পিয়ের নিজেকে বোঝায়, না, সে এখন বিদূষী হয়ে উঠেছে, কাজেই আগেকার সব মোহই সে কাটিয়ে উঠেছে। বিদূষী মহিলারা হৃদয়ঘটিত ব্যাপারে গা ভাসিয়েছে এরকম কোনো দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় না। অথচ কী আশ্চর্য, বরিস তার স্ত্রীর বসবার ঘরে হাজির হলেই (এবং সে হাজিরা প্রায় সব সময়ই চলে) পিয়েরের শরীরটাই যেন কেমন হয়ে যায়, অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলি কেমন সংকুচিত হয়ে ওঠে, তার চলাফেরার অচেতন স্বাধীনতা নষ্ট হয়ে যায়।
পিয়ের ভাবে, কী আশ্চর্য বিরূপতা, অথচ একসময় বরিসকে কত ভালোবাসতাম।
পৃথিবীর চোখে পিয়ের একজন বিশিষ্ট ভদ্রলোক, এক বিশিষ্ট স্ত্রীর অন্ধ ও অবুঝ স্বামী, এমন একটি খেয়ালি মানুষ যে কিছুই করে না, কারো ক্ষতিও করে না, প্রথম শ্রেণীর একজন ভালোমানুষ। কিন্তু পিয়েরের মনের মধ্যে সারাক্ষণই আভ্যন্তরীণ অগ্রগতির এমন একটা জটিল ও কঠিন কাজ চলতে লাগল যাতে অনেককিছুই তার কাছে প্রকাশ হয়ে পড়ল, আর তার ফলে অনেক আত্মিক সংশয় ও আনন্দ তার মধ্যে দেখা দিল।
.
অধ্যায়-১০
পিয়েরের দিনপঞ্জি লেখা চলতেই থাকল, এই সময়ে সে লিখল :
২৪শে নভেম্বর।
আটটায় ঘুম থেকে উঠলাম, ধর্ম-পুস্তক পড়লাম, তারপর কাজে গেলাম। জোসেফ আলেক্সিভিচের পরামর্শক্রমে পিয়ের সরকারি চাকরিতে ঢুকেছে এবং একটা কমিটিতে কাজ করছে।) খাওয়ার জন্য বাড়ি ফিরে একাই খেলাম-কাউন্টেসের এমন সব অতিথি ছিল যাদের আমি পছন্দ করি না। নিয়মমতো পান ভোজন সেরে গুরুভাইদের জন্য কয়েকটি অনুচ্ছেদ লিখলাম। সন্ধ্যায় কাউন্টেসের কাছে গিয়ে বি. সম্পর্কে একটা মজার গল্প বললাম, আর তা শুনে সকলেই যখন হো-হো করে হেসে উঠল একমাত্র তখনই মনে পড়ল যে কাজটা করা উচিত হয়নি।
শান্ত সুখী মন নিয়ে শুতে চলেছি। মহান ঈশ্বর, তোমার পথে চলতে আমাকে সাহায্য কর, (১) প্রশান্তি ও সুবিবেচনার দ্বারা ক্রোধকে জয় করতে, (২) আত্মসংযম ও প্রতিরোধের দ্বারা কামনাকে পরাভূত করতে, (৩) সংসার থেকে দূরে সরে থাকতে, কিন্তু (ক) রাষ্ট্রের সেবা, (খ) পারিবারিক কর্তব্য, (গ) বন্ধুদের সঙ্গে সম্পর্ক, এবং (ঘ) নিজের কাজকর্মের ব্যবস্থাকে পরিহার না করতে।
২৭শে নভেম্বর।
অনেক দেরিতে উঠেছি। ঘুম থেকে জেগেও আলস্যবশত অনেকক্ষণ বিছানায় শুয়েছিলাম। হে ঈশ্বর, তোমার পথে চলতে আমাকে সাহায্য কর, শক্তি দাও। ধর্ম-পুস্তক পড়লাম, কিন্তু মনে ভাব জাগল না। ভাই উরুসভ এসে পার্থিব বিষয়ের কথা বলতে লাগল। ম্রাটের নতুন প্রকল্পের কথা বলল। আমি সেগুলির সমালোচনা করতে লাগলাম। আমার জিবাই আমার শক্র। ভাই জি. ভি. এবং ও, আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল। একটি