এখন অসামরিক দিক থেকে এসব লোকের স্থান দখল করেছিল স্পেরানস্কি, আর সামরিক দিক থেকে আরাকচিভ। পৌঁছার কিছুক্ষণ পরেই প্রিন্স আন্দ্রু ম্রাটের দরবারে হাজির হল। আগে দুবার দেখা হওয়া সত্ত্বেও সম্রাট অনুগ্রহ করে তাকে একটি কথাও বলল না। প্রিন্স আন্দ্রুর আগাগোড়াই মনে হয়েছে যে সম্রাটের প্রতি তার সহানুভূতি নেই, পরবর্তীকালে তার মুখ এবং ব্যক্তিত্ব কোনোটাই সে পছন্দ করত না, আর আজ ম্রাটের এই নিরুত্তাপ, প্রতিরোধী দৃষ্টিপাতের ফলে তার সে ধারণা আরো দৃঢ় হল। তার প্রতি সম্রাটের এই তাচ্ছিল্যকে সভাসদরা এই বলে ব্যাখ্যা করল যে ১৮০৫ সাল থেকে বলকনস্কি সেনাদলের চাকরি ছেড়ে দেয়ায় হিজ ম্যাজেস্টির অসন্তুষ্টিই এর আসল কারণ।
প্রিন্স আন্দ্রু ভাবল, কারো ভালো লাগা মন্দ লাগার উপর যে মানুষের হাত থাকে না সেকথা আমি নিজেও জানি, কাজেই সামরিক বিধিবিধান সংস্কারের জন্য আমি যে প্রস্তাব তৈরি করেছি সেটা ব্যক্তিগতভাবে সম্রাটের হাতে দিলেই কোনো কাজ হবে না, কিন্তু আমার প্রকল্পের গুণই তাকে গ্রহণযোগ্য করে তুলবে।
সে যা লিখে এনেছে তার কথা বাবার বন্ধু জনৈক বৃদ্ধ ফিল্ড-মার্শালকে বলল। ফিল্ড-মার্শাল তার সঙ্গে দেখা করার একটা সময় স্থির করে দিল, তাকে সাদরে অভ্যর্থনা করল এবং কথা দিল যে সম্রাটকে জানাবে। কয়েক দিন পরেই প্রিন্স আন্দ্রু একটা চিঠি পেল, যুদ্ধমন্ত্রী কাউন্ট আরাকচিভের সঙ্গে তাকে দেখা করতে হবে।
নির্দিষ্ট দিনে সকাল নয়টায় প্রিন্স আন্দ্রু কাউন্ট আরাকচিভের প্রতীক্ষাকক্ষে ঢুকল।
সে ব্যক্তিগতভাবে আরাকচিভকে চেনে না, আগে কখনো তাকে দেখেনি, কিন্তু তার সম্পর্কে যেসব কথা শুনেছে তাতে লোকটির প্রতি তার মনে কোনো শ্রদ্ধাই জাগেনি।
তিনি যুদ্ধমন্ত্রী, সম্রাটের বিশ্বাসভাজন ব্যক্তি, তার ব্যক্তিগত গুণাগুণ বিচার করার কোনো দরকার আমার নেই, আমার প্রকল্পটি বিচার করে দেখার ভার তার উপর পড়েছে, কাজেই একমাত্র তিনিই এটাকে গ্রহণ করতে পারেন, অনেক গুরুত্বপূর্ণ ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে কাউন্ট আরাকচিভের প্রতীক্ষা-কক্ষে বসে প্রিন্স আন্দ্রু এই কথাগুলিই ভাবতে লাগল।
যে মুহূর্তে দরজাটা খুলে গেল তখনই উপস্থিত ছোট-বড় সকলের মুখে একটিমাত্র অনুভূতিই প্রকাশ পেল-ভয়ের অনুভূতি। প্রিন্স আন্দ্রু কর্তব্যরত অ্যাডজুট্যান্টকে দ্বিতীয়বার অনুরোধ করল তার নামটা এগিয়ে দেবার জন্য, কিন্তু একটা ব্যঙ্গাত্মক দৃষ্টি হেনে অ্যাডজুট্যান্ট জানিয়ে দিল যথাসময়েই তার পালা আসবে। কর্তব্যরত অ্যাডজুট্যান্ট আরো কয়েকজনকে মন্ত্রীর ঘরে ঢুকিয়ে