ইংরেজটি ঘাড় নাড়ল, কিন্তু সে এই বাজি গ্রহণ করতে রাজি কি না তা বোঝা গেল না। আনাতোল তাকে ছাড়ল না; যদিও সে যে কথাগুলি বুঝতে পেরেছে সেটা বোঝাবার জন্য সে ঘাড় নাড়তে লাগল, তবু আনাতোল দলোখভের কথাগুলিকে ইংরেজিতে অনুবাদ করে শোনাতে লাগল। রক্ষীবাহিনীর হুজার একটি সরুমতো ছোকরা জানালার গোবরাটে উঠে ঝুঁকে পড়ে নিচের দিকে তাকাল।
জানালা থেকে রাস্তার পাথরগুলো দেখতে পেয়ে সে বলে উঠল, ওঃ! ওঃ! ওঃ!
তাকে জানালা থেকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে দলোখভ চেঁচিয়ে বলল, চুপ কর! ছোকরা থতমতো খেয়ে লাফ দিয়ে ঘরের মধ্যে নেমে পড়ল।
সহজেই হাতে পাওয়া যায় গোবরাটের উপর এমন জায়গায় বোতলটা রেখে দলোখভ সাবধানে ধীরে ধীরে জানালা বেয়ে উঠে পা ঝুলিয়ে বসল। জানালার দুই দিকে চাপ রেখে সে নিজের আসনে ঠিক হয়ে বসল, হাত দুটি নামিয়ে নিয়ে একবার ডাইনে, একবার বাঁয়ে একটু সরে বসে বোতলটা হাতে নিল। তখন বেশ আলো ফুটেছে, তবু আনাতোল দুটো মোমবাতি এনে গোবরাটের উপরে রাখল। দলোখভের সাদা শার্টপরা পিঠ ও কোঁকড়া চুলে ভর্তি মাথাটার দুদিকে আলো পড়ল। সকলেই জানালার কাছে গিয়ে ভিড় করল; ইংরেজটি সকলের আগে। পিয়ের চুপচাপ দাঁড়িয়ে হাসতে লাগল। উপস্থিত সকলের চাইতে একটু বয়স্ক একটি লোক হঠাৎ ভীত ও ক্রুদ্ধদৃষ্টিতে তাকিয়ে সামনে এগিয়ে গেল এবং দলোখভের শার্টটা চেপে ধরতে চেষ্টা করল।
আমি বলছি, এটা বোকামি! ও তো মরে যাবে, অপেক্ষাকৃত বুদ্ধিমান লোকটি বলল।
আনাতোল তাকে থামিয়ে দিল।
ওকে ছোঁবেন না! আপনি ওকে হকচকিয়ে দেবেন, আর তাহলেই ও মারা পড়বে। অ্যাঁ?… তারপর?… অ্যাঁ?
দলোখভ মুখটা ফেরাল, দুই হাতে ধরে নিজের জায়গায় ঠিকমতো বসল।
চাপা পাতলা ঠোঁট দুটির ভিতর দিয়ে কেটে-কেটে বলল, আবার যদি কেউ এসে গোলমাল করে তো তাকে আমি নিচে ছুঁড়ে ফেলে দেব এবার তাহলে!