নতুন ভাইকে স্বাগত জানাবার ব্যাপারে প্রাথমিক আলোচনা হল। আমার উপর তারা দীক্ষার কাজটা চাপিয়ে দিল। নিজেকে বড়ই দুর্বল ও অক্ষম মনে হয়। তারপরেই শুরু হল মন্দিরের সাতটি স্তম্ভ ও সাতটি সিঁড়ির ধাপ, সাত বিজ্ঞান, সাত সদগুণ, সাত পাপ, এবং পবিত্র আত্মার সাত দানের ব্যাখ্যা নিয়ে আলোচনা। ভাইও খুব ভালো বলতে পারেন। সন্ধ্যায় স্বাগত-অনুষ্ঠানটি হল। বরিস বেক্ষয়কে সংঘে নেওয়া হল। আমি তাকে মনোনীত করে দীক্ষা দিলাম। একটা অন্ধকার ঘরে যখন তাকে নিয়ে আমি একা ছিলাম তখন একটা অদ্ভুত অনুভূতি আমাকে তোলপাড় করে তুলল। তার প্রতি একটা ঘৃণার ভাব আমার মনের মধ্যে জমে আছে বুঝতে পেরে সেটাকে দূর করতে সচেষ্ট হলাম। আমার মনে হল, আশ্রমের সদস্যদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হবার এবং তাদের করুণা পাবার জন্যই বরিস সংঘে প্রবেশ করতে এসেছে। কিন্তু মুখ ফুটে সেকথা তাকেও বলতে পারলাম না, গুরুভাইদের এবং মহাপ্রভুকেও বলতে পারলাম না। প্রকৃতির মহান রূপকার, মিথ্যার গোলকধাঁধা থেকে বের হবার সত্য পথ আবিষ্কার করতে সাহায্য কর!
৩রা ডিসেম্বর।
দেরিতে ঘুম ভেঙেছে, ধর্মগ্রন্থ পড়েছি, কিন্তু সেদিকে মন যায়নি। তারপর বড় হলটায় গিয়ে পায়চারি করেছি। ইচ্ছা হল ধ্যানে বসি, কিন্তু তার পরিবর্তে কল্পনায় ভেসে উঠল চার বছর আগেকার একটি ঘটনার ছবি : দ্বৈরথের পরে মস্কোতে আমার সঙ্গে দেখা করে দলখভ বলেছিল, আমার স্ত্রীর অনুপস্থিতি সত্ত্বেও আমি বেশ খোশমেজাজে আছি বলেই সে আশা করছে। তখন তাকে কোনো জবাব দেইনি। এখন সেই সাক্ষাৎকারের প্রতিটি বিবরণ আমার মনে পড়ল-মনে মনে অনেক বিদ্বেষপূর্ণ তিক্ত জবাব তাকে দিয়েছিলাম। যখন দেখলাম আমার ভিতরটা রাগে জ্বলছে তখনই নিজেকে সংযত করে সে চিন্তাকে মন থেকে তাড়িয়ে দিলাম। তারপর বরিস দ্রবেষ্কয় এসে নানা অভিযানের কথা বলতে লাগল। গোড়া থেকেই তার আসায় আমি বিরক্তিবোধ করছিলাম, কিছু অপ্রীতিকর কথাও তাকে বললাম। সে জবাব দিল। আমিও জ্বলে উঠলাম, এমনকিছু বললাম যা তার পক্ষে অপ্রীতিকর, এমন কি রূঢ়। সে চুপ করে রইল, আমিও নিজেকে সংযত করলাম। কিন্তু তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। হে ঈশ্বর, আমি তার সঙ্গে চলতেই পারছি না। এর কারণ আমার অহংবোধ। নিজেকে তার উপরে বসাই বলেই তার চাইতে এত ছোট হয়ে যাই, কারণ আমার রূঢ়তার প্রতি সে উদার, আর তার প্রতি আমি পোষণ করি ঘৃণা। হে ঈশ্বর, তার সামনে আমি যাতে আমার নিচতাকে বুঝতে পারি, যাতে আমার আচরণে তারও কল্যাণ হয় সেই ব্যবস্থাই কর। আহারের পরে ঘুমিয়ে পড়লাম, আর ঘুমের মধ্যেই স্পষ্ট শুনতে পেলাম কে যেন আমার বাঁ কানে বলছে, তোমার দিন!