দেওয়া ও বের করে আনার পরে সেই ভয়ংকর দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে দেওয়া হল এমন একটি অফিসারকে যার মর্যাদাহীন ভীত ভাবভঙ্গি দেখে প্রিন্স আন্দ্রু অবাক হয়ে গেল। অফিসারটির সাক্ষাঙ্কার দীর্ঘ সময় ধরে চলল। তারপর হঠাৎ দরজার ওপাশে একটা কর্কশ কণ্ঠের কঠোর শব্দ শোনা গেল এবং পাণ্ডুর মুখ ও কাঁপা ঠোঁট নিয়ে অফিসারটি ঘর থেকে বেরিয়ে এল-দুই হাতে মাথাটা চেপে ধরে প্রতীক্ষা-কক্ষের ভিতর দিয়ে বাইরে চলে গেল।
তারপরেই কর্তব্যরত অফিসারটি প্রিন্স আন্দ্রুকে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে ফিসফিস করে বলল, ডান দিকে, জানালার কাছে।
একটা পরিচ্ছন্ন সাদামাঠা ঘরে ঢুকে প্রিন্স আন্দ্রু দেখল বছর চল্লিশের একটি লোক টেবিলের পাশে দাঁড়িয়ে আছে, তার কোমর লম্বা, মাথায় বড় বড় চুল, কপালে অনেকগুলি ভজ, সবুজ-বাদামি চোখের উপর ভ্রুকুটি কুটিল ভুরু, ঝোলানো রক্তিম নাক। না তাকিয়েই আরাকচিভ মাথাটা তার দিকে ঘোরাল।
আপনার কিসের আবেদন? আরাকচিভ প্রশ্ন করল।
আমি কোনো আবেদন রাখছি না ইয়োর এক্সেলেন্সি, প্রিন্স আন্দ্রু শান্তভাবে জবাব দিল।
আরাকচিভের চোখ দুটি তার দিকে ঘুরল।
বলল, বসুন। প্রিন্স বলকনস্কি?
কোনো ব্যাপারে আবেদন জানাতে আমি আসিনি। আমার একটা প্রকল্প মহামান্য সম্রাট আপনার কাছে পাঠিয়েছেন…
দেখুন সাহেব, আপনার প্রকল্পটা আমি পড়েছি, প্রথম কথাগুলি বেশ ভদ্রভাবে উচ্চারণ করেই আরাকচিত পুনরায় প্রিন্স আন্দ্রুর দিকে না তাকিয়েই একটা বিরক্তিপূর্ণ ঘৃণার সুরে ফিরে গেল। আপনি নতুন সামরিক আইনের প্রস্তাব করেছেন? আইন তো অনেক রয়েছে, কিন্তু পুরনো আইনকে কাজে লাগাবার মতো লোকেরই তো অভাব। আজকাল তো সকলেই আইন তৈরি করেন, কাজ করার চাইতে লেখাটা অনেক সহজ।
প্রিন্স আন্দ্রু বিনীতভাবে বলল, আমি যে স্মারকলিপিটা পাঠিয়েছি সে সম্পর্কে আপনার অভিমত জানবার জন্য মহামান্য সম্রাটের ইচ্ছানুসারেই আমি ইয়োর এক্সেলেন্সির কাছে এসেছি।
আপনার স্মারকলিপির উপর একটা প্রস্তাব অনুমোদন করে সেটা কমিটিতে পাঠিয়ে দিয়েছি। আমি এটা সমর্থন করি না, উঠে দাঁড়িয়ে লেখার টেবিল থেকে একখানা কাগজ তুলে আরাকচিভ বলল, এই নিন! কাগজটা সে প্রিন্স আন্দ্রুর হাতে দিল।
বড় হাতের অক্ষর ব্যবহার না করে, ভুল বানানে, যতিচিহ্ন ছাড়াই আড়াআড়িভাবে কাগজটার উপর লেখা হয়েছে, রচনা সুষ্ঠু হয়নি কারণ ফরাসি সামরিক বিধির নকল বলে মনে হয় আর সমর-বিধি থেকে অপ্রয়োজনে সরে যাওয়া হয়েছে।
কোন কমিটির কাছে পাঠানো হয়েছে? প্রিন্স আন্দ্রু জানতে চাইল।