এই কথা বলে সে আবার মুখটা ঘোরাল, দুই হাত নামিয়ে বোতলটা তুলে ঠোঁটে লাগাল, মাথাটা পিছনে ঠেলে দিল এবং হাত দুটো তুলে তাল সামলাতে লাগল। একজন পরিচারক ভাঙা কাঁচ কুড়োচ্ছিল; সে আর জানালা থেকে এবং দলোখভের পিঠের দিক থেকে চোখ সরাতে পারল না; সেই অবস্থায়ই তাকিয়ে রইল। আনাতোল খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে হাঁ করে রইল। ইংরেজটি বাঁকা চোখে তাকিয়ে ঠোঁট চাটতে লাগল। যে লোকটি একাজে বাধা দিতে চেয়েছিল সে ঘরের এক কোণে ছুটে গিয়ে দেয়ালের দিকে মুখ করে একটা সোফায় বলে পড়ল। পিয়ের দুই হাতে মুখ ঢাকল; এতক্ষণ তার মুখে একটা ক্ষীণ হাসি লেগেছিল; এবার সেখানে ফুটে উঠল ভয় ও আতংক। সকলেই স্তব্ধ। পিয়ের চোখের উপর থেকে হাত সরিয়ে নিল; দলোখভ তখনো একই অবস্থায় বসে আছে; শুধু তার মাথাটা আরো পিছনে সরে আসায় কোঁকড়া চুলগুলি শার্টের কলার ছুঁয়েছে; যে হাতে বোতলটা ধরেছে সেটা ক্রমেই আরো উঁচুতে উঠেছে আর থথর করে কাঁপছে। বোতলটা ক্রমেই খালি হয়ে আসছে, ক্রমেই আরো উঁচুতে উঠছে, আর মাথাটা ক্রমেই পিছনে হেলে পড়ছে। এতক্ষণ লাগছে কেন? পিয়ের ভাবল। তার মনে হল যেন আধ ঘণ্টারও বেশি সময় পার হয়ে গেছে। হঠাৎ দলোখভের শিরদাঁড়াটা পিছনদিকে সরে এল, তার হাতটা থথ করে কাঁপতে লাগল; তার ফলে জানালার ঢালু গোবরাট থেকে তার পুরো শরীরটা বসা অবস্থায়ই পিছলে গেল। যত সে পিছলে নেমে যেতে লাগল ততই তার মাথা ও হাত দুলতে লাগল। একটা হাত যেন দুলে উঠে গোবরাটটাকে চেপে ধরতে গেল, কিন্তু সেটাকে ছুঁল না। পিয়ের আবার চোখ ঢাকল; মনে হল, সে চোখ আর কখনো সে খুলবে না। হঠাৎ তার মনে হল, চারদিকে একটা চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ছে। চোখ মেলে তাকাল : জানালার গোবরাটে দলোখ দাঁড়িয়ে আছে; তার ম্লানমুখে হাসির ছটা।
বোতল খালি!
ইংরেজটিকে লক্ষ্য করে সে বোতলটা ছুঁড়ে দিল; সেও ভালোভাবে সেটাকে ধরে নিল। দলোখভ লাফ দিয়ে নিচে নামল। গায়ে রামের তীব্র গন্ধ।
বেড়ে করেছ! আচ্ছা ছেলে!… বাজিমাৎ করে দিয়েছ!… তোমার উপর শয়তান ভর করুক! চারদিক থেকে নানা মন্তব্য ভেসে এল।
ইংরেজটি থলে বের করে টাকা গুনতে লাগল। দলোখভ ভুরু কুঁচকে দাঁড়িয়ে রইল, কিছু বলল না। পিয়ের লাফ দিয়ে জানালার গোবরাটে উঠল।
ভদ্রজনরা, আমার সঙ্গে কে বাজি ধরবেন? এ কাজ আমিও করব! হঠাৎ সে চেঁচিয়ে বলে উঠল। কেউ বাজি না ধরলেও করব! দেখুন! একটা বোতল আনতে বলুন। আমিও খেলা দেখাব। একটা বোতল এনে দিন!
ওকে খেলা দেখাতে দিন, ওকে খেলা দেখাতে দিন, ওকে খেলা দেখাতে দিন, দলোখভ হেসে বলল।
আর তারপরে? আপনি কি পাগল হয়েছেন?…কেউ আপনার সঙ্গে বাজি ধরবে না!…আরে, আপনার তো সিঁড়িতে চলতেই মাতা ঘোড়ে, বেশ কিছু লোক চেঁচিয়ে বলতে লাগল।
স্থিরসংকল্পে মাতালের মতো টেবিলে একটা থাপ্পড় মেরে পিয়েরও চেঁচিয়ে বলল, আমিও খাব! এক বোতল রাম চাই! সে জানালা বেয়ে ওঠার জন্য প্রস্তুত হল।
সকলে তার হাত চেপে ধরল, কিন্তু তার এতই শক্তি যে তার গায়ে যে হাত দিল তাকেই সে ছুঁড়ে ফেলে দিল।
আনাতোল বলল, না, এভাবে ওর সঙ্গে পারবেন না। একটু অপেক্ষা করুন, আমি ব্যবস্থা করছি।… শোন! কাল আমি তোমার সঙ্গে বাজি ধরব, কিন্তু এখন আমরা সকলে যাব-এর বাড়ি।
বেশ, তাই চল, পিয়ের চেঁচিয়ে বলল। তাই চল!…আর ব্রুইন-কে সঙ্গে নিয়ে চল।
