বক্তৃতাটি সকলকে যথেষ্ট প্রভাবিত তো করলই, উপরন্তু আশ্রমে যথেষ্ট উত্তেজনার সৃষ্টি হল। অধিকাংশ গুরুভাইরা এর মধ্যে অলৌকিকতার বিপদ দেখতে পেয়ে যেরকম নিরাসক্তভাবে কথাগুলি শুনল তাতে পিয়ের অবাক হয়ে গেল। মহাপ্রভু তাকে প্রশ্ন করতে শুরু করল, আর সেও অধিকতর উৎসাহের সঙ্গে তার মতবাদকে গড়ে তুলতে লাগল। এরকম বিক্ষুব্ধ সভা অনেককাল হয়নি। একদল পিয়েরের বিরুদ্ধে অলৌকিকতার অভিযোগ তুলল, আর একদল তাকে সমর্থন করল। সেই সভায় মানুষের মনের সীমাহীন বৈচিত্র্য লক্ষ্য করে পিয়েরের মনে এই প্রথম খুব আঘাত পেল, সে বুঝল, যেকোন দুইজন মানুষের কাছে সত্য একই স্বরূপে উপস্থিত হতে পারে না।
সভার শেষে প্রচণ্ড আবেগের জন্য মহাপ্রভু বেজুখভকে ব্যঙ্গাত্মক ভাষায় তিরস্কার করে বলল যে শুধুমাত্র ধর্মের প্রতি ভালোবাসার জন্য নয়, সগ্রামের প্রতি ভালোবাসাই তাকে এই বিতর্কের মধ্যে টেনে নামিয়েছে। পিয়ের তার কথার কোনো জবাব না দিয়ে সংক্ষেপে জানতে চাইল, তার প্রস্তাবটি গৃহীত হবে কি না। তাকে যখন বলা হল যে হবে না, তখন প্রথাগত অনুষ্ঠানের জন্য অপেক্ষা না করেই সে আশ্রম ছেড়ে বাড়ি চলে গেল।
.
অধ্যায়-৮
যে মানসিক অবসাদকে পিয়ের এত ভয় করে সেটাই তাকে আবার পেয়ে বসল। আশ্রমে বক্তৃতা দেবার পর তিন-তিনটে দিন বাড়িতে সোফায় শুয়ে কাটাল, কারো সঙ্গে দেখা করল না, বাইরে কোথাও গেল না।
ঠিক সেইসময় সে স্ত্রীর কাছ থেকে একটা চিঠি পেল, তার সঙ্গে দেখা করতে সে পিয়েরকে অনুরোধ করেছে, তার জন্য সে যে কত কষ্ট পাচ্ছে এবং সারা জীবন তার সেবা করবার তার যে কত ইচ্ছা সে-কথাও জানিয়েছেন সাত হাজার
চিঠির শেষে সে পিয়েরকে আরো জানিয়েছে, কয়েক দিনের মধ্যেই সে বিদেশ থেকে পিটার্সবুর্গে ফিরবে।
এই চিঠির পরে পরেই একজন গুরুভাই জোর করে তার সঙ্গে দেখা করতে এল। এই গুরুভাইটিকে সে মোটই ভক্তি-শ্রদ্ধা করত না। গুরুভাইটি পিয়েরের বৈবাহিক ব্যাপার নিয়ে আলোচনা শুরু করে ভাইয়ের প্রতি ভাইয়ের পরামর্শ প্রসঙ্গে বলল যে স্ত্রীর প্রতি এরূপ কঠোর আচরণ করে সে অন্যায় করেছে এবং অনুতপ্তা স্ত্রীকে ক্ষমা না করে সে ভ্রাতৃসংঘের অন্যতম প্রধান নির্দেশকেই লঙ্ঘন করেছে।
সেইসময়ে তার শাশুড়ি প্রিন্স ভাসিলির স্ত্রীও তাকে অনুরোধ করে পাঠাল। একটা অত্যন্ত গুরুতর ব্যাপারে আলোচনার জন্য সে যেন কয়েক মিনিটের জন্য হলেও একবার তার কাছে যায়। পিয়ের বুঝতে পারল, তার বিরুদ্ধে একটা ষড়যন্ত্র চলেছে, তারা চাইছে স্ত্রীর সঙ্গে তার পুনর্মিলন ঘটাতে, আর তখন তার যা মনের অবস্থা তাতে এটা তার কাছে খুব অপ্রীতিকরও নয়। তার তো কিছুতেই কিছু যায়-আসে না। এ জীবনে তার কাছে কোনো কিছুই খুব গুরুত্বপূর্ণ নয়, আর মানসিক অবসাদের প্রভাবে স্ত্রীকে শাস্তি দেবার জন্য সে তার স্বাধীনতা অথবা সংকল্প কোনোটাকেই খুব মূল্য দিল না।
ভাবল, কেউ সঠিক নয়, আর কারো দোষ নেই, কাজেই তার স্ত্রীকেও দোষ দেওয়া চলে না।
স্ত্রীর সঙ্গে পুনর্মিলনের স্বপক্ষে যে সে তখনই মত দিল না তার একমাত্র কারণ তার তখনকার অবসাদগ্রস্থ মানসিক অবস্থায় কোনো পদক্ষেপের শক্তিই তার ছিল না। স্ত্রী যদি তার কাছে এসে হাজির হতো তাহলে সে তাকে ফিরিয়ে দিত না। তখন তার মনের যা অবস্থা তাতে সে স্ত্রীর সঙ্গে বাস করছে কি করছে না সেটা কি খুবই তুচ্ছ ব্যাপার নয়? স্ত্রীর বা শাশুড়ির চিঠির কোনো জবাব না দিয়ে একদিন গভীর রাতে পিয়ের যাত্রার জন্য প্রস্তুত হল এবং জোসেফ আলেক্সিভিচের সঙ্গে দেখা করতে মস্কো রওনা হল। দিনপঞ্জির পাতায় লিখলঃ
