পিটার্সবুর্গ, ২৩শে নভেম্বর।
আবার আমি স্ত্রীর সঙ্গে বাস করছি। শাশুড়ি আমার কাছে এসে চোখের জল ফেলতে ফেলতে বললেন হেলেন এখানে এসেছে, সে মিনতি জানিয়েছে আমি যেন তার কথাগুলি শুনি, সে নির্দোষ, সে দুঃখী, আরো অনেক কথা। আমি জানতাম একবার যদি তাকে আমার সঙ্গে দেখা করতে দেই তাহলে তাকে ফিরিয়ে দেবার শক্তি আমার হবে না। এই বিপদে কার কাছে সাহায্য চাইব, পরামর্শ চাইব তাও বুঝতে পারিনি। আমার হিতকারী যদি এখানে থাকতেন তাহলে তিনিই আমাকে বলে দিতেন কি করতে হবে। আমার ঘরে ঢুকে জোসেফ আলেক্সিতীচের চিঠিগুলি আর একবার পড়লাম, তার সঙ্গে যা কথা হয়েছিল সেগুলি স্মরণ করলাম, আর তা থেকে এই সিদ্ধান্ত করলাম, যে মানুষ সবিনয়ে প্রার্থনা জানাচ্ছে তাকে ফিরিয়ে দেওয়া উচিত হবে না, প্রত্যেকের প্রতি সাহায্যের হাত প্রসারিত করাই আমার কর্তব্য-বিশেষ করে যে আমার সঙ্গে এমন ঘনিষ্ঠ বাঁধনে বাঁধা–আমার কুশ আমাকে বহন করতেই হবে। কিন্তু ঠিক কাজ করার খাতিরে তাকে যদি ক্ষমাই করি, তাহলে আত্মিক উদ্দেশ্যে তার সঙ্গে মিলনও হোক। এই সিদ্ধান্ত করে জোসেফ আলেক্সিভিচকেও তাই জানিয়ে দিলাম। স্ত্রীকে বললাম, সে যেন অতীতকে ভুলে যায়, তার প্রতি যদি কোনো অন্যায় করে থাকি তাহলে সে যেন আমাকে ক্ষমা করে, আর আমার ক্ষমা করার কিছুই নেই। তাকে একথা বলতে পেরে আনন্দ পেলাম। তার সঙ্গে আবার দেখা করা যে আমার পক্ষে কত কঠিন সেটা আর তার জানার দরকার নেই। এই বড় বাড়িটার দোতলাতেই আমি বাসা নিয়েছি, লাভ করেছি নবজন্মের এক সুখের অনুভূতি।
.
অধ্যায়-৯
যেমন সর্বদাই ঘটে থাকে, সেই সময়ই দরবারে সমবেত সর্বোচ্চ মহলে এবং বড় বড় বল নাচের আসরে সকলেই যার যার নিজস্ব মেজাজে ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে বসতে লাগল। তার মধ্যে আবার সবচাইতে বড় দলটি ছিল নেপোলিয়ন-অনুরাগী ফরাসি দলটি, অর্থাৎ কাউন্ট রুমিয়ান্তসেভ ও কলাইকুর্তের দল। স্বামীকে নিয়ে পিটার্সবুর্গে বসবাস শুরু করেই হেলেনও এই দলের একজন চাই হয়ে উঠল। ফরাসি দূতাবাসের সদস্যবর্গ এবং বুদ্ধি ও পরিচ্ছন্ন আচার-আচরণের জন্য সুপ্রসিদ্ধ ঐ মহলের অনেকেই সবসময় তার কাছে আসা-যাওয়া শুরু করে দিল।
দুই সম্রাটের বিখ্যাত সাক্ষাৎকারের সময় হেলেন এরফুর্তেই ছিল, এবং নেপোলিয়ন-অনুরাগী বিশিষ্ট লোকদের সঙ্গে সেখানেই তার যোগাযোগ ঘটেছিল। এরফুর্তে সে খুবই সাফল্য লাভ করেছিল। থিয়েটারে স্বয়ং নেপোলিয়নের নজরে সে পড়েছিল, তার সম্পর্কে নেপোলিয়ন বলেছিল : Cest un superbe ani mal. (ঐ একটি অপূর্ব জীব)। সুন্দরী রুচিসম্পন্না নারী হিসেবে তার এই সাফল্যে পিয়ের অবাক হয়নি, কারণ সে এখন আগের চাইতেও বেশি সুন্দরী হয়েছে। সে অবাক হয়েছে এটা লক্ষ্য করে যে এই বিগত দুই বছরে তার স্ত্রী যেমন বুদ্ধিমতী তেমনই সুন্দরী একটি মনোরমা নারী হবার সুখ্যাতি অর্জন করতে পেরেছে। বিশিষ্ট প্রিন্স দ্য লিগনে তাকে আট-পাতা চিঠি লিখেছে। বিলিবিন তার সরস কবিতাগুলি