ভালুকটাকে ধরে দুই হাতে তুলে সে সারা ঘরে নাচতে শুরু করল।
*
অধ্যায় ১০
আন্না পাভলভনার নৈশভোজের দিন প্রিন্সেস দ্রবেস্কায়া তার একমাত্র ছেলে বরিসের জন্য অনুরোধ জানালে প্রিন্স ভাসিলি তাকে যে কথা দিয়েছিল সে-কথা সে রেখেছে। ব্যতিক্রম হিসেবেই ব্যাপারটা সম্রাটের গোচরে আনা হয়েছিল। এবং কর্নেলের পদমর্যাদাসহ বরিসকে সেমেনভ রক্ষীবাহিনীতে বদলি করা হয়েছে। তবে আন্না মিখায়লভনার সব চেষ্টা ও অনুরোধ সত্ত্বেও সে কুতুজভের অধীনে চাকরি পায়নি। আন্না পাভলভনার বাড়ির আসরের কিছু পরেই আন্না মিখায়লভনা মস্কোতে ফিরে সোজা চলে এসেছে তার ধনী আত্মীয় রস্তভদের বাড়ি। শহরে এলে সে এই বাড়িতেই থাকে এবং তার আদরের বরিসও ছেলেবেলা থেকে এখানেই লেখাপড়া শিখেছে এবং বছরের পর বছর থেকেছে। রক্ষীবাহিনী ১০ আগস্ট তারিখে পিটার্সবুর্গ ছেড়ে চলে গেছে; তার ছেলেটি সাজপোশাকের জন্য এখনো মস্কোতেই আছে; সীমান্ত শহর বাদজিভিলভে সে তার বাহিনীর সঙ্গে যোগ দেবে।
সে দিনটি সেন্ট নাতালিয়া দিবস। আবার রস্ত পরিবারের মা ও কনিষ্ঠা কন্যা দুজনেরই নামকরণ দিবসও বটে; দুজনেরই নাম নাতালি। সকাল থেকেই ছয়-ঘোড়ার গাড়ির অবিরাম আসা-যাওয়া চলেছে। পোভাস্কায়াতে অবস্থিত ও মস্কোতে সুপরিচিত কাউন্টেস রস্তভের বড় বাড়িটাতে অতিথির ভিড় জমে চলেছে। যে-সব অতিথি একের পর এক পালা করে এসে অভিনন্দন জানাচ্ছে তাদের অভ্যর্থনা করবার জন্য কাউন্টেস স্বয়ং ও তার সুন্দরী বড় মেয়ে বসার ঘরেই অপেক্ষা করছে।
কাউন্টেসের বয়স বছর পঁয়তাল্লিশ, পাতলা প্রাচ্যদেশীয় মুখ, সন্তানধারণের জন্য ভগ্নস্বাস্থ্য–তার সন্তানসংখ্যা বারো। দুর্বলতার দরুন তার চলনে ও কথা বলার ধরনে এমন একটা অবসাদ ফুটে উঠে যার ফলে তার প্রতি একটা শ্রদ্ধার ভাব স্বভাবতই সকলের মধ্যে জেগে ওঠে। এই পরিবারেরই একজন হিসেবে প্রিন্সেস আন্না মিখায়লভনা বেঙ্কায়াও বসার ঘরে হাজির থেকে অতিথিদের অভ্যর্থনা ও আপ্যায়নের কাজে সাহায্য করছে। ছোট ছেলেমেয়েরা রয়েছে ভিতরের ঘরে; অতিথি-আপ্যায়নের কাজে তাদের কোনো প্রয়োজন নেই। কাউন্ট নিজে অতিথিদের সঙ্গে দেখা করে সকলকেই ডিনারের আমন্ত্রণ জানিয়ে বিদায় করছে।
প্রিয় বন্ধু বা প্রিয় বান্ধবী, আপনার কাছে আমি খুব, খুব কৃতজ্ঞ-অতিথিরা পদমর্যাদায় তার ছোট হোক কি বড় হোক, কোনোরকম ব্যতিক্রম না করে সকলকেই সে প্রিয় বলে সম্বোধন করছে-আমার নিজের পক্ষ থেকে এবং আমার যে দুটি প্রিয়জনের নামকরণ-দিবস আমরা পালন করছি তাদের পক্ষ থেকে আমি আপনাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। কিন্তু মনে রাখবেন, ডিনারে আসা চাই, নইলে