সে যে বিভিন্ন মহলে একই দিকে একই মন্তব্যের পুনরাবৃত্তি করে সেটা বুঝতে পেরে মাঝে মাঝেই তার মন খারাপ হয়ে যায়। কিন্তু দিনের পর দিন সে অত্যন্ত ব্যস্ত থাকায় সে যে কোনো কিছু ভাবতে পর্যন্ত পারছে না–এ কথাটা বুঝবার মতো সময়ও তার নেই।
কোচুবের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাঙ্কারে যেমন ঘটেছিল তেমনই বুধবারেও স্পেরানস্কি যখন নিজের বাড়িতে প্রিন্স আন্দ্রুর মুখোমুখি বসে তার সঙ্গে একান্তে দীর্ঘ সময় ধরে কথাবার্তা বলল তখনো প্রিন্স আন্দ্রুর উপর তার প্রভাব বেশ বড় হয়েই দেখা দিল।
বলকনস্কির কাছে বেশির ভাগ লোককেই এক বেশি ঘৃণাহ ও তুচ্ছ বলে মনে হয়, আর যে পূর্ণতার আদর্শের জন্য সে সগ্রাম করছে একটি মানুষের মধ্যে সেই পূর্ণতার জীবন্ত আদর্শকে দেখবার বাসনা তার মনে এতই প্রবল হয়ে উঠেছে যে সে সহজেই বিশ্বাস করে বসল যে স্পেরানস্কির মধ্যেই সম্পূর্ণ যুক্তিবাদী ও ধার্মিক মানুষের সেই আদর্শকে সে খুঁজে পেয়েছে। স্পেনস্কি যদি তার নিজের সমাজ থেকেই উঠে আসত এবং সেই একই পরিবেশে মানুষ হতো তাহলে হয়তো বলকস্কি অচিরেই তার দুর্বলতা, মানবিকতার। দিকগুলিকে আবিষ্কার করে ফেলত, কিন্তু আসলে অবস্থা যা দাঁড়াল তাতে স্পেরানস্কির বিচিত্র যুক্তিবাদী মনটাই তার মনে আরো বেশি করে শ্রদ্ধার ভাব জাগিয়ে তুলল, কারণ সে তাকে ঠিকমতো বুঝতেই পারত না। তার উপর সঙ্গীটির ক্ষমতার জন্যই হোক আর তাকে নিজের দলে টানবার জন্যই হোক, স্পেরানস্কি বেশ সূক্ষ্মভাবে প্রিন্স আন্দ্রুর স্তুতিগানও করত।
বুধবার সন্ধ্যায় দুইজনের দীর্ঘ আলোচনা প্রসঙ্গে রোনস্কি একাধিকবার মন্তব্য করল : চিরাচরিত প্রথার সাধারণ স্তরের ঊর্ধ্বে যা কিছু আছে তাকেই আমরা শ্রদ্ধা করি…, অথবা একটু হেসে : কিন্তু আমরা চাই নেকড়েও তার খাদ্য পাক আবার মেষটাও নিরাপদ থাকুক…আবার : তারা এটা বুঝতে পারে না…আর এ সবই এমনভাবে বলে যেন সে বলতে চায় : তারাই বা কি আর আমরাই বা কি-এ কথা তো বুঝি শুধু আমরা-আপনি এবং আমি।
স্পেরানস্কির সঙ্গে এই প্রথম দীর্ঘ আলোচনার ফলে প্রথম সাক্ষাৎকারে প্রিন্স আন্দ্রুর মনে যে ভাবের উদয় হয়েছিল সেটাই দৃঢ়তর হল। তার মধ্যে সে এমনি একটি বৈশিষ্ট্যপূর্ণ স্পষ্ট চিন্তার মানুষকে দেখতে পেল যার প্রচণ্ড ধীশক্তি, কর্মশক্তি ও অধ্যবসায় তাকে ক্ষমতার শিখরে প্রতিষ্ঠিত করেছে, আর সেই ক্ষমতাকে সে ব্যবহার করছে কেবলমাত্র রাশিয়ার কল্যাণে। প্রিন্স আন্দ্রুর চোখে স্পেরানস্কিই সেই মানুষ যা সে নিজে হতে চেয়েছে–জীবনের সব ঘটনাকে সে বুদ্ধি দিয়ে ব্যাখ্যা করতে জানে। সবই ঠিক আছে, সব কিছুই যেমনটি হওয়া উচিৎ তেমনটিই হয়েছে : শুধু একটা জিনিস প্রিন্স আন্দ্রুকে অস্বাচ্ছন্দ্যের মধ্যে ফেলেছে। সেটা স্পেরানস্কির নিরাসক্ত, মুকুরসদৃশ দৃষ্টি যার ভিতর দিয়ে দৃষ্টি চলে, আর তার সাদা সুচারু হাত দুখানি, যে হাতের দিকে প্রিন্স আন্দ্রু নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধেও এমনভাবে তাকায় যেভাবে লোকে তাকায় ক্ষমতাসীন লোকের হাতের দিকে। এই মুকুরসদৃশ দৃষ্টি আর ঐ দুটি সুচারু হাত প্রিন্স আন্দ্রুকে বিব্রত করে, কেন করে তা সে জানে না।
