্নে দেখলাম আমি অন্ধকারে হাঁটছি, হঠাৎ একদল কুকুর আমাকে ঘিরে ধরল, কিন্তু কোনোরকম ভয় না পেয়ে আমি চলতে লাগলাম। হঠাৎ একটা ছোটখাট কুকুর দাঁত দিয়ে আমার বাঁ উরুটা কামড়ে ধরল, কিছুতেই ছাড়ল না। দুই হাতে সেটার গলা টিপে ধরলাম। সেটাকে ছাড়িয়ে দিতে না দিতেই বড় গোছের আর একটা কুকুর আমাকে কামড়াতে শুরু করল। সেটাকে তুলে ধরলাম, কিন্তু যত উপরে তুলি সেটা ততই বড় আর ভারি হয়ে উঠতে লাগল। হঠাৎ ভাই এ. এসে আমার হাত ধরে একটা পাকা বাড়িতে নিয়ে চলল। সে বাড়িতে ঢুকবার মুখে আমাদের একটা সরু তক্তার উপর দিয়ে যেতে হল। সেটার উপর পা দিতেই তক্তাটা বেঁকে ভেঙে গেল, আমি একটা বেড়া বেয়ে উঠতে চেষ্টা করলাম, কিন্তু হাত বাড়িয়ে কিছুতেই যেন তার নাগাল পেলাম না। অনেক চেষ্টা করে নিজেকে টেনে তুললাম, আমার পা দুটো ঝুলে রইল একদিকে আর শরীরটা রইল অন্যদিকে। ফিরে তাকিয়ে দেখলাম ভাই এ. বেড়াটার উপর দাঁড়িয়ে আছে, আর আঙুল দিয়ে বাইরে একটা চওড়া রাজপথ ও বাগান দেখাচ্ছে, সেই বাগানে রয়েছে একটা সুন্দর বড় বাড়ি। ঘুম ভেঙে গেল। হে প্রভু, হে প্রকৃতির মহান রূপকার, এই কুকুরগুলোর-এই সব কামনা-বাসনার হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে আমাকে সাহায্য কর, বিশেষ করে এই শেষ কুকুরটির হাত থেকে যার মধ্যে আগেকার অন্য সবগুলির শক্তি একত্রিত হয়েছে, স্বপ্নের মধ্যে যে ধর্ম-মন্দিরের ছবি আমি দেখেছি সেখানে ঢুকতে আমাকে সাহায্য কর।
৭ ডিসেম্বর।
স্বপ্ন দেখলাম জোসেফ আলেক্সিভিচ আমার বাড়িতে বসে আছেন, আর আমি খুশি হয়ে তাঁকে আপ্যায়িত করতে চাইছি। মনে হল, আমি যেন অন্য সকলের সঙ্গে অবিশ্রাম বকে চলেছি আর হঠাৎ মনে পড়ে গেল যে এতে উনি খুশি হবেন না, আমার ইচ্ছা হল তার আরো কাছে যাই, তাঁকে আলিঙ্গন করি। কিন্তু কাছে যেতেই দেখলাম তার মুখটা বদলে গিয়ে যুবকের মতো হয়ে গেল, আমাদের সংঘের শিক্ষা সম্পর্কে তিনি শান্তভাবে কিছু বলতে লাগলেন, কিন্তু এত আস্তে বললেন যে আমি কিছুই শুনতে পেলাম না। তারপরেই মনে হল যেন আমরা সকলেই ঘর থেকে চলে গেলাম এবং একটা আশ্চর্য কিছু ঘটল। আমরা মেঝেতে শুয়ে বা বসে আছি। তিনি যেন আমাকে কিছু বলছেন, আর আমি চাইছি আমার বোধশক্তি তাকে দেখাতে, তাঁর কথায় কান না দিয়ে আমার ভিতরকার মানুষটার কথা এবং ঈশ্বরের আশীর্বাদে, তাঁর পুতঃ হবার কথাই আমি ভাবতে লাগলাম। আমার চোখে জল এল, আর সেটা তার নজরে পড়ায় আমি খুশি হলাম। কিন্তু বিরক্তিভরা দৃষ্টিতে আমার দিকেই তাকিয়ে তিনি লাফ দিলেন, তার কথায় ছেদ পড়ল। আমি লজ্জা পেয়ে জানতে চাইলাম তিনি আমার ব্যাপারে কিছু বলছিলেন কি না। কিন্তু তিনি জবাব দিলেন না, সদয় দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালেন, তারপরেই হঠাৎ দেখলাম আমরা রয়েছি আমার শোবার ঘরে, আর সেখানে একটি দুইজনের মতো বিছানা পাতা আছে। তিনি বিছানার এক প্রান্তে