সেনাবাহিনী-সংক্রান্ত কমিটির কাছে, আমি সুপারিশ করেছি, মহাশয়কে একজন সদস্য মনোনীত করা উচিত, কিন্তু বিনা বেতনে।
প্রিন্স আন্দ্রু হাসল।
আমি চাই না।
বিনা বেতনে সদস্য আরাকচিভ পুনরায় কথাটা বলল। আমি বলছি…এই! পরবর্তী লোককে ডাক! আর কে আছে? প্রিন্স আন্দ্রুকে অভিবাদন জানিয়ে সে চিৎকার করে বলল।
.
অধ্যায়-৫
কমিটিতে নিজের মনোনয়নের ঘোষণার জন্য অপেক্ষা করে থাকার ফাঁকে প্রিন্স আন্দ্রু পূর্বপরিচিত লোকজনদের খোঁজ করতে লাগল, বিশেষ করে যারা এখন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত আছে এবং যাদের সহায়তা তার কাছে লাগবে।
কাউন্ট আরাকচিভের সঙ্গে সাক্ষাৎকারের পরদিন প্রিন্স আন্দ্রুন্দ্ৰ সন্ধ্যাটা কাটাল কাউন্ট কোচুবের বাড়িতে। কাউন্ট আরাকচিভের সঙ্গে সাক্ষাৎকারের কথাও তাকে বলল।
দেখুন মশায়, এক্ষেত্রেও মাইকেল মিখায়লভিচ স্পেরানস্কিকে ছাড়া আপনার চলবে না। সবকিছুই তো তার হাতে। আমি তার সঙ্গে কথা বলব। আজ সন্ধ্যায়ই তার আসার কথা আছে।
সামরিক বিধি-বিধানের সঙ্গে স্পেরানস্কির কি সম্পর্ক থাকতে পারে? প্রিন্স আন্দ্রু শুধাল।
কোচুবে হেসে মাথা নাড়তে লাগল, যেন বলকনস্কির সরলতা দেখে সে অবাক হয়েছে।
সে বলতে লাগল, কয়েকদিন আগেই আপনার সম্পর্কে আমাদের মধ্যে কথা হয়েছে, আপনার স্বাধীন চাষীর ব্যাপারটা নিয়েও কি হয়েছে।
ক্যাথারিনের সময়কার একজন বুড়ো মানুষ তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বলকনস্কির দিকে ঘুরে বলে উঠল, ও, তাহলে আপনিই ভূমিদাসদের মুক্তি দিয়েছেন প্রিন্স?
বুড়ো মানুষটি যাতে অকারণে বিরক্ত না হয় সেজন্য নিজের কাজটাকে ছোট করে দেখাতে প্রিন্স আন্দ্রু জবাব দিল, জমিদারিটা ছিল খুব ছোট, বিশেষ কোনো লাভ হতো না।
কোচুবের দিকে তাকিয়ে বুড়ো বলল, আমার হয়তো দেরি হয়ে যাচ্ছে… আরো বলল, একটা কথা আমি বুঝতে পারি না। তাদের যদি মুক্তি দেওয়া হয় তাহলে জমি চাষ করবে কারা? আইন লেখা সহজ, কিন্তু শাসন করা বড় শক্ত…ঠিক যেরকম এখন–আপনাকেই শুধাই কাউন্ট–সকলকেই যদি পরীক্ষা পাশ করতে হয় তাহলে বিভাগীয় প্রধান হবে কারা?
পায়ের উপর পা রেখে চারদিকে তাকিয়ে কোচুবে জবাব দিল, মনে হয় যারা পরীক্ষা পাশ করবে তারাই।
দেখুন, প্রিয়ানিচনিকভ আমার অধীনে কাজ করে, চমৎকার লোক, দামি লোক, কিন্তু বয়স ষাট। সে কি এখন পরীক্ষা দিতে যাবে? ..
