কাউন্ট ইলিয়া রস্তভ এবারেও আগেকার বছরগুলোর মতোই অত্রাদণুতে বাস করছিল, অর্থাৎ আগের মতোই গোটা প্রদেশকে শিকারে, থিয়েটারে, ডিনারে ও গান বাজনায় একেবারেই মাতিয়ে তুলেছে। কোনো নতুন অতিথি এলেই সে খুশি হয়, প্রিন্স আন্দ্রুকে পেয়েও খুশি হল, রাতটা থেকে যাবার জন্য পীড়াপীড়ি করতে লাগল। আসন্ন নাম দিবস উপলক্ষে বুড়ো কাউন্টের বাড়িটা তখন লোকভর্তি। সারাটাদিন বাড়ির বয়স্ক লোকজন ও গণ্যমান্য অতিথিদের নিয়ে কাটালেও প্রিন্স আন্দ্রু বারবার নাতাশার দিকে তাকাতে লাগল। মেয়েটি তার দলবল নিয়ে হাসিঠাট্টা করছে, খুশিতে ফেটে পড়ছে। প্রতিবারই প্রিন্স আন্দ্রু ভাবছে, সে কি ভাবছে? ও এত খুশি কেন?
রাতের বেলা নতুন পরিবেশে একেবারে একলা হওয়ায় অনেকক্ষণ তার ঘুম এল না। কিছুক্ষণ পড়ে মোমবাতিটা নিভিয়ে দিল, আবার জ্বালাল। ঘরের ভিতরকার খড়খড়িগুলো বন্ধ থাকায় গরটা বেশ গরম। বোকা বুড়োটার (রস্তভকে সে ওই বলেই ডাকত) উপর সে বিরক্ত হয়ে উঠল, শহর থেকে কিছু দরকারি কাগজপত্র না আসায় সেই তাকে রাতটা এখানে থেকে যেতে বলেছে। এখানে থেকে যাবার জন্য সে নিজের উপরেও বিরক্ত হল।
বিছানা থেকে উঠে জানালাটা খুলে দিতে গেল। খড়খড়ি কোলামাত্রই চাঁদের আলো হুড়মুড় করে ঘরে ঢুকে পড়ল যেন এইজন্যই এতক্ষণ অপেক্ষা করে ছিল। পাল্লাও খুলে দিল। বাইরে উজ্জ্বল, শান্ত রাত। জানালার ঠিক সামনেই একসারি পোর্লাড গাছ, তার একদিকে অন্ধকার, অপর দিকে রুপোলি আলোর ঝিলিক। গাছগুলোর ঠিক নিচে একধরনের ভিজে ভিজে ঘন ঝোঁপঝাড়, সেগুলির পাতায় ও বোটায় রুপোলি আলো পড়ে ঝিলমিল করছে। কালো গাছগুলোর পিছনে একটা ছাদের উপর শিশিরের কণাগুলি ঝিকমিক করছে, ডানদিকে উজ্জ্বল সাদা কাণ্ড ও ডালপালা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটা পাতাভরা গাছ। আর প্রায় তারকাবিহীন পাণ্ডুর বসন্তের আকাশে পূর্ণ চাঁদের আলো এসে পড়েছে গাছটার মাথায়। জানালার গোবরাটে কনুই রেখে প্রিন্স আন্দ্রু সেই আকামের দিকে চোখ মেলে তাকিয়ে রইল।
তার ঘরটা দোতলায়। উপরের ঘরের সব লোকজনও জেগে আছে। মাথার উপরে অনেক মেয়েলি গলার স্বর তার কানে এল।
ঠিক আর একবার, একটি মেয়েলি গলা শুনেই প্রিন্স আন্দ্রু চিনতে পারল।
কিন্তু তুমি কখন ঘুমতে যাবে? অন্য কণ্ঠস্বর বলল।
আমি ঘুমব না, ঘুমতে পারছি না, কী হবে ঘুমিয়ে? শেষবারের মতো এসো।
দুটি মেয়েলি গলায় গানের কলি ফুটল-কোনো গানের শেষ অংশ।
আঃ কী সুন্দর! এবার ঘুমতে যাও। এখানেই শেষ হোক।