শুয়ে পড়লেন, আর তাকে আদর করবার জ্বলন্ত বাসনায় আমিও শুয়ে পড়লাম। আর তিনি বললেন, আমাকে খোলাখুলি বল তো কি তোমার প্রধান প্রলোভন? তা কি তুমি জান? আমি মনে করি তুমি তা জান। এ প্রশ্নে লজ্জা পেয়ে বললাম, আলস্যই আমার প্রধান প্রলোভন। তিনি অবিশ্বাসের ভঙ্গিতে মাথা নাড়লেন, আরো লজ্জা পেয়ে বললাম, তার পরামর্শমতো আমার স্ত্রীর সঙ্গে বাস করলেও আমি তার সঙ্গে স্বামীর মতো বাস করছি না। এতে তিনি বললেন, স্ত্রীকে আলিঙ্গন থেকে বঞ্চিত করা উচিত নয়, তিনি আমাকে বোঝালেন যে সেটাই আমার কর্তব্য। কিন্তু আমি জবাব দিলাম যে সেকাজ করতে আমার লজ্জা হওয়া উচিত, আর সহসা সব কিছু অদৃশ্য হয়ে গেল। আমারও ঘুম ভেঙে গেল, মনে পড়ল। সুসমাচারের পাঠ : জীবনই মানুষের আলোকস্বরূপ। সে আলো অন্ধকারে কিরণ দেয়, অন্ধকার তাকে ঢেকে দিতে পারে না। জোসেফ আলেক্সিভিচের মুখখানা আরো যুবকের মতো উজ্জ্বল দেখাতে লাগল। সেইদিনই আমার হিতকারির কাছ থেকে একটা চিঠি পেলাম, তাতে তিনি দাম্পত্য কর্তব্যের কথা লিখেছেন।
৯ ডিসেম্বর।
একটা স্বপ্ন দেখে যখন ঘুম ভেঙে গেল তখন বুকটা টিপটিপ করছিল। দেখলাম, আমি রয়েছি মস্কোতে নিজের বাড়িতে, বড় বসবার ঘরটাতে, আর জোসেফ আলেক্সিভিচ বেরিয়ে এলেন বৈঠকখানার ঘর থেকে। মনে হল, আমি যেন সেইমুহূর্তে জেনে ফেলেছি যে তার মধ্যে পুনর্জন্মের কাজ শুরু হয়ে গেছে, তার দিকে ছুটে গেলাম। তাকে আলিঙ্গন করলাম, হাত দুটিতে চুমো খেলাম, তিনি বললেন, তুমি কি লক্ষ্য করেছ যে আমার মুখটা বদলে গেছে? তখনো তাকে জড়িয়ে ধরেই ছিলাম, মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলাম তাঁর মুখটা একজন যুবকের, কিন্তু তার মাথায় চুল নেই, আর মুখটা সম্পূর্ণ বদলে গেছে। আমি বললাম, হঠাৎ দেখা হয়ে গেলেও আপনাকে আমি চিনতে পারতাম, নিজের মনে ভাবলাম, আমি কি সত্য কথা বলছি আর সহসা দেখলাম তিনি একজন মরা মানুষের মতো শুয়ে আছেন, তারপর ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে আমার সঙ্গে আমার পড়ার ঘরে গেলেন, আঁকার কাগজের একটা বড় বই তাঁর হাতে। বললাম, ওগুলো আমি একেছি, মাথাটা নুইয়ে তিনি জবাব দিলেন। বইটা খুললাম, সবগুলো পাতায়ই চমৎকার সব আঁকা।
আমার স্বপ্ন থেকেই জেনেছিলাম, প্রিয়তমার সঙ্গে আত্মার ভালোবাসার অভিযান নিয়েই ছবিগুলি আঁকা। পাতায় পাতায় দেখতে পেলাম, স্বচ্ছ দেহকে স্বচ্ছ পোশাকে আবৃত করে আকাশে উড়ে-চলা একটি নারীর সুন্দর প্রতিকৃতি। আর আমার যেন মনে হল এটা পরমা সঙ্গীতের প্রতিকৃতি ছাড়া আর কিছু নয়। সেই ছবিগুলির দিকে তাকিয়ে স্বপ্নের মধ্যেও আমার মনে হল যে আমি অন্যায় করছি, কিন্তু সেগুলির উপর থেকে চোখ সরিয়ে নিতে পারলাম না। প্রভু, আমার সহায় হও! ঈশ্বর আমার, আমাকে পরিত্যাগ করাই যদি তোমার কাজ হয় তো তোমার ইচ্ছাই পূর্ণ হোক, কিন্তু আমি নিজে যদি এর কারণ হই তাহলে আমাকে বলে দাও করবে!