জমিয়ে রেখেছে কাউন্টেস বেজুখভের সামনে উপস্থিত করবে বলে। কাউন্টেস বেজুখভের দরবারে উপস্থিত হতে পারাটাকেই বুদ্ধির তকমা হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। তার দরবারে যাতে কিছু বলা যায় সেই উদ্দেশ্যে হেলেনের সান্ধ্য বাসরে যোগ দেবার আগে যুবকরা পুঁথিপত্র পড়ে নেয়। দূতাবাসের সচিবরা, এমন কি রাষ্ট্রদূতরা পর্যন্ত কূটনৈতিক গোপন কথা হেলেনকে বিশ্বাস করে বলে দেয়। কাজেই হেলেন একটা শক্তি-কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। স্ত্রীর বোকামির কথা পিয়ের জানে, তাই স্ত্রীর সান্ধ্য বাসরে এবং ডিনার-পার্টিতে যখন রাজনীতি, কাব্য ও দর্শনের আলোচনা চলে তখন পিয়ের ভয় ও সংশয়ের একটা বিচিত্র মিশ্র অনুভূতি নিয়ে কখনো কখনো সেখানে উপস্থিত থাকে। একজন যাদুকর যখন আশংকা করে যে তার কলা-কৌশল যেকোন মুহূর্তে ধরা পড়ে যেতে পারে তখন তার যেরকম মনের অবস্থা হয় ঠিক সেই মনের অবস্থা নিয়েই পিয়ের ঐ সব পার্টিতে যোগ দেয়। কিন্তু যে কারণেই হোক হেলেন ধরা পড়ে না, বরং মনোরমা এক চতুর নারী হিসেবে হেলেন বেজুখভের সুখ্যাতি এতই সুপ্রতিষ্ঠিত হয়ে পড়ল যে তার অত্যন্ত ফাঁকা ও বোকা-বোকা বুলি শুনেও তার প্রতিটি কথায়ই সকলে উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে এবং সেগুলির এমন সব গভীর তাৎপর্য খুঁজতে থাকে যার তিলমাত্র ধারণাও তার নিজের মনে কখনো ছিল না।
পিয়ের এখন উঁচু মহলের একটি মহিলার পক্ষে প্রয়োজনীয় স্বামীমাত্র। সে একজন উদাসীন খেয়ালি মানুষ, এমন একটি পরম মহাশয় স্বামী যে কারো সাতে-পাঁচে থাকে না, বসবার ঘরের উচ্চগ্রামের ভাবস্রোতকে ক্ষুণ্ণ করে না, সুন্দরী ও কুশলী স্ত্রীর সুবিধাজনক পশ্চাৎপট হয়ে থাকাই তার একমাত্র কাজ। লোকে যেভাবে থিয়েটারে ঢোকে, সেও সেইভাবেই খ্রীর বসবার ঘরে ঢোকে, সকলের সঙ্গে আলাপ-পরিচয় করে, সকলকে দেখেই সমান খুশি হয়, আর সকলের প্রতিই সমান উদাসীন। পিটার্সবুর্গের অত্যন্ত বিশিষ্ট এই মহিলাটির বিচিত্র স্বামী হিসেবে তার পরিচয় এতদূর প্রতিষ্ঠা পেয়েছে যে তার এই খামখেয়ালিপনা কেউই বিশেষ গুরুত্ব দেয় না।
যেসব যুবক প্রায়ই হেলেনের বাড়িতে হানা দেয় তাদের মধ্যে সামরিক চাকরিতে সুপ্রতিষ্ঠিত বরিস বেস্কয়ই এখন বেজুখভ-পরিবারের সবচাইতে ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়ে উঠেছে। হেলেন তাকে বলে প্রিয় সেবক, তাকে দেখে শিশুর মতো। সকলের জন্যই সে একই হাসি হাসে, তবু হেলেন যখন বরিসকে দেখে হাসে তখন পিয়ের অস্বস্তি বোধ করে। বরিসও পিয়েরকে একটা বিশেষ মর্যাদা ও শ্রদ্ধার চোখে দেখে। এই শ্রদ্ধার ভাবটাও পিয়েরকে বিরক্ত করে। তিন বছর আগে স্ত্রীর কাছ থেকে সে এত যন্ত্রণা ভোগ করেছে যে এখন সে যন্ত্রণার পুনরাবৃত্তি থেকে সে নিজেকে বাঁচিয়ে চলতে চায়, আর সেজন্য প্রথমত সে স্ত্রীর উপর স্বামীত্বের দাবি খাটায় না, দ্বিতীয়ত নিজের মনে কোনো সন্দেহকে বাসা বাঁধতে দেয় না।