জানালার আরো কাছে এসে প্রথম কণ্ঠস্বর বলল, তুমি ঘুমতে যাও, আমি ঘুমতে পারব না। মেয়েটি নিশ্চয় বাইরে ঝুঁকে দাঁড়িয়েছে, কারণ তার পোশাকের খসখস শব্দ, এমনকি শ্বাসপ্রশ্বাসের শব্দও শোনা যাচ্ছে। সবকিছুই পাথরের মতো স্তব্ধ, ঠিক ওই চাঁদ, তার আলো ও ছায়াগুলির মতো। পাছে তার অনিচ্ছাকৃত উপস্থিতি ধরা পড়ে সেই ভয়ে প্রিন্স আন্দ্রুও সরে যেতে সাহস করল না।
সোনিয়া! সোনিয়া! আবার সেই কণ্ঠস্বর। আঃ, তুমি যে কী করে ঘুমচ্ছ? শুধু একবার চেয়ে দেখ কী অপরূপ! আঃ, কী অপরূপ! উঠে পড় সোনিয়া! তার গলা থেকে যেন কান্না ঝরে পড়ল। এমন মধুর রাত আগে তো কখনো আসেনি, কোনোদিন না।
সোনিয়া একান্তু অনিচ্ছায় কী যেন জবাব দিল।
একবার বাইরে এসে দেখ কী একখানা চাঁদ!… আঃ, কী মধুর! এখানে এস।… লক্ষ্মী, সোনামণি, এখানে এসো! মনে হচ্ছে এইভাবে দুহাত দিয়ে হাঁটু দুটোকে যথাসম্ভব জোরে চেপে ধরে গোড়ালির উপর ভর দিয়ে বসি, আর তারপরেই উড়ে চলে যাই! ঠিক এইভাবে…
আরে সাবধান, বাইরে পড়ে যাবে যে।
একটা ধস্তাধস্তির শব্দ কানে এল, কানে এল সোনিয়ার আপত্তিভরা গলা, একটা বেজে গেছে।
আঃ, তুমি শুধু বরবাদ করতেই জান। ঠিক আছে, যাও, চলে যাও।
আবার সব চুপচাপ, কিন্তু আন্দ্রু জানে মেয়েটি তখনো সেখানেই বসে আছে। মাঝে মাঝে একটা মৃদু খসখস, একটা দীর্ঘনিঃশ্বাসের শব্দ সে শুনতে পেল।
হঠাৎ মেয়েটি চেঁচিয়ে বলল, হে ঈশ্বর! এর অর্থ কী? বেশ, তাহলে শুতেই যাই, যেতেই যখন হবে! সশব্দে জানালাটা বন্ধ হয়ে গেল।
তার গলা শুনতে শুনতেই প্রিন্স আন্দ্রু বলল, তার কাছে তো আমার কোনো অস্তিত্বই নেই। যে কারণেই হোক সে আশা করছে যে মেয়েটি তার সম্পর্কে কিছু বলুক, আবার তাতে ভয়ও পাচ্ছে। ওই তো সে আবার এসেছে! কোনো মতলব নিয়েই এসেছে!
সহসা তার মনের মধ্যে যৌবনসুলভ ভাবনা ও প্রত্যাশার এমন এক অপ্রত্যাশিত বিভ্রাট দেখা দিল যা তার সমস্ত জীবনযাত্রার পরিপন্থী, নিজের কাছেই নিজের এই অবস্থার কোনো ব্যাখ্যা দিতে না পেরে সে বিছানায় শুয়ে পড়ল এবং সঙ্গে সঙ্গে ঘুমিয়ে পড়ল।
.
অধ্যায়-৩
পরদিন সকালে একমাত্র কাউন্ট ছাড়া আর কারো সঙ্গে দেখা না করে এবং মহিলাদের কারো জন্য অপেক্ষা না করেই প্রিন্স আন্দ্রু বাড়ির পথে পা বাড়াল।
জুন মাস আরম্ভ হয়ে গেছে। ফেরার পথে সেই বার্চগাছের জঙ্গলে সে পৌঁছে গেল যেখানে বুড়ো ওকগাছটা তার মনে একটা অদ্ভুত স্মরণীয় দাগ কেটেছিল। জঙ্গলে ঢোকার পরে জোয়ালের ঘণ্টাগুলো ছয় সপ্তাহ আগের তুলনায় আরো অনেক বেশি অস্পষ্ট সুরে বাজতে লাগল, কারণ জঙ্গলটা এখন আরো বেশি ঘন ও ছায়াচ্ছন্ন হয়ে উঠেছে, আর ইতস্তত ছড়ানো নতুন ফার গাছগুলো এখানকার সৌন্দর্যের কোনোরকম হানি না ঘটিয়ে বরং তাদের সতেজ সবুজ ডালপালা মেলে দিয়ে পরিবেশের সঙ্গে আরো বেশি করে মিলেমিশে গেছে।