মস্কো, ১৭ই নভেম্বর।
এইমাত্র আমার হিতকারীর কাছ থেকে ফিরেছি, সঙ্গে সঙ্গেই লিখতে বসেছি আমার অভিজ্ঞতার কথা। জোসেফ আলেক্সিভিচ দরিদ্রের মতো বাস করছেন, তিন বছর যাবৎ মূত্রাশয়ের একটা যন্ত্রণাদায়ক রোগে ভুগছেন। কিন্তু আজ পর্যন্ত কেউ তার মুখে একটা আর্তনাদ বা অভিযোগের বাণী শোনেনি। একমাত্র অতি সাধারণ খাদ্যটুকু গ্রহণ করার সময় ছাড়া সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তিনি বিজ্ঞানের কাজে ব্যস্ত থাকেন। তিনি আমাকে সাদরে গ্রহণ করলেন এবং যে বিছানায় শুয়েছিলেন তার উপরেই আমাকে বসালেন। প্রাচ্য দেশের ও জেরুজালেমের মহাবীরদের মতো ইঙ্গিত আমি করলাম, আর তিনিও সেইভাবেই জবাব দিলেন, মৃদু হেসে জানতে চাইলেন, প্রুশিয় ও স্কটিশ আশ্রমগুলিতে আমি কি শিখেছি, কি পেয়েছি। যথাসাধ্য সব তাঁকে বললাম, পিটার্সবুর্গের আশ্রমে কি প্রস্তাব রেখেছি, তাদের কাছ থেকে যে খারাপ ব্যবহার পেয়েছি এবং গুরুভাইদের সঙ্গে আমার মতবিরোধ–সবই তাঁকে জানালাম। বেশ কিছুক্ষণ নীরব ও চিন্তাবিত অবস্থায় থেকে জোসেফ আলেক্সিভিচ এ ব্যাপারে তার অভিমত আমাকে বললেন, আর তার ফলে আমার সমস্ত অতীত এবং ভবিষ্যতে যেপথে আমি চলব সব আমার সামনে জ্বলজ্বল করে উঠল। তিনি যখন আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন সংঘের ত্রিবিধ আদর্শ : (১) রহস্যের সংরক্ষণ ও অনুশীলন, (২) তাকে গ্রহণ করবার জন্য নিজের পরিশুদ্ধি ও সংস্কারসাধান এবং (৩) সেই পরিশুদ্ধির প্রচেষ্টার ভিতর দিয়ে মানবজাতির উন্নতি বিধান-এই আদর্শের কথা আমার মনে আছে কিনা, তখন আমি অবাক হয়ে গেলাম। এই তিনটির মধ্যে কোনটি প্রধান? অবশ্যই আত্ম সংস্কার ও আত্মশুদ্ধি। কেবলমাত্র সেই আদর্শের লক্ষ্যেই আমরা পরিস্থিতির নিরপেক্ষভাবে অগ্রসর হবার চেষ্টা করতে পারি। এদিক থেকে বিচার করে জোসেফ আলেক্সিভিচ আমার ভাষণ ও কাজকর্মের নিন্দা করলেন, আর অন্তরের গভীরে তার সঙ্গে আমি একমত হলাম। আমার পারিবারিক কথা প্রসঙ্গে তিনি বললেন, তোমাকে তো আগেই বলেছি, নিজেকে পূর্ণ করে তোলাই একজন খাঁটি সংঘ-সদস্যের প্রধান কর্তব্য। আমরা প্রায়ই মনে করি যে জীবনের সব বাধা-বিঘ্নকে দূর করলেই আমরা দ্রুত সেই লক্ষ্যে পৌঁছতে পারব, কিন্তু প্রিয় মহাশয়, একমাত্র জাগতিক জ্বালা-যন্ত্রণার ভিতর দিয়েই তিনটি প্রধান লক্ষ্যে পৌঁছতে পারি : (১) আত্মজ্ঞান-কারণ শুধুমাত্র তুলনার দ্বারাই মানুষ নিজেকে জানতে পারে। (২) আত্ম-পূর্ণতা-শুধুমাত্র সংগ্রামের ভিতর দিয়েই তা অর্জন করা যায়, এবং (৩) প্রধান গুণ মৃত্যুকে ভালোবাসাকে অর্জন করা। একমাত্র জীবনের উত্থান-পতনের ভিতর দিয়েই তার অসারতা আমরা উপলব্ধি করতে পারি এবং তার ফলে জন্ম নেয় মৃত্যুকে ভালোবাসা অথবা নবজন্ম পরিগ্রহণের প্রতি ভালোবাসা। তিনি আমাকে পরামর্শ দিলেন, আমি যেন পিটার্সবুর্গ গুরুভাইদের যোগাযোগ এড়িয়ে না যাই, কিন্তু আশ্রমে শুধুমাত্র দ্বিতীয় শ্রেণীর পদে অধিষ্ঠিত থেকে গুরুভাইদের অহংকারের পথ থেকে সরিয়ে আত্ম-জ্ঞান ও আত্ম-পূর্ণতার সঠিক পথে পরিচালিত করতে চেষ্টা করি। এছাড়া তিনি ব্যক্তিগতভাবে আমাকে পরামর্শ দিলেন, আমি যেন নিজের উপর সজাগ দৃষ্টি রাখি, এবং সেই উদ্দেশ্যে আমাকে একটা নোট-বই দিলেন, সেই নোট-বইতে আমি এখন লিখছি এবং ভবিষ্যতে আমার সব কাজের কথা লিখব।
