সারাদিনটাই খুব গরম ছিল। কোথায় একটা ঝড় জমে উঠেছে, কিন্তু এখানে মুধু একটুকরো মেঘ থেকে কয়েক ফোঁটা বৃষ্টি পড়ে রাস্তাটাকে ও নতুন পাতাগুলোকে ভিজিয়ে দিয়েছে। জঙ্গলের বাঁ দিকটা ছায়ায় অন্ধকার, ডান দিকটাতে রোদ ঝিলমিল করছে, ভেজা পাতাগুলো চিকচিক করছে, বাতাসে একটুও নড়ছে না। গাছে গাছে ফুল ফুটেছে, নাইটিঙ্গেল পাখিরা ডাকছে, তাদের স্বর দূরে ও কাছে ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।
প্রিন্স আন্দ্রু ভাবল, হ্যাঁ, যে ওক গাছটার সঙ্গে আমি একান্ত হয়েছিলাম সেটা এখানেই ছিল। সেটা গেল কোথায়? রাস্তার বাঁদিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে সে অবাক হয়ে গেল, আর চিনতে না পেরে যে ওক গাছটাকে সে খুঁজছিল সেটার দিকেই অবাক চোখে তাকিয়ে রইল। বুড়ো ওক গাছটা বদলে গেছে, গাঢ় সবুজ নতুন পাতার চাঁদোয়া ছড়িয়ে একমনে দাঁড়িয়ে আছে, আর অস্তসূর্যের আলোয় ঈষৎ কাঁপছে। সেই গাঁটওয়ালা আঙুলও নেই, বাকলে সেই পুরনো ক্ষতও নেই, পুরনো সন্দেহ ও দুঃখকষ্টের চিহ্নমাত্র কোথাও নেই। শতাব্দীকালের প্রাচীন বাকল থেকে একটা ডালও গজায়নি, অথচ তাতেই এত পাতা গজিয়েছে যে এই বুড়ো গাছটাই যে সেগুলির জনক সেটা বিশ্বাস করাই শক্ত।
হ্যাঁ, এই তো সেই ওক গাছটা, একথা ভাবতেই একটা অকারণ বসন্তকালীন আনন্দ ও পুনরুজ্জীবনের অনুভূতি প্রিন্স আন্দ্রুকে একেবারে পেয়ে বসল। সহসা স্মৃতির পথ ধরে ভেসে এল জীবনের সবগুলি শ্রেষ্ঠ মুহূর্ত। অস্তারলিজের উঁচু আকাশটা, তার স্ত্রীর অনুযোগভরা মৃত মুখখানি, ফেরিঘাটে পিয়েরের উপস্থিতি, রাতের সৌন্দর্য দেখে বিহ্বল মেয়েটি, সেই রাতটি ও তার চাঁদটি, আর… সহসা সে-সব কিছু তার মনের মধ্যে এসে ভিড় করল।
হঠাৎ প্রিন্স আন্দ্রু একটা চিরদিনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত করে বসল, না, একত্রিশ বছর বয়সে জীবন শেষ হতে পারে না! আমাদের মধ্যে কী আছে সেটা জানাই যথেষ্ট নয়–সকলকেই সেটা জানাতে হবে : পিয়ের, আর সেই যে মেয়েটি আকাশে উড়তে চেয়েছিল, তারা সকলেই আমাকে জানুক, যাতে আমার জীবনটা শুধু আমার জীবন হয়েই অন্য সকলের থেকে দূরে না থাকে, যাতে তাদের সকলের মধ্যে আমার জীবনটা প্রতিফলিত হতে পারে, যাতে তারা এবং আমি এক হয়ে বাঁচতে পারি।
বাড়িতে পৌঁছে প্রিন্স আন্দ্রু স্থির করল হেমন্তকালেই সে পিটার্সবুর্গে যাবে, আর এই সিদ্ধান্তের স্বপক্ষে সবরকম যুক্তি বের করতে লাগল। একগাদা অর্থপূর্ণ ও যুক্তিসঙ্গত কারণ তাকে বলে দিল যে পিটার্সবুর্গে যাওয়া তার পক্ষে একান্তভাবে প্রয়োজন, এমনকি আবার চাকরিতে ঢোকার কথাও তার মনটাকে দোলা দিতে লাগল। এখন সে বুঝতেই পারল না কেমন করে জীবনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করার