আমি অসন্তুষ্ট হব, প্রিয় বান্ধবী! গোটা পরিবারের পক্ষ থেকে আপনাকে আসতে বলছি, প্রিয় বন্ধু! এই একই কথা সে প্রত্যেককে বলছে, কারো বেলায় কোনো রকম হেরফের হচ্ছে না; তার পরিষ্কার কামানো হাসিমাখা মুখে একই ভাব, হাতের একই সুদৃঢ় চাপ, আর একই ভাবে বার বার মাথা নোয়ানো। কোনো অতিথিকে বিদায় দিয়ে ফিরে এসেই বসবার ঘরে অপেক্ষমান অতিথিদের একজনের কাছে এসে তার দিকে চেয়ারটা টেনে নিয়ে বসছে, পা দুটোকে ছড়িয়ে হাঁটুর উপর এমনভাবে হাত রাখছে যাতে বোঝানো যায় যে জীবনকে সে ভোগ করছে এবং কেমন করে বাঁচতে হয় তা সে জানে; তারপর মর্যাদার সঙ্গে শরীরটাকে সামনে-পিছনে একটু দোলাচ্ছে, আবহাওয়া সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করছে, অথবা স্বাস্থ্য সম্পর্কে দু-একটা কথা বলছে, কখনো রুশ ভাষায়, আবার কখনো বা অত্যন্ত খারাপ অথচ আত্মবিশ্বাসে ভরা ফরাসি ভাষায়, তারপর আবার ক্লান্ত অথচ কর্তব্যপালনে। দৃঢ়চিত্ত মানুষের মতো আর একজন অতিথিকে বিদায় দিতে উঠে দাঁড়াচ্ছে এবং টাক মাথার উপর যৎসামান্য পাকা চুল চাপড়ে বসাতে বসাতে তাকে ডিনারে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে। কখনো বা সামনের ঘর থেকে ফিরবার পথে ভঁড়ার ঘর ও রান্নাঘরের ভিতর দিয়ে শ্বেত পাথরের মস্ত বড় খাবার ঘরে ঢুকছে; সেখানে আমি জন অতিথির জন্য টেবিল পাতা হচ্ছে; পরিচারকরা রুপোর ও চীনেমাটির বাসনপত্র আনছে, টেবিল সরাচ্ছে, দামাস্কাসের টেবিল-ঢাকনা বিছিয়ে দিচ্ছে। সেইসব দেখতে দেখতে সে দিমিত্রি ভাসিলোভিচকে ডেকে পাঠাচ্ছে; লোকটি সদ্বংশজাত এবং তার সমস্ত বিষয়সম্পত্তির ম্যানেজার। খুশিমনে প্রকাণ্ড টেবিলটার দিকে তাকিয়ে বলছে : দেখ দিমিত্রি, যেমন-যেমন হওয়া উচিত সবকিছু যেন ঠিক তেমনটি হয়। ঠিক আছে! আসল কথাই তো পরিবেশন, তাই বটে। তারপর খুশির নিঃশ্বাস ফেলে সে বসবার ঘরে ফিরে আসছে।
কাউন্টেসের বিশালবপু পরিচারক বসবার ঘরে ঢুকে গম্ভীর গলায় হাঁক দিল, মরিয়া লভভনা কারাপিনা ও তাঁর কন্যা! কাউন্টেস এক মুহূর্ত ভাবল, তারপর স্বামীর প্রতিকৃতি আঁকা সোনার নস্যদানি থেকে এক টিপ নস্য নিল।
অতিথির জ্বালায় ব্যতিব্যস্ত হয়ে গেলাম। যাই হোক, শুধু এই মহিলার সঙ্গেই দেখা করব, আর নয়। মহিলাটি এত ভণিতা জানেন। তাঁকে ভিতরে আসতে বল, এমন বিষণ্ণ সুরে পরিচারককে হুকুম করল যেন বলতে চাইল : খুব ভালো কথা, আমাকে শেষ করে ফেল।
একটি লম্বা-চওড়া, শক্ত-সমর্থ, গর্বিত-মুখ স্ত্রীলোক একটি গোলমুখ হাস্যময়ী মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে পোশাকের খসখস শব্দ তুলে বসবার ঘরে প্রবেশ করল।