সাধারণভাবে বুদ্ধিবৃত্তির শক্তি ও কর্তৃত্বের উপর একান্ত ও অনড় বিশ্বাস-স্পেরানস্কির মানসিকতার এই বৈশিষ্ট্যই প্রিন্স আন্দ্রুকে সবচাইতে বেশি প্রভাবিত করেছে। তার সঙ্গে পরিচয়ের প্রথম পর্বে বলকনস্কি তার প্রতি সেই আবেগাপ্লুত শ্রদ্ধা অনুভব করেছিল যা সে একসময় বোনাপার্তের জন্য অনুভব করত। স্পেরানস্কি যে একজন গ্রাম্য পুরোহিতের ছেলে আর নিচ কুলে জন্ম বলে বোকা লোকগুলি যে তাকে ঘৃণা করতে পারত (আসলে অনেকেই তা করে) এই বোধই প্রিন্স আন্দ্রুর মনে তার প্রতি বড় বেশি আবেগের সৃষ্টি করেছে এবং তার নিজের অজ্ঞাতেই সেটা বেড়ে চলেছে।
বলকনস্কির সঙ্গে কাটানো সেই প্রথম সন্ধ্যায়ই আইন পুনর্বিন্যাস কমিটির কথা উল্লেখ করে স্পেরানস্কি বিদ্রূপ করে বলল যে এই দেড়শ বছরের জীবনে কমিশন লাখ লাখ খরচ করেছে, অথচ বিভিন্ন আইন বিষয়ক পরিচ্ছেদগুলিতে রোজেনকামসের হাতে কতকগুলি লেবেল আঁটা ছাড়া আর কিছুই করেনি।
সে বলল, লাখ লাখ খরচ করে সরকার শুধু এইটুকুই করেছে। তাই আমরা সিনেটের হাতে আইনানুগ ক্ষমতা দিতে চাই, কিন্তু সেরকম কোনো আইন আমাদের নেই। আর সেই কারণেই এসময়ে আপনার মতো লোকের কাজ না করাও একটা পাপ।
প্রিন্স আন্দ্রু বলল, সে কাজের জন্য যে আইনের শিক্ষা প্রয়োজন সেটা তার নেই।
সে শিক্ষা তো কারো নেই, কাজেই আপনি বা পাবেন কোথায়? কিন্তু এই পাপ-চক্র থেকে আমাদের তো বেরিয়ে আসতেই হবে।
এক সপ্তাহ পরে প্রিন্স আন্দ্রু সামরিক-বিধি কমিটির একজন সদস্য হয়ে গেল, এবং–যেটা সে মোটেই আশা করেনি–তাকে আইন পুনর্বিন্যাস কমিটির একটা শাখার সভাপতিও করা হল। স্পেরানস্কির অনুরোধে অসামরিক বিধির খসড়ার প্রথম অংশটা সে নিজের হাতে নিল, এবং কোড নেপলিয়ন ও জস্টিনিয় ইসুটিট্যুটের সাহায্যে ব্যক্তিগত অধিকার সংক্রান্ত ধারা রচনার কাজ শুরু করে দিল।
.
অধ্যায়-৭
এর ঠিক দুবছর আগে ১৮০৮ সালে জমিদারি পরিদর্শন করে ফিরবার পরে পিয়ের আপনা থেকেই পিটার্সবুর্গ ভ্রাতৃসংঘের প্রথম সারিতে নিজের আসনে পেয়ে গিয়েছিল। তখন সে ভোজন ও অন্ত্যেষ্টিসভার আয়োজন করল, নতুন সদস্য সংগ্রহ করল, এবং বিভিন্ন আশ্রমকে একত্র করে নির্ভরযোগ্য বিধান তৈরির কাজে নিজেকে নিয়োজিত করল। মন্দির নির্মাণের জন্য টাকা দিল, এবং অধিকাংশ সদস্যের অনিয়মিত প্রচেষ্টায় যে ভিক্ষা সংগৃহীত হয় তাতে সাধ্যমতো নিজের দান যোগ করে দিল। সংঘ পিটার্সবুর্গে যে দরিদ্রাশ্রম প্রতিষ্ঠা করেছিল, একক প্রচেষ্টায়ই সেটাকে সে চালাতে লাগল।