প্রয়োজনীয়তাকে সে একদিন সন্দেহ করেছিল, ঠিক যেমন একমাস আগেও সে বুঝতে পারত না যে শান্ত গ্রাম্যজীবনকে ছেড়ে আসার কথা কেমন করে তার মাথায় আসতে পারে। এখন সে পরিষ্কার বুঝতে পারছে যে কোনোরকম কাজে নিজেকে নিয়োজিত না করলে এবং আবার জীবনে সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ না করলে তার জীবনের সমস্ত অভিজ্ঞতাই অর্থহীনভাবে নষ্ট হয়ে যাবে। রিয়াজান পরিভ্রমণের পরে গ্রাম্যজীবনটাই তার কাছে একঘেয়ে মনে হতে লাগল, আগেকার কাজকর্মে সে আর তেমন আগ্রহ বোধ করে না, অনেক সময়ই নিজের পড়ার ঘরে একলা বসে থাকতে থাকতে সে উঠে দাঁড়ায়, আয়নার কাছে গিয়ে অনেকক্ষণ ধরে নিজের মুখের দিকেই একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। সেইসব মুহূর্তে কেউ তার ঘরে ঢুকলে সে অতি কঠোর ও কঠিন হয়ে ওঠে, এমনকি অপ্রীতিকর রকমের যুক্তিবাদী হয়ে ওঠে।
হয়তো সেইরকম কোনো মুহূর্তে ঘরে ঢুকে প্রিন্সেস মারি বলল, দেখ দাদা, ছোট্ট নিকলাস আজ বাইরে যাবে না, দিনটা বড় ঠাণ্ডা।
তখন প্রিন্স আন্দ্রু হয়তো রুক্ষ গলায় বোনকে বলে বসল, যদি গরম হত তাহলে সে বাইরে বের হত ঢিলে জামা পরে, কিন্তু আজ যেহেতু ঠাণ্ডা তাই তাকে গরম পোশাক পরতে হবে, সেজন্যই তো ওগুলো বানানো হয়েছে। আজ ঠাণ্ডা পড়েছে বলে ছেলে ঘরের মধ্যে থাকবে এটা তো কোনো যুক্তি হতে পারে না।
সেসব মুহূর্তে প্রিন্সেস মারি হয়তো ভাবত, বুদ্ধিগত কাজকর্মের ফলে মানুষ কত নীরসই না হয়ে যেতে পারে।
.
অধ্যায়-৪
১৮০৯-এর অগস্ট মাসে প্রিন্স আন্দ্রু পিটার্সবুর্গে পৌঁছল। সে-সময়ে যৌবনদীপ্ত স্পেরানস্কি খ্যাতির একেবারে শিখরে অধিষ্ঠিত, প্রচণ্ড উৎসাহ-উদ্দীপনার সঙ্গে চলেছে তার সংস্কার-কার্য। সেই অগস্ট মাসেই সম্রাট তার গাড়ি থেকে পড়ে যায়, তার পায়ে চোট লাগে, তিন সপ্তাহ তাকে পিতরহপে থাকতে হয়, প্রতিদিন একমাত্র স্পেনস্কি ছাড়া আর কারো সঙ্গে সম্রাট দেখা করত না। সেই সময় এমন দুটি বিখ্যাত বিধান তৈরি করা হচ্ছিল যা সমাজকে প্রচণ্ডভাবে নাড়া দিল আদালতের বিভিন্ন মর্যাদার স্তরভেদ রহিত করা এবং কলেজিয়েট এসেসর ও স্টেট কাউন্সিলর পদের জন্য পরীক্ষাব্যবস্থার প্রবর্তন করা, শুধু এই দুটোই নয়, রাশিয়ার তকালীন শাসনব্যবস্থার পরিবর্তনের জন্য গোটা রাষ্ট্রীয় কাঠামোটাকেই পাল্টে দেয়া : রাষ্ট্রীয় পরিষদ থেকে জেলা বিচার পদ্ধতি পর্যন্ত আইন, শাসন ও অর্থনৈতিক স্তরে পরিবর্তন সাধন করা। যে-সব অস্পষ্ট উদারনৈতিক স্বপ্ন নিয়ে সম্রাট আলেক্সান্দার সিংহাসনে আরোহণ করেছিল এবং সহযোগী জারতোরিস্কি, নভসিলৎসেভ, কোচুবে ও স্লোগানভের সাহায্যে তাকে বাস্তবে রূপায়িত করতে চেষ্টা করছিল সেগুলি ক্রমে স্পষ্ট আকার নিয়ে বাস্তবায়িত হতে চলছিল।