হ্যাঁ, সেটা একটা অসুবিধা বটে, শিক্ষাটা তো সাধারণ ব্যাপার নয়, কিন্তু কাউন্ট কোচুবে কথা শেষ না করেই আসন ছেড়ে উঠে প্রিন্স আন্দ্রুর হাতে চাপ দিয়ে লম্বা টাক-মাথা একটি লোকের সঙ্গে দেখা করতে এগিয়ে গেল। এইমাত্র সে ঘরে ঢুকেছে। তার বয়স প্রায় চল্লিশ বছর, মস্তবড় খোলা কপাল, অস্বাভাবিক সাদা লম্বাটে মুখ। নবাগতের পরনে চাতক পাখির লেজওয়ালা নীল রঙের কোট, গলা থেকে একটা কুশ ঝুলছে, বাঁ দিকের বুকে একটা তারকা। লোকটি স্পেরানস্কি। প্রিন্স আন্দ্রু সঙ্গে সঙ্গে তাকে চিনতে পারল, তার বুকের ভিতরটা কেঁপে উঠল, জীবনের সংকট-মুহূর্তে এইরকমই হয়ে থাকে। এর কারণ কি শ্রদ্ধা, ঈর্ষা, না প্রত্যাশা তা সে জানে না। স্পেরানস্কির চেহারায় এমন একটা বৈশিষ্ট্য আছে যে তাকে সহজেই চেনা যায়। প্রিন্স আন্দ্রু যে সমাজে বাস করে সেখানে সে এমন কাউকে কখনো দেখেনি যে একাধারে কিম্ভুত ও বিশ্রী অঙ্গভঙ্গির সঙ্গে এমন প্রশান্তি ও আত্মপ্রত্যয়ের অধিকারী, ঐ দুটি আধ-বোজা সজল চোখের মতো দৃঢ় অথচ শান্ত ভাব অথবা এমন ভাবলেশহীন কঠিন হাসি সে কখনো দেখেনি, এমন সরল, নরম, সুচারু কণ্ঠস্বরও কখনো শোনেনি, সর্বোপরি প্রশস্ত, অতি স্কুল ও নরম মুখের ও হাতের এমন সূক্ষ্ম সাদা রংও সে কখনো দেখেনি। দীর্ঘদিন হাসপাতালে-থাকা সৈনিকদের মুখেই শুধু এরকম সাদা রং ও নরম ভাব প্রিন্স আন্দ্রু দেখেছে। এই হল স্পেরানস্কি, স্বরাষ্ট্রসচিব, সম্রাটের প্রতিবেদক এবং এরফুর্ত-এ সম্রাটের সঙ্গী, সেখানে একাধিকবার সম্রাটের সঙ্গে দেখা করেছে, নেপোলিয়নের সঙ্গে কথা বুলেছে।
অনেক লোকের মধ্যে ঢুকে লোকে সাদারণত যা করে থাকে স্পেরানস্কি সেইভাবে এক মুখ থেকে অন্য মুখের উপর দৃষ্টি ফেরাতে লাগল না। কথা শুরু করার ব্যাপারেও তাড়াহুড়া করল না। কথা বলল ধীরে ধীরে, সকলেই যে তার কথা শুনবে সে বিশ্বাস তার আছে, আর যখন যার সঙ্গে কথা বলছে একমাত্র তার দিকেই তাকাচ্ছে।
প্রিন্স আন্দ্রু বিশেষ মনোযোগসহকারে রোনস্কির প্রতিটি কথা ও প্রতিটি চলাকে অনুসরণ করতে লাগল। কোনো নতুন মানুষের সঙ্গে দেখা হলেই বিশেষ করে স্পেরানস্কির মতো লোক যার সুখ্যাতি সে শুনেছে–সে সব সময় তার ভিতরকার মানবিক গুণগুলোকে পুরোপুরি আবিষ্কার করতে চেষ্টা করে।
স্পেরানস্কি কোচুবেকে বলল, আরো আগে আসতে না পারার জন্য সে দুঃখিত, কারণ সে রাজপ্রসাদে আটকা পড়েছিল। সম্রাট যে তাকে আটকে রেখেছিল সেকথা সে বলল, প্রিন্স আন্দ্রু তার এই অতিবিনয়টুকু লক্ষ্য করল। কোচুবে যখন প্রিন্স আন্দ্রুর পরিচয় দিল তখন স্বভাবসিদ্ধ হাসির সঙ্গে স্পেরানস্কি ধীরে ধীরে বলকনস্কির দিকে চোখ দুটো ফেরাল, নীরবে তার দিকে তাকাল।
আপনার সঙ্গে পরিচিত হয়ে খুব খুশি হলাম। সকলের মতো আমিও আপনার কথা শুনেছি, একটু থেমে সে বলল।
