ইতিমধ্যে তার জীবনযাত্রা আগের মতো সেই একই মোহ ও আমোদ-প্রমোদের ভিতর দিয়ে কাটাতে লাগল। ভালো খেতে ও পান করতে সে ভালোবাসত, নীতি-বিরুদ্ধ ও অসম্মানকর মনে করলেও যে অবিবাহিতদের মহলে সে চলাফেরা করত তার প্রলোভন থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে পারত না।
অবশ্য এই সব কাজকর্ম ও আমোদ-প্রমোদের মধ্যেই বছরখানেক পরে পিয়রের মনে হল, ভ্রাতৃসংঘের মাটির উপর যতই ভরসা করতে চেষ্টা করছে ততই সে মাটি তার পায়ের তলা থেকে সরে যাচ্ছে। সেই সঙ্গে সে এটাও অনুভব করতে লাগল যে তার পায়ের তলা থেকে যত বেশি মাটি সরে যাচ্ছে ততই সে ভ্রাতৃসংঘের হাতে বেশি করে বাঁধা পড়ছে। ভ্রাতৃসংঘে যোগদান করার সময় তার মনে হয়েছিল, গভীর আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে সে একটা জলাভূমির মসৃণ বুকের উপর পা রাখতে চলেছে। কিন্তু সেখানে পা রাখামাত্রই পা যে ডুবে যাচ্ছে। মাটিটা যে সত্যি শক্ত সেবিষয়ে নিশ্চিত হবার জন্য সে আর একটা পাও তার উপর রাখল, আরো গভীরে ডুবে গেল, এবং নিজের অজ্ঞাতেই জলাভূমির হাঁটু-জলে চলতে লাগল।
যেকাজ সে করছে তা নিয়ে ক্রমেই তার মনে অসন্তোষ জমতে লাগল। ভ্রাতৃসংঘের কাজকর্ম যতটা সে দেখেছে তাতে তার মনে হয়েছে এর সবটাই বাহ্যিক আড়ম্বরের উপর প্রতিষ্ঠিত। আসলে ভ্রাতৃসংঘের কাজকর্মে সন্দেহ করার কথা তার মনে আসেনি, তবে তার মনে হচ্ছে যে রুশ ভ্রাতৃসংঘ ভুল পথে চলেছে এবং মূল নীতিগুলি থেকে দূরে সরে গেছে। আর তাই বছরের শেষ দিকে সংঘের উচ্চতর মন্ত্রগুপ্তির সন্ধানে সে বিদেশে যাত্রা করল।
.
১৮০৯ সালের গ্রীষ্মকালে পিয়ের পিটার্সবুর্গে ফিরে এল। আমাদের ভ্রাতৃসংঘের লোকরা পত্র মারফৎ জানতে পারল যে বিদেশে গিয়ে বেজুখভ অনেক উচ্চপদস্থ লোকের বিশ্বাস অর্জন করেছে, তার পদোন্নতি হয়েছে, এবং এমন কিছু সে সঙ্গে নিয়ে আসছে যাতে রাশিয়াতে ভ্রাতৃসংঘের কাজকর্মের অনেক সুবিধা হবে। পিটার্সবুর্গের ধর্ম-ভাইরা সকলেই তার সঙ্গে দেখা করতে এল, তার সঙ্গে ভাব জমাতে চেষ্টা করল, তাদের মনে হল সে তাদের জন্য একটা কিছু তৈরি করছে আর সেটা লুকিয়ে রেখেছে।
দ্বিতীয় শ্রেণীর আশ্রমবাসীদের একটা গুরুগম্ভীর সভা ডাকা হল, সংঘের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের কাছ থেকে পিয়ের তাদের জন্য যা নিয়ে এসেছে সেই সভাতেই পিটার্সবুর্গের ভাইদের তা জানিয়ে দেওয়া হবে। সভা লোকে পরিপূর্ণ হয়ে গেল। যথারীতি সব আচার-অনুষ্ঠান হয়ে গেলে পিয়ের উঠে দাঁড়িয়ে ভাষণ শুরু করল।
লজ্জায় আরক্ত হয়ে তো-তো করে লিখিত ভাষণটি হাতে নিয়ে সে বলতে শুরু করল।
প্রিয় ভাইসব, আশ্রমের নির্জন ঘরের মধ্যে আমাদের রহস্যময় কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করাটাই যথেষ্ট নয়-আমাদের কাজ করতে হবে-কাজ! আমরা ঘুমে ঢুলছি, কিন্তু আমাদের কাজ করতে হবে। নোট-বইটা তুলে ধরে পিয়ের পড়তে শুরু করল।
নিষ্কলুষ সত্যের প্রচার এবং ধর্মের জয় প্রতিষ্ঠার জন্য মানুষের মন থেকে ভুল ধারণাকে মুছে ফেলতে হবে, সময়ের সঙ্গে তাল রেখে ঐক্যের নীতিকে ছড়িয়ে দিতে হবে, যুবকদের শিক্ষিত করে তোলার দায়িত্ব নিতে হবে, বিজ্ঞতম মানুষদের সঙ্গে নিজেদের বাধতে হবে ঐক্যের অচ্ছেদ্য বন্ধনে, সাহসের সঙ্গে, সুবিবেচনার সঙ্গে কুসংস্কার, অবিশ্বাস ও নির্বুদ্ধিতাকে জয় করতে হবে, এবং আমাদের প্রতি যারা অনুরক্ত তাদের নিয়ে একই উদ্দেশ্যের সূত্রে গথিত একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে।
এই উদ্দেশ্য সাধনের জন্য পাপের উপর পুণ্যের প্রভুত্ব প্রতিষ্ঠিত করতে হবে, এমন প্রচেষ্টা আমাদের চালিয়ে যেতে হবে যাতে সৎ লোকেরা তাদের পুণ্যকর্মের জন্য এই জগতেই স্থায়ী পুরস্কার লাভ করতে পারে। কিন্তু এই মহৎ প্রচেষ্টার পথে আমাদের সবচাইতে বড় বাধা আজকের দিনের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলি। এ অবস্থায় কি করতে হবে? বিপ্লবকে সমর্থন করা, সবকিছু উৎখাত করা, শক্তি দিয়ে শক্তির প্রতিরোধ করা?…না! আমরা থাকব সে পথ থেকে অনেক দূরে। প্রতিটি সশস্ত্র সংস্কার অবশ্যই নিন্দনীয়, কারণ তাতে পাপের প্রতিকার হয় না, মানুষ যা ছিল তাই থাকে, তাছাড়া, জ্ঞানের কখনো হিংসার দরকার হয় না।
একই প্রত্যয়ের দ্বারা ঐক্যবদ্ধ দৃঢ়চিত্ত পুণ্যবান মানুষ তৈরি করা, পাপ ও নির্বুদ্ধিতার শাস্তি বিধান করা, প্রতিভা ও ধর্মের পোষকতা করা, উপযুক্ত লোকদের পথের ধুলো থেকে তুলে এনে আমাদের ভ্রাতৃসংঘের সঙ্গে যুক্ত করা–এই ধারণার উপরেই গড়ে উঠেছে আমাদের সংঘের গোটা পরিকল্পনা। একমাত্র তখনই আমাদের সংঘ সেই অপ্রতিহত শক্তির অধিকারী হবে যার দ্বারা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের হাত বেঁধে ফেলে তাদের অজ্ঞাতেই তাদের বশ করা যাবে। এককথায়, এমন একটি সার্বভৌম সরকার আমাদের গঠন করতে হবে যার কর্তৃত্ব ছড়িয়ে পড়বে সারা বিশ্বে। এই একই লক্ষ্য ছিল খৃষ্টধর্মের। এই ধর্ম মানুষকে শিখিয়েছে জ্ঞানী হতে, সৎ হতে, নিজেদের কল্যাণের জন্যই শ্রেষ্ঠ ও বিজ্ঞতম মানুষদের দৃষ্টান্ত ও উপদেশকে অনুসরণ করতে।
যে মুহূর্তে প্রতিটি রাজ্যে আমরা নির্দিষ্ট সংখ্যক সমর্থ লোক পাব, আবার তারা প্রত্যেকে দুইজনকে শিক্ষিত করে তুলবে, এবং সকলে ঐক্যবদ্ধ হবে, তখনই আমাদের সংঘের পক্ষে সবকিছু সম্ভব হবে। মানবজাতির কল্যাণের জন্য সেকাজ ইতিমধ্যেই গুপ্তভাবে সুসম্পন্ন হয়েছে।